ব্রেকিং নিউজ

বিকাল ৫:৩৩ ঢাকা, বৃহস্পতিবার  ২০শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

স্বাস্থ্যখাতের হাজার কোটি টাকা লুটপাটের তথ্য দুদকে

 

শীর্ষ মিডিয়া ২৬ সেপ্টেম্বর ঃ   স্বাস্থ্য খাতের ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর জ্ঞাত আয় বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নানা অনিয়ম ও অবৈধ টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রায় হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমনই তথ্য পেয়েছে দুদক।  তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আসলে, তা আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দেশের একমাত্র দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি। গত ৮ জুলাই প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে ঠিকাদার মিঠুর অবৈধ সম্পদ অর্জনের একটি প্রতিবেদন পেশ করা হয় দুদক সচিবের নিকট। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আল-আমীন এই প্রতিবেদনটি পেশ করেন। প্রাথমিকভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য তার সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ পাঠানোর অনুমতি চান এই অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা।  এদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে শ’ শ’ কোটি টাকার দুর্নীতি অনুসন্ধানে ঠিকাদার মিঠুর যাবতীয় কার্যক্রমের নথিপত্র চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি দিয়েছে দুদক। গত ২২ জুন  দুদকের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্বাক্ষরিত এই চিঠি দেওয়া হয়। ।  দুদকের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু অনিয়ম, দুর্নীতি আর লুটপাটের কৌশলকে পুঁজি করে কয়েক বছরের ব্যবধানে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. রুহুল হকের ছেলে জিয়াউল হককে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার শ্যামলী রিং রোডে গড়ে তুলেছেন ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল। মিঠু নিজে এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। এছাড়াও ধানমন্ডি, বনানী, ওল্ড ডিওএইচএস, গুলশান, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে নয়টি অভিজাত ফ্ল্যাট কেনেন রংপুরের এই মিঠু। রাজধানীতে নামে-বেনামে জমি কিনেছেন কয়েক বিঘা। রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পূর্ব পাশে নির্মাণ করেছেন রাজকীয় বাসভবন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বহিঃসমুদ্রে তার দুটি মাদার ভেসেলও আছে বলে প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে।

কে এই মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু ঃ

দুদক সূত্রে জানা যায়, রংপুর শহরের বাসিন্দা মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু। রংপুরে ছাত্রাবস্থায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের গঙ্গাচড়া উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। নানা চড়াই-উৎরাইয়ের পর নিজের রাজনৈতিক পরিচয় পাল্টিয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকের ছেলে জিয়াউল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। জিয়াউল হককে ব্যবসায়িক পার্টনার বানানোর পর থেকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ক্ষমতা, দাপট, অর্থ সবই তিনি কব্জা করে নিয়েছেন অল্প দিনের মধ্যে।

এক সময় শিক্ষা অধিদফতর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দিয়ে মিঠুর ছোটখাটো ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু হয়েছিলো। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্যখাতে ঢুকেন তিনি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর (বর্তমানে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত) ডা. আ ফ ম রুহুল হক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলে তার সৌভাগ্যের দ্বার খুলে যায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছেলেকে পার্টনার করার পর তার ঠিকাদারি আর ছোটখাটো গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এ সময় রাতারাতি পুরো স্বাস্থ্যখাতের শীর্ষ ঠিকাদার হিসেবে আবির্ভূত হন। স্বাস্থ্যখাতকে দীর্ঘদিন তার নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের কব্জায় রেখে জনগণের হাজার কোটি টাকা লোপাট করে তিনি এখন স্বাস্থ্য অধিদফতরের টেন্ডারবাজদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক।

মন্ত্রীর আশীর্বাদ ও তার ছেলের ব্যবসায়িক পার্টনার হওয়ার বদৌলতে কোন অবস্থাতেই বেগ পেতে হয়নি তাকে। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তার নিজের ও নিজ পরিবারের সদস্যদের নামে ১০টি ঠিকাদারি ফার্মের লাইসেন্স করেছেন। যার ফলশ্রুতিতে বিগত পাঁচ বছরে সারা দেশের ১৮টি মেডিকেল কলেজ ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বড় অঙ্কের অধিকাংশ ঠিকাদারি কাজই হাতিয়ে নেয় তার হাতে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো।  সেই সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- মিঠু নিজে ও স্ত্রীর নামে যৌথভাবে প্রোপ্রাইটর সেজে লেংক্সিকান মার্চেন্ডাইজ ও টেকনোক্রেট লিমিটেড নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া লেংকিন মার্চেন্ডাইল নামেই পৃথক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে মিঠুর স্ত্রী নিশাদ ফারজানার নামে। মিঠুর বড় ভাই মোকসেদুল ইসলামের নামে রয়েছে সিআর মার্চেন্ডাইল ও এলআর এভিয়েশন নামে দুটি ফার্মের লাইসেন্স। মোকসেদুলের স্ত্রীর নামে বানানো হয়েছে জিইএফ অ্যান্ড ট্রেডিং, আপন ভাগ্নে বেনজীর আহমেদের নামে ট্রেড হাউস, তার স্ত্রী দীপার নামে করা হয়েছে মেহেরবা ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ঠিকাদারি ফার্ম। তবে প্রোপ্রাইটর হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন জনের নাম দেখানো হলেও মূলত এগুলোর মালিক মিঠু।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মিঠু তার নিজের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মেডিকেল কলেজগুলোর সাথে আঁতাত করে সেগুলোর নামে ক্ষমতাবানদের মাধ্যমে অর্থ বরাদ্দ নেয়। পরবর্তীতে গোপন টেন্ডার কোটেশনসহ নানান কারসাজির মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেয়। অস্বাভাবিক দাম নির্ধারণ করে টেন্ডার কোটেশন পাল্টিয়ে ফেলে। আর এসবের মাধ্যমে তার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহ বিভিন্ন সময়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছে। যেমন গত বছর একটি স্ক্যানার মেশিন সাতক্ষীরা হাসপাতাল মিঠুর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রয় করেছে ৯ কোটি টাকায়। অথচ একই বিদেশি কোম্পানির তৈরি করা একই মডেলের মেশিন অন্য এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেছে মাত্র ৬ কোটি টাকায়। এভাবে অতিরিক্ত দাম ধরে, অনেক সময় এক মেশিনের কথা বলে অন্য কমদামি মেশিন সরবরাহ করে সরকারের বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।

হাসপাতাল গুলো লুটপাট করে যে ভাবে

হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ও মালামাল সরবরাহের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা না থাকায় যে যার মত অর্থ বরাদ্দ নিচ্ছে। সাধারণত হাসপাতালগুলোর পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন সিনিয়র ডাক্তাররা। মন্ত্রণালয়ে এসে অর্থ বরাদ্দ ও ছাড় করিয়ে নেয়া তাদের সম্ভব হয় না। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে কাজ বাগিয়ে নেয় দুর্নীতিবাজ ঠিকাদাররা। নিজেরা লাভবান হবার লোভে এইসব অবৈধ কাজে সহযোগিতা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

আর এভাবে সরকারি হাসপাতালে বৃহৎ অংকের অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে এরকমের ৮টি হাসপাতালের দুর্নীতি অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। এসব হাসপাতালে সরকারি অর্থ লোপাটের ঘটনার সাথে বিতর্কিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে অনুসন্ধানকারী টিম। মিঠু ছাড়াও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পায় তারা। ইতিমধ্যে মিঠুসহ তাদের বিষয়ে এবং বিভিন্ন হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ সংক্রান্ত টেন্ডারের কাগজ-পত্রসহ যাবতীয় নথি তলব করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দুদক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

স্বাস্থ্য খাতের যেসব কর্মকর্তার নথি দুদক থেকে চাওয়া হয়েছে তারা হলেন- উপ-সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান, আবদুল মালেক, অধিদফতরের হিসাবরক্ষক মো. আফজাল, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল বাকী ও সুলতান মাহমুদ।

যে সকল প্রতিষ্ঠানের যেসব নথি তলব করা হয়েছে- মুগদা ৬০০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহে তিন বছরের জন্যে ৪০০ কোটি টাকার টেন্ডারের কাগজপত্র, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহ সংক্রান্ত বিল-ভাউচার, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৫০০ কোটি টাকার নথি, গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালের জন্য বরাদ্দকৃত ৪০ কোটি টাকার কাগজপত্র, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ৩০ কোটি টাকার কেনা-কাটা সংক্রান্ত তথ্য, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬০ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১০ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য, যন্ত্রাংশ সরবরাহ না করেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে ২৭ কোটি টাকা তুলে নেয়ার বিবরণ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডিজির কাছে দেওয়া ওই চিঠিতে আরও জানতে চাওয়া হয়েছে কার্যাদেশ দেয়ার তিন বছরেও কেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেড় কোটি টাকার মালামাল সরবরাহ করা হয়নি? সিএমএসডি (সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরেজ ডিপোট)-এর মাধ্যমে কোন টাকা আত্মসাত করা হয়েছে কি-না, আর এ সংক্রান্ত প্রায় ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সত্য কি-না, অধিদফতরের বাজেট এবং ওপি বরাদ্দ থেকে মহাজোট সরকারের শেষ তিন বছর তথা ২০১১-১২ অর্থ বছর থেকে ২০১৩-১৪ কত টাকা লুটপাট করা হয়েছে?

সেই সাথে এই তিন অর্থ বছরে মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ কীভাবে খরচ করা হয়েছে তার হিসাব বিবরণী দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুদককে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।