ব্রেকিং নিউজ

রাত ২:২৮ ঢাকা, শনিবার  ১৭ই নভেম্বর ২০১৮ ইং

সাপের ঝোল বড়ই উপাদেয়!

থাই উপসাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে সাপশিকারী নীলকণ্ঠ জেলের দল, কুড়ি বছর আগে তারা সংখ্যায় ছিল কুড়ি পঁচিশ জন। কিন্তু কাঁচা টাকার গন্ধে মাতাল হয়ে এখন তাদের সংখ্যা হাজারে পৌঁছেছে। পরিসংখ্যান বলছে, অন্তত সাতশো নৌকা প্রতিরাতে চষে বেড়ায় থাই উপসাগরের বুক, নির্বিচারে শিকার করে ঝাঁকে ঝাঁকে বিষাক্ত সামুদ্রিক সাপ। ব্যাপারটার আরও একটু তলিয়ে দেখা যাক।

সবাই জানে সাপের বিষ থেকেই তৈরি হয় ভীষণ দামী বিষনাশক ঔষধ। আজকাল ঔষধ তৈরিতে সাপ যতটা না জরুরী, তারচেয়েও অনেক বেশি জরুরী থাইল্যান্ড, চীন, ভিয়েতনামের খাবার টেবিলে। আর ক্রমবর্ধমান চাহিদার যোগান দিতে গিয়ে, আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে জেলেরা। কাগজে কলমে তারা স্কুইড শিকারী হয়ে, গভীর রাতে সমুদ্রে উজ্জ্বল আলো জ্বেলে তারা সাপদের আকৃষ্ট করে থাকে। যে ব্যাপারটি এ মুহূর্তে মূল আশঙ্কার কারণে পরিণত হয়েছে, তা হলো সাপশিকারের লুব্ধ ঢেউয়ের চোরাটানে শিকার ও শিকারী দুটোই হারিয়ে যাবার যোগাড় হয়েছে।

এ তথ্য জানিয়েছে কনজারভেশন বায়োলজি নামের একটি পত্রিকা, তারা পরিবেশ সংক্রান্ত গবেষণা, সংবাদ ও জরীপ সংগ্রহ ও পরিচালানা করে থাকে। তাদের দ্বারা পরিচালিত শেষ জরীপের তথ্য অনুযায়ী, সাপশিকারী জেলেদের অনুপাত বাড়লেও, জেলেপাড়ায় তাদের সংখ্যা ২০০৯ সালের পর থেকে উল্লেখজনকভাবে কমে এসেছে। শিকারকালীন সাপের কামড়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া এর অন্যতম কারণ। বিপ্রতীপে নির্বিচারে সাপ সংগ্রহ ও চাষের কারণে প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে অন্তত সাতটি মূল্যবান প্রজাতি, ভূপ্রকৃতি বিচারে বৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান রক্ষায় যাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাপ শিকারের প্রক্রিয়াটি জানা যাক; আগেই উল্লেখ করা হয়েছে জেলেরা রাতের আঁধারে বৈদ্যুতিক আলো জ্বেলে সামুদ্রিক সাপ আকৃষ্ট করে থাকে। রাতে ছাড়া দিনেও চলে অবাধ শিকার। এ কাজে ব্যবহার করা হয় জাল ও বিশেষ আংটা। ঝাঁকে ঝাঁকে সাপ আটকের পর জীবিত অবস্থাতেই আকার ও ভরের ভিত্তিতে পৃথক জলভরা ভাঁড়ে দ্রুত পৃথক করে ফেলা হয়, সম্পূর্ণ খালি হাতে। এ সময়টিতেই আক্রমণের শিকার হয় জেলেরা। সাপের আক্রমণ পরাহত করতে সঙ্গে রাখে ক্ষুর, কামড় খেলে সে জায়গাটি ক্ষুর দিয়ে গভীরভাবে চিরে দিয়ে যথাসম্ভব রক্ত বের করে দেয়। আরও সঙ্গে রাখে গণ্ডারের শিঙের গুঁড়ো, ক্ষতস্থানে ছিটিয়ে দেয়ার জন্যে। (গণ্ডারের শিং সংগ্রহের জন্যেও বেধড়ক পেটানো হচ্ছে গণ্ডারদের, প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে তারাও, তবে এটি এ নিবন্ধের প্রসঙ্গ নয়) দুটোর কোনটিরই কোন স্থায়ী প্রমাণিত উপশমক্ষমতা নেই।

ছোট একটি সাপের ভর কমপক্ষে আধ কিলোগ্রাম হয়ে থাকে। এদের দেহের একটি অংশও অপচয় হবার নয়, প্রত্যেক পৃথক অঙ্গেরই রয়েছে বিশেষ ব্যবহার। এর মাংস খাবার হিসেবে এবং প্রক্রিয়াজাত করে পানীয় হিসেবে জনপ্রিয় থাইল্যান্ড, চীন ও ভিয়েতনামে। এছাড়া সাধারণ উপায়ে তৈরি ‘উপাদেয় ঝোল’ তো ভীষণ জনপ্রিয়; হুদপিণ্ড ও যকৃতের বিশেষ পদ তৈরি হয় গর্ভবতী মহিলাদের জন্যে। ভেতো মদের ভেতর অর্ধডুবন্ত মাংস, পরিবেশনের জনপ্রিয়তম উপায়। সাপের রক্ত মদের সঙ্গে মেশানো হয় পানের সময়, ধারণা করা হয় এতে মদপায়ী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে। এছাড়া মাংস থেকে এক ধরনের আঠালো তরল তৈরি হয়, যার নাম বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘সমুদ্রসর্পের আঠা’, ওটা লাগানো হয় সর্বাঙ্গ ব্যথার রোগীদের পিঠ ও কোমরে। এছাড়া অনিদ্রা ও ক্ষুধামন্দার রোগীরা তাদের রোগ নিরসনে দেদার সাবড়ে চলেছে উপাদেয় সর্পমাংস।

এ মুহূর্তে, সাপ ও মানুষ উভয়েরই যুগপৎ জীবন থেকে সরে যাওয়ার এ প্রক্রিয়াটিতে বাধ সাধার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে থাই সরকার। কিন্তু সর্পমাংসের অনুরাগ যখন এতোদূর পৌঁছে গেছে, তখন সাফল্য কতদূর, কে বলতে পারে।