Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

সন্ধ্যা ৭:৩২ ঢাকা, সোমবার  ১৯শে নভেম্বর ২০১৮ ইং

‘৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেট পেশ’

২০২১ সালে মধ্য আয় ও ’৪১ সালে সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায়, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত আজ জাতীয সংসদে এ বাজেট পেশ করেন।

বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া, এনবিআর বহির্ভূত সূত্র থেকে কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০.৪ শতাংশ। কর বহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৬ শতাংশ।

pm326

প্রস্তাবিত বাজেটে অনুন্নয়নসহ ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১.৪ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১ লাখ ১০ হাজার ৭শ’কোটি টাকা যা জিডিপির ৫.৬ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ খাতে ইসিএ ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ১২ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এর ফলে এডিপির মোট আকার হলো ১ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬.৩ শতাংশ।

প্রস্তাবিত বাজেটে সার্বিক বাজেট ঘাটতি ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। এ ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র থেকে ৩৬ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৯ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৬১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ৩.১ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৩৮ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংক বহির্ভূত উৎস থেকে ২২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা সংস্থানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭.২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৫.৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে আজ দুপুরে সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের সভায় প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন করা হয়। এরপরই রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন করেন।

এছাড়াও অর্থমন্ত্রী আজ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার সংশোধিত বাজেট পেশ করেন। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর এটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের তৃতীয বাজেট। এছাড়া গত বছরের মতো এবারও সংসদে বিরোধীদলের উপস্থিতিতে বাজেট পেশ করা হলো।

প্রস্তাবিত বাজেটের উন্নয়নের লক্ষ্য ও কৌশল হচ্ছে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন। আর রূপকল্পের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কৌশল হচ্ছে উপযুক্ত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উন্নয়ন, গণদ্রব্য ও সেবার যোগান বৃদ্ধি, বিশ্বাবাজারের সাথে ক্রমান্বয়ে একীভূত হওয়া, উৎপাদন বিশেষায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা।

অর্থমন্ত্রী বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটের দিকে বাজেট বক্তৃতার শুরুতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, চার জাতীয় নেতা, মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণতন্ত্র ও মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে আত্মদানকারী শহীদ, ’৭৫-এর কালোরাত্রিতে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার বঙ্গবন্ধুর নিষ্পাপ স্বজন এবং অন্যান্য শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে সাথে নিয়ে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সংসদে রাষ্ট্রপতির বক্সে বসে বাজেট বক্তৃতা শোনেন। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ বিভিন্ন বিদেশী দূতাবাসের কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, বিশিষ্ট আমন্ত্রিত ব্যক্তি এবং ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারাও সংসদ ভবনে উপস্থিত থেকে বাজেট বক্তৃতা শোনেন।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, বিগত ৭ বছরে সরকারের নিরন্তর কর্মপ্রচেষ্টার সাথে সর্বস্তরের জনগণের একাত্মতা প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ধারাকে নির্বিঘœ ও গতিশীল রেখেছ্ েএতে সবার জীবনে আয়, উন্নতি ও স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে।

তিনি বলেন, ‘সমৃদ্ধি অর্জনের অভিযাত্রায অনেকটা পথ এগুলেও আমাদের যেতে হবে আরও অনেক দূর। বিশেষ করে, দারিদ্র্রকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে নির্মাণ করতে হবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, সমাজের সর্বক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

মুহিত বলেন, বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রার চ্যালেঞ্জগুলো সরকার চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এ সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাস্তবানুগ কার্যক্রম। বিশেষ করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণ, দক্ষতার উন্নয়ন, বিনিয়োগে বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও গুণগত মান বৃদ্ধি, উৎপাদনে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির প্রসার, রপ্তানি পণ্য ও বাজারের বহুমুখীকরণ, প্রবাসে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ও পরিকল্পিত নগরায়ন ইত্যাদি একান্ত জরুরি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহে সম্পদ সঞ্চালনের জন্য রাজস্ব আদায়সহ বিদেশী সহায়তার ব্যবহারও বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি, জনপ্রশাসনে সক্ষমতার উন্নয়ন, ই-গভর্নেন্স, ভূমি ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে আমরা এগিয়ে যেতে পারব বহুদূর।

তিনি বলেন, জাতীয় উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় প্রধান প্রতিবন্ধক এখন মনে হয় অনিশ্চিত স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা। প্রতিটি জেলা জনসংখ্যায় ও আয়তনে বিশ্বের প্রায় ৫০/৬০টি দেশের চেয়ে বড়। এ ঘনবসতির স্বল্প আয়তনের দেশে ক্ষমতার প্রতিসংক্রম ছাড়া কোন উপায়েই উন্নয়ন উদ্যোগে এমন গতিশীলতা পাওয়া যাবে না যাতে বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তাই স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার গুণগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।

মুহিত বলেন, এ শাসন ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব ও ক্ষমতা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় গত ৭ বছরে বিভিন্ন খাতে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন চিত্র বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরেন। বিশেষ করে গত সাড়ে ৬ বছরে মন্দা মোকাবেলায় সাফল্য, বিদুৎ-জ্বালানি, ডিজিটাল বাংলাদেশ, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, শিল্প-বাণিজ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রবাসী কল্যাণ, নারী ও শিশু, ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আমদানি রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও জনশক্তি রপ্তানী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় সরকার পুর্নগঠন ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থানসহ সকল ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের বর্ণনা করেন।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামোগত খাতে মোট বরাদ্দের ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যার মধ্যে মানব সম্পদ খাত- শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সংশ্লিষ্ট খাতে ২৫.২ শতাংশ, ভৌত অবকাঠামো খাতে ২৯.৭ শতাংশ- যার মধ্যে রয়েছে সার্বিক কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ১৩.৬ শতাংশ, যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে ১০.২ শতাংশ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতে ৪.৪ শতাংশ।

এছাড়া সাধারণ সেবা খাতে ২৪.৫ শতাংশ, সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি), বিভিন্ন শিল্পে আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি, রাষ্টায়ত্ত, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য ব্যয় বাবদ ২.২ শতাংশ। এছাড়া সুদ পরিশোধ বাবদ ১১.৭ শতাংশ নিট ঋণদান ও অন্যান্য ব্যয় খাতে অবশিষ্ট ৩.৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে, পদ্মা সেতু তথা যোগাযোগ অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান- প্রযুক্তি, কৃষি, মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, জাতির জনকের হাত ধরেই এদেশের মানুষ স্বাধীনাত ও রাজনৈতিক মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। আবার তাঁর হাতেই রচিত হয়েছিল দেশের অগ্রগতির প্রাথমিক ভিত্তি। এ অগ্রযাত্রায় বিভিন্ন সময়ে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বাধাগ্রস্ত হলেও তাঁর সুযোগ্য কন্যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতি আজ এক সুদৃঢ় অবস্থানে পৌঁছেছে, জাতি সমৃদ্ধির সোপানে পদার্পণ করেছে।

তিনি বলেন, সমৃদ্ধির আরও উচ্চতর সোপানে পৌঁছতে হলে সরকার যেসব কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে হাতে নিয়েছে, তা জোরদারের পাশাপাশি একটি সমন্বিত ও ব্যাপক ভিত্তিক কর্মযজ্ঞ শুরুর এখনই উপযুক্ত সময়। অফুরন্ত প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা ক্রমবর্ধিষ্ণু যুবশক্তিকে কাজে লাগানোর এক মাহেন্দ্র ক্ষণ জাতির দ্বারপ্রান্তে।

মুহিত বলেন, শত প্রতিকূলতার মাঝেও জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও অংশগ্রহণ, উদ্দীপ্ত যুবশক্তির গঠনমূলক কর্মোদ্যোগ এবং প্রধানন্ত্রীর প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাবে এক আলোকোজ্জ্বল আগামীর পথে। ২০৪১ সালের বাংলাদেশ বিশ্বসভায় পরিচিতি লাভ করবে একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও কল্যাণ রাষ্ট্রের অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে।