ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৭:১৪ ঢাকা, রবিবার  ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

১৯৭১ সালে বন্দীদশায় বঙ্গবন্ধুর পরিবার হত্যার ঝুঁকিতে ছিলেন

বিজয় দিবসের পরের দিন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অপর সদস্যরা পাকিস্তানীদের বন্দীদশায় থাকা অবস্থায় পরাজিত ভয়ার্ত দখলদার রক্ষীদের হাতে ১৯৭১ সালের সর্বশেষ হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ার চরম ঝুঁকিতে ছিলেন। দু’জন প্রত্যক্ষদর্শী দুঃসহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন।
‘বাড়িটি পাহারারত পাকিস্তানী সৈন্যরা ছিল অবরুদ্ধ ও ভয়ার্ত তবে তারা ছিল উদ্ধত… মনে হয়েছে ১৭ ডিসেম্বর সকালেও তারা আত্মসমর্পণ সম্পর্কে অবগত ছিল না।’
বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহযোগী হাজী গোলাম মোর্শেদ বিজয় দিবসের প্রক্কালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে একথা বলেন।
মোর্শেদের বয়স বর্তমানে ৮৫ বছর। তিনি সাহসিকতার জন্য সম্মাননা অর্জনকারী মেজর অশোক তারার নেতৃত্বে ভারতীয় সৈন্যদের ৪ জনের একটি দলের পাহারায় ধানমন্ডি ১৯৮ নম্বর সেই বাড়িতে যান যেখানে বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ রেহানা এবং শেখ হাসিনা ও তাঁর নবজাতক পুত্র বন্দীদশায় ছিলেন।
মোর্শেদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘মেজর তারা তাঁর অস্ত্র তাঁর পেছনের লোকদের কাছে দিয়ে পাকিস্তানী সেনাদের কাছাকাছি পৌঁছলেন… এ সময় একজন গার্ড চিৎকার করে তাকে বললো, আর এক পা সামনে না এগোনোর জন্য, এগোলে তাঁকে গুলি করা হবে।’
মোর্শেদ বলেন, ‘হতাশ, ভীত এবং নির্দেশনাবিহীন’ পাকিস্তানী গার্ডরা বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে হত্যা করতে যাচ্ছে এমন মনে হওয়ায় পরবর্তী কয়েক মিনিট চরম উদ্বেগজনক অবস্থা বিরাজ করছিল।’
মিডিয়ায় পৃথক এক সাক্ষাৎকারে, তখনকার ২৯ বছর বয়সের তারা তাকে (মোর্শেদকে) কাছাকাছি আসতে বললেন। তিনি ভাবলেন, বাড়ির বন্দীদের উদ্ধারে কঠোর ব্যবস্থা নিলে পাকিস্তানী গার্ডরা তাদের হত্যা করতে পারে।
‘এটি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অভিযান এবং যদি কোন ভুল হয়ে যায় তাহলে ভারত সরকারের এবং ভারতীয় আর্মির বদনাম হবে।’
বর্তমানে ৭১ বছর বয়সী তারাকে দুই বছর আগে ‘ফ্রেন্ড অব বাংলাদেশ’ এওয়ার্ড প্রদান করে সম্মান জানানো হয়েছে।
২৫ মার্চ কালোরাতে পাকিস্তানী বাহিনী ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে প্রবেশ পর্যন্ত মোর্শেদই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সর্বশেষ সঙ্গী এবং তাকেও গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়, ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন।
মোর্শেদের মুক্তির পর তিনি সন্ধান পান বঙ্গবন্ধুর পরিবার ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কে এক বাড়িতে পাকিস্তানী সৈন্যদের কড়া প্রহরায় বন্দীদশায় রয়েছেন, এমনকি ১৭ ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত বন্দীদশায় রয়েছেন। এ অবস্থায় তিনি ভাবলেন, বঙ্গবন্ধু পরিবারের বন্দীদশা সম্পর্কে মিত্রবাহিনীকে জানানো প্রয়োজন।
মোর্শেদ বলেন, ‘আমি শুনেছি ভারতীয় আর্মি কাকরাইলে সার্কিট হাউসে অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী আমার কাজিন ইঞ্জিনিয়ার আবু ইলিয়াস মজিদ তার গাড়িতে আমাকে সেখানে নিয়ে যায়। সেখানে বারান্দায় এক চেয়ারে বসা অবস্থায় আমরা মেজর জেনারেল বিএফ গনজালেসকে দেখতে পাই।’
তিনি বলেন, প্রাথমিক কিছু আলোচনার পর ভারতীয় জেনারেল জিজ্ঞাসা করলেন আমাদের কাছে কোন গাড়ি আেিছ কী-না এবং হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে তিনি বিমানবন্দর পর্যন্ত লিফট চাইলেন। ভিআইপি যাতায়াত নিরাপদ করতে ভারতীয় সৈন্যরা পাহারা দিয়ে নিয়ে যেত, তাদের কমান্ডার ছিলেন মেজর তারা।
‘গনজালেস আমাকে তারার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর পরিবার উদ্ধার করতে তাকে দায়িত্ব দিলেন।’
মোর্শেদের বর্ণনা অনুযায়ী এসময় সেখানে ভারতীয় সৈন্যদের গাড়ি ছিল না এবং তারা এক বাঙালি ভদ্রলোকের কাছে গাড়ি ও ড্রাইভার চাইলেন, উদ্ধার অভিযানের জন্য তিনি গাড়ি দিতে সম্মত হলেন।’
মোর্শেদ বলেন, মেজর তারা আমাদের গাড়িতে উঠলেন এবং আমার কাজিন গাড়ি চালাচ্ছিলেন। একজন জেসিও (জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার)সহ ৩ জন ভারতীয় সৈন্য অন্য গাড়িতে আমাদের গাড়ির অনুসরণ করলো।’
দু’টি গাড়ি বাড়ির কাছে একটি ভিড়ের সামনে থামলো এবং বাড়ির কাছে একটি বুলেটে ঝাঁঝরা গাড়ি লক্ষ্য করে সতর্ক হলেন। গাড়ির ভেতরে অজ্ঞাত এক ড্রাইভারের মৃতদেহ পড়ে আছে। মনে হচ্ছে- গতরাতে ভয় ও আতঙ্কের কারণে সে হত্যার শিকার হয়েছে। ভিড়ের লোকরা মেজর তারাকে বললো, আগের রাতে বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় এক মহিলাসহ ৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
মেজর তারা গাড়ি থেকে নামলেন এবং তাঁর হাতের স্টেনগান জেসিওকে দিলেন এবং তাঁর অধীন ৩ সেনা সদস্যকে রাস্তার এক পাশে অবস্থান নিতে বললেন এবং ধীরে ধীরে তিনি বাড়ির দিকে অগ্রসর হলেন, এসময় ছাদ থেকে এক রক্ষী তাকে সতর্ক করে দেয়। সামনে এক পা অগ্রসর হলে গুলি করা হবে।
এ অবস্থায় ঘটনার আকস্মিকতায় ভারতীয় সেনাদের বিব্রত অবস্থায় দেখা যায়।
দেখুন, আমি একজন ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা, আপনার সামনে নিরস্ত্র দাঁড়িয়ে আছি। আমি যদি আপনার সামনে নিরস্ত্র আসতে পারি, তার মানে হচ্ছে, আপনাদের সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করেছে। আপনি আপনার কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। তারা পাঞ্জাবি ও হিন্দি মিশ্র ভাষায় চিৎকার করছিল। কিছু সময় পর দখলদার পাকিস্তানি হাবিলদার চিৎকার করে বলেন, কর্মকর্তার সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ নেই।
ভারতীয় মেজর বলেন, তিনি পরে জানতে পারেন, পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন তার পদবি পরিত্যাগ করেছেন এবং যোগাযোগে বিঘœ ঘটায় নি¤œস্তর পর্যায়ে আত্মসমর্পণের খবরটি তখনো পৌঁছেনি।
তিনি বলেন, এ সময় আকস্মিকভাবে মাথার উপর দিয়ে কয়েকটি ভারতীয় হেলিকপ্টার উড়ে যায়। আমি তাদেরকে বলি, দেখ আমাদের হেলিকপ্টার আকাশে উড়ছে এবং আমাদের জোয়ানরা ঢাকায়।
তারা আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং গার্ডকে বলছে, তোমাদের সঙ্গে ছেলেমেয়েসহ একটি পরিবার আছে। তুমি অস্ত্র ছাড় এবং স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে আস, তুমি যেখানে যেতে চাও, সেখানে যাবার জন্য তোমাকে একটি নিরাপদ পেসেজ দিতে নিশ্চয়তা দিচ্ছি।
আঠারো বছরের একজন তরুন পাকিস্তানি সেনা তার রাইফেলটি রেখে বাংকার থেকে বেরিয়ে আসে। তরুন ছেলেটি তখন ভয়ে কাঁপছিল। সে হয়তবা প্রথমবারের মতো কোন ভারতীয় সৈন্যকে খুব কাছ থেকে দেখল। ছেলেটির চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।
তারা পরে বলেন, প্রায় ১০ মিনিট তার সঙ্গে কথা বলেন। যখন তিনি হিন্দি ও পাঞ্জাবি ভাষায় তার সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন কোন হতাহতের ঘটনা ছাড়াই তাদের মধ্যকার উত্তেজনার অবসান ঘটে। আমি সাথে সাথে ঘরে প্রবেশ করি। বেগম মুজিব আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, আল্লাহ তাঁর পরিবারকে বাঁচাতে স্বর্গ থেকে তাকে পাঠিয়েছেন।
তারা আরো বলেন, ভারতের একটি পত্রিকা পরে জানায়, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বেগম মুজিব মুক্ত। এক সাক্ষাৎকারে বেগম মুজিবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, এটি ছিল আমাদের জন্য একটি নতুন জীবন।
তারা বলেন, ঘরে তেমন কোন আসবাবপত্র ছিল না। পরিবারের সদস্যরা মেঝেতে ঘুমাচ্ছিল। তাদের জন্য তেমন কোন খাবারও ছিল না। আমি শুধুমাত্র বিস্কুট দেখেছি।
তারা শেখ হাসিনার একটি ছবি দেখান। এ সময় ছবিতে শেখ হাসিনার কোলে তাঁর একটি শিশু সন্তান ছিল।
পাকিস্তানি সৈন্যরা যুদ্ধ শুরু হবার কয়েকদিন পর রাজধানীর মগবাজার এলাকার একটি বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে গ্রেফতার করে। বঙ্গবন্ধু’র বড় ছেলে শেখ কামাল প্রথম দিকেই মুক্তি যুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ২৫ মার্চ রাতে সামরিক অভিযান চালানোর কিছু সময় আগে ৩২ ধানমন্ডির বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। তার ছোট ভাই শেখ জামাল পরে মুখোশ পরে পালিয়ে যান এবং মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেন। পরিবারের বাকি সদস্যরা ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আটক ছিলেন। শেষ দু’দিন শেখ হাসিনার স্বামীও বাড়িতে প্রবেশ করতে পারেননি।
শেখ হাসিনা সন্তান সম্ভাবনাকালে যথাযথ খাবার ও সেবাযতœ থেকে বঞ্চিত হন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হবার সুযোগ দেয়া হলেও তার মাকে তাঁর কাছে যেতে দেয়া হয়নি।
শেখ হাসিনা জানান, আমার মা যখন আমার কাছে আসতে চেয়েছেন, পাকিস্তানের সেনারা সোজা তাঁকে বলেছে, তুমি হাসপাতালে যেয়ে কি করবে। সেখানে নার্স ও ডাক্তার আছেন। তুমি কি ডাক্তার, না নার্স? তুমি সেখানে যেতে পারবে না। আমার মা যখন তাদেরকে বলেছে, আমি আমার মেয়েকে সাহস যোগাতে তার পাশে থাকতে চাই। কিন্তু তাঁর এই আবেদনের কোন মূল্য ছিল না তাদের কাছে। শেখ হাসিনা পরে তাঁর লেখা এক নিবন্ধে ১৯৭১ সালের তাঁর সংকটময় সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন।
শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয় ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার ইচ্ছা অনুযায়ী ভিকটরি’র বাংলা অর্থ জয় হিসেবে তার নাম রাখা হয় জয়। তখন দেশ মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল।বাসস

 

http://www.bssnews.net/bangla/newsDetails.php?cat=6&id=322373&date=2015-12-16