Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

সকাল ১১:২৩ ঢাকা, মঙ্গলবার  ২০শে নভেম্বর ২০১৮ ইং

বিনিয়োগ নেই অর্থ পাচার হচ্ছে : সিপিডি

দেশে ব্যক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিয়োগ হচ্ছে না। এর কারণ বিদ্যুৎ, গ্যাস, জমি ও যোগাযোগের মতো প্রচলিত প্রতিবন্ধকতা, সংস্কারের অভাব ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এর পাশাপাশি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচার হচ্ছে, যা কি না মোট বিদেশী ঋণেরও বেশি। ব্যাংকিং খাতের অবস্থাও পর্যুদস্ত। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব ঘাটতি হবে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে প্রত্যাশা অনুযায়ী এ বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে না।

এ শঙ্কা ব্যক্ত করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৪-১৫ অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ শঙ্কা ব্যক্ত করেন প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। এই পর্যালোচনায় গত অর্থবছরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) সামষ্টিক অর্থনৈতিক চিত্র ও অর্থবছরের বাকি সময়কালের পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়। প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান এটি গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করেন। এতে আরো বক্তব্য রাখেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও নির্বাহী গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত বছর প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষতমাত্রায় হয়নি। বিনিয়োগও শ্লথ হয়ে গেছে। তবে এ সময় সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি স্থিতিশীলতা লক্ষ করা গেছে। গত বছর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি, রাজস্ব আয় কাক্সিত মাত্রায় হয়নি। এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৮৫ ভাগ। কিন্তু এরপরও বাস্তবায়নের উৎকর্র্ষতা বাড়েনি, যা কি না একটা দুশ্চিন্তার বিষয়।

চলতি বছরে ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, এ সময় রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে সাড়ে ৯ ভাগ। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে হলে অর্থবছরের বাকি মাসগুলোয় রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হতে হবে গড়ে ৪০ শতাংশ, যা কি না প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। এ বিবেচনায় সিপিডি মনে করে চলতি অর্থবছর শেষে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি থাকবে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ পাচার হচ্ছে : সিপিডি পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, দেশে ব্যক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিয়োগ হচ্ছে না। কিন্তু মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৪৩ ভাগ। এর মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছে শূন্য শুল্কে আমদানি করা পণ্য। এ পণ্যগুলো আবার সরাসরি বিনিয়োগের সাথে সঙ্গতিপূর্ণও নয়। পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়কালে ‘বেস মেটাল ও আর্টিকেলস অব বেস মেটালের’ আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৯৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে একই সময়ে যা ছিল মাত্র ৮ শতাংশ। একই সময় ইলেকট্রিক্যাল পার্টস আমদানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে একই সময়ে যা ছিল ৩৩ শতাংশ। এখানে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছেÑ দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না।

আমেরিকান গবেষণা সংস্থার পরিসংখ্যান উল্লেখ করে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ২০১২ সালে দেশ থেকে ১৪০ কোটি ডলার পাচার হয়ে গেছে। এর আগে ভারতীয় পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে বাংলাদেশ থেকে রেমিট্যান্স আকারেই ২০১৩ সালে ভারতে চলে গেছে ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার। আসলে তা রেমিট্যান্স আকারে চলে গেছে কি না এই বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। এ সময় দেবপ্রিয় বলেন, এক দিকে দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে, অন্য দিকে তা বিদেশ ঘুরে বেসরকারি খাতে ঋণ দেখিয়ে দেশে নিয়ে আসা হচ্ছে। রফতানি ইনভয়েসের মাধ্যমে ভুয়া মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচার করা হচ্ছে। কোনো কোনো মহল থেকে আবার ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়ার দাবি জানানো হচ্ছে। তারা আবার আফ্রিকাসহ বিভিন্ন জায়গায় এখন থেকে মুদ্রা নিয়ে বিনিয়োগও করতে চায়। এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য জরুরি।

সরকারি তথ্য-উপাত্তের নির্ভরযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে কমে আসছে উল্লেখ করে বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের যে চিত্র দেখানো হচ্ছে তা সন্দেহজনক। এখানে ‘উইনড্রো ড্রেসিং’ করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। বেনামি ঋণও আবার পুনঃতফসিল করা হচ্ছে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন নতুন স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। যাকে ‘বাংলা রেট অব গ্রোথ’ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এটি হচ্ছে অনেক বছর ধরে আমরা প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে রেখেছি। কিন্তু একে যদি ‘সুপার বাংলাদেশ রেট অব গ্রোথ’-এ রূপান্তর করতে হয় তবে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে ৮ থেকে ৯ শতাংশ হারে। আর সেটি তখনই সম্ভব যখন দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হবে জিডিপির ২৮ থেকে ২৯ ভাগ। বর্তমানে যা ১৮-১৯ ভাগে রয়েছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না মূলত তিন কারণে। এক. বিদ্যুৎ, গ্যাস, জমি ও যোগাযোগের মতো প্রচলিত প্রতিবন্ধকতার কারণে। দুই. সংস্কারের অভাব, তিন. রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটানোর জন্য একটি অন্তর্ভুক্তি ও সমঝোতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশ দরকার, যাতে করে বিনিয়োগকারীর মনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে একটি আস্থার সৃষ্টি হয়।

বিনিয়োগ না হওয়ার বিষয়ে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিনিয়োগকারীদের কাছে অর্থ আছে। কিন্তু বিনিয়োগের সহায়ক উপকরণের সমস্যা রয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জমি ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয়নি। এটি বিনিয়োগ না হওয়ার অন্যতম কারণ।

সিপিডির তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণার মান নিয়ে সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী প্রশ্ন উত্থাপন করেছেনÑ এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ঢালাও মন্তব্য নয়, তাদের উচিত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বলা, আমরা কোথায় অসত্য বক্তব্য দিয়েছি। আর এখানে যে তথ্য নেয়া হয়েছে তা সব সরকারেরই তথ্য।