Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

রাত ১০:২৩ ঢাকা, মঙ্গলবার  ২০শে নভেম্বর ২০১৮ ইং

সাজাপ্রাপ্ত দুই মন্ত্রী

‘সাজাপ্রাপ্ত মন্ত্রীর মন্ত্রিত্বে থাকা অসমীচীন’

nbr1

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

২৮ মার্চ, ২০১৬ প্রিন্ট মিডিয়ার বড় খবর- আদালত অবমাননায় দুই মন্ত্রীর সাজা। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এ খবর আগের দিনই প্রচার হয়েছে। ২৯ মার্চ এ প্রসঙ্গের খবর- সাজাপ্রাপ্ত দুই মন্ত্রীকে সরতে হচ্ছে না (প্রথম আলো), মন্ত্রিত্ব ছাড়ছেন না তারা (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। দুই মন্ত্রীকে সরতে না হোক, সরানো না হোক অথবা তারা না সরেন- যাই হোক না কেন, মূল বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে সাজাপ্রাপ্ত মন্ত্রীর মন্ত্রিত্বে থাকা সমীচীন কিনা। আইনি বিষয় এবং নৈতিকতার বিষয় হয়তো এক পাল্লায় মাপা যায় না, মাপা সমীচীনও নয়, সম্ভবও নয়।

কিন্তু বিবেক বলে তো একটা কথা আছে। সেই সঙ্গে রয়েছে জনগণের বুঝ-বিবেচনা। ইতিমধ্যে সাজাপ্রাপ্ত দু’জন মন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব থাকা-না থাকা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা কথা বলতে শুরু করেছেন। এক সাবেক আইনমন্ত্রী যা বলেছেন তার অর্থ দাঁড়ায় এ দু’জনের মন্ত্রিত্ব যায় না, তারা মন্ত্রিত্বে থাকতে পারেন। বর্তমান আইনমন্ত্রীর মন্তব্যও সমজাতীয়।

নৈতিকতার প্রশ্নে মন্ত্রিত্ব ছাড়াটা ব্যক্তিগত বিবেচনার বিষয়। আইনজ্ঞ শাহদীন মালিক এবং অন্য কারও কারও অভিমতে বোঝা যায়, মন্ত্রিত্ব থাকে না। আমরা সংবিধানের কঠিন বিষয়ে আলোচনায় যেতে রাজি নই, ওটা বড় বড় জ্ঞানী ব্যক্তির ক্ষেত্র। বাংলায় হোক আর ইংরেজি ভার্সনে হোক, আমরা আমজনতা সংবিধান পড়ে যদি সামান্যও বুঝি তাহলে সেটা হয়ে যাবে সোজা মানুষের ‘উবা’ কোপ- অর্থাৎ প্যাঁচপুঁচ না দিয়ে খাঁড়া কোপ মারা।

দুই মন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব নিয়ে সেই সোজা কোপটা হচ্ছে- তারা দু’জন দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের পঞ্চাশ হাজার টাকা করে জরিমানা হয়েছে, অনাদায়ে জেল খাটতে হবে। জরিমানা কত হল তা বড় কথা নয়, জরিমানা জরিমানাই, তা এক পয়সাই হোক আর এক কোটি টাকাই হোক। জেল জেলই, তা এক সেকেন্ডই হোক আর এক বছরই হোক। হ্যাঁ, পরবর্তী কোনো পদে যাওয়া, কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ইত্যাদি বিষয়ের সাজা-পরবর্তী যোগ্যতা-অযোগ্যতা নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জরিমানা কিংবা জেলের মেয়াদ বিবেচ্য হতে পারে হয়তো, কিন্তু মন্ত্রিত্বে থাকার জন্য তা কি বিবেচ্য হতে পারে?

ধরে নিলাম কোনো আইনে যদি এমন বিধান থাকে যে, এত টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হলে কিংবা এতদিন পর্যন্ত জেল হলে মন্ত্রিত্ব যাবে না, তাহলেও সে বিধান পুঁজি করে সাজাপ্রাপ্ত মন্ত্রী মন্ত্রিত্বে থাকতে পারেন? আমরা সাবেক এক আইনমন্ত্রীর এবং বর্তমান আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। আমরা যদি এভাবে ব্যাখ্যা দিই যে, আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর আদালত সে সাজা পরে কোনো কারণে মওকুফ করে দিলেও সাজাপ্রাপ্ত মন্ত্রী কিন্তু দোষী সাব্যস্ত হয়ে গেছেন।

অতএব একজন দোষী ব্যক্তি মন্ত্রিত্বে থাকতে পারেন না। প্রশ্নটা তো এমনও হতে পারে, টেনেটুনে আমরা সাবেক এক অথবা বর্তমান আইনমন্ত্রীর ন্যায় আদালতের সাজা মওকুফের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে এক্ষেত্রে নিয়ে এসে বলতে পারি যে, রাষ্ট্রপতি সাজা মওকুফ করে দিলে তো খালাস! অতএব মন্ত্রিত্ব আর যাবে কেন? না, তা হয় না; আমরা সোজা মানুষ বুঝি, যিনি একবার দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তিনি পরে ক্ষমা পেলেও তার দোষ কিন্তু খণ্ডন হয়নি, তিনি দোষীই থেকে গেলেন।

আদালতও পরে ক্ষমা করে দিলে সেটা হবে আদালতের দয়া, দোষীকে আর অর্থদণ্ড বা জেল খাটার দণ্ড ভোগ করতে হবে না। সে ক্ষমা কোনোভাবেই দোষীর দোষ নেই বা দোষ হয়নি বা তিনি করেননি অর্থে সনদ হতে পারে না। খুনের দায়ে ফাঁসির আসামি রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত হলে তিনি ফাঁসিতে আর মরেন না; কিন্তু তার খুনের দোষ কি স্খলন হয়ে যায়? আমরা সোজা মানুষরা বলব, অবশ্যই যায় না। তিনি ওই ক্ষমার কারণে দয়ার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকেন, কিন্তু তিনি খুনিই থেকে যান।

আমাদের এ দেশে ভিন্নতর ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের বোকা বানিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে সাত খুনের ফাঁসির আসামিও রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে এ দেশে রাজনীতি করেন। কী অবাক কাণ্ড! সাত সাতটি খুন করে দোষী প্রমাণিত হলেন, আদালত ফাঁসির আদেশ দিলেন, রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দিলেন, আর অমনি তিনি সাফ-সুরত হয়ে গেলেন! অতএব তিনি রাজনীতি করবেন, নেতা হবেন, সংসদ সদস্য হবেন, কী না হবেন? তাকে তো মন্ত্রীও করা যাবে, দোষ কিসের? আমরা এমন ব্যাখ্যা মানি না, মানতে চাই না, মানবও না।

আপনারা জোর করে আমাদের ওপর আপনাদের ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিলে আমরা কিছুই করতে পারব না জানি, কিন্তু মনে মনে তো ঘৃণা করতে পারব, নাকি? একজন মন্ত্রী যখন শপথ গ্রহণ করেন, তখন সে শপথে সংবিধান রক্ষার অঙ্গীকার যেমন থাকে, তেমনি কারও প্রতি অনুরাগ-বিরাগের বশীভূত না হওয়ার অঙ্গীকারও থাকে। তাহলে আদালত অবমাননা কি তার শপথ ভঙ্গে পড়ে না? তিনি কি অনুরাগ-বিরাগের বশীভূত না হলে আদালত অবমাননার মতো কাজ করতে পারতেন? আমরা সোজা সরল মানুষ হলেও বুঝতে পারি, আদালত সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত বলে আদালত অবমাননা সংবিধান অবমাননার মধ্যে পড়ে। সেক্ষেত্রে কি মন্ত্রীর শপথ ভঙ্গ হয় না?

যাকগে, অত আঁতেল মার্কা প্রশ্ন আমাদের মানায় না; কিন্তু এটা তো আমরা বলতে পারি যে, যিনি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত না হন, তিনি সাজাপ্রাপ্ত, তিনি দোষী। আমরা দোষী ব্যক্তিকে মন্ত্রী বলতে নারাজ, তাকে সম্মান করতে নারাজ, তাকে শ্রদ্ধা করার তো প্রশ্নই ওঠে না। হ্যাঁ, পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর কোনো সুযোগ থাকলে তারা যদি আদালত থেকে খালাস হতে পারেন সেটা হবে ভিন্ন কথা। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর তারা কোন ফাঁক-ফোকরে পরে আবার খালাস হবেন?

আদালতই বা পরে কোন বিবেচনায় তাদের ক্ষমা করবেন? আদালতের বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারব না, কিন্তু আমরা বলব যে তারা আমাদের কাছে আদালতের রায়ের পর দোষী হয়ে গিয়েছেন। অতএব তারা আর মন্ত্রী নন, আমরা তাদের মন্ত্রী মানছি না। প্রশ্ন উঠবে, আমরা মানি বা না মানি তাতে তাদের কিছু আসে-যায় না, কেননা প্রধানমন্ত্রী তো তাদের মন্ত্রিসভায় রেখেছেন, তারা অবশ্যই সরকারি খাতায় মন্ত্রী রয়ে গেছেন। হ্যাঁ, তারা মন্ত্রী রয়ে গেছেন বলেই তো ২৮ মার্চ সোমবার তারা মন্ত্রিসভার বৈঠকেও হাজির হয়েছেন, মন্ত্রণালয়ে অফিসও করেছেন।

এতদ্বিষয়ে আমরা আওয়ামী লীগ (আলী) সরকারের প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবও একটু অনুধাবনের চেষ্টা করতে পারি হয়তো। আপাতত দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী বেশ কৌশলী হয়েছেন। আদালত অবমাননার দায় তার দল বা সরকার নেয়নি এটা তার বক্তব্যে, যদি আমরা বুঝতে ব্যর্থ না হয়ে থাকি, স্পষ্ট হয়েছে।

অতএব তিনি বাহবা পাওয়ার যোগ্য হয়েছেন। কিন্তু তার মন্ত্রী দু’জনের সঙ্গে আইনমন্ত্রী এবং তার এক সাবেক আইনমন্ত্রী যেভাবে মন্ত্রিত্ব না যাওয়ার পক্ষে সংবিধানের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, তা তো ওই মন্ত্রীদ্বয়ের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন বোঝা যেতে পারে। আদালত অবমাননার দ্বারা শপথ ভঙ্গ হয়েছে কী হয়নি সে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য তারা কি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ? প্রধান বিচারপতি যেহেতু ইতিপূর্বে সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে মন্ত্রীদের সংবিধান লংঘনের পরিণতি কী হতে পারে মর্মে প্রশ্ন তুলেছেন (প্রথম আলো, ২১ মার্চ, ’১৬) সেহেতু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগে শপথ ভঙ্গ হয়েছে কী হয়নি তার ব্যাখ্যা সাবেক আইনমন্ত্রী বা বর্তমান আইনমন্ত্রীর দেয়া কি ‘কেমন কেমন’ ঠেকে না?

সংবিধান লংঘন হয়েছে মর্মে তো প্রধান বিচারপতি বলেছেনই। তাহলে এখন ‘শপথ ভঙ্গ হয়নি’ আবার কেমন কথা? এর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়ার এখতিয়ার তো সর্বোচ্চ আদালতের, কোনো সাবেক বা বর্তমান আইনমন্ত্রীর নয়- এমনই আমরা সোজাভাবে বুঝতে চাই। আমাদের মনে হয়, সাবেক ও বর্তমান আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে সাজাপ্রাপ্ত দুই মন্ত্রী উজ্জীবিত হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীও ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ কৌশলে চুপ হয়ে আছেন। তার ভাবটা মনে হয় এমন যে, তারা মন্ত্রী থেকে যেতে পারলে থাক না, আমি তো দলের বা সরকারের পক্ষ থেকে তাদের আদালত অবমাননার দায় নেইনি।

আমরা বলব, ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেলেও আমরা তা মেনে নেই এজন্য যে, অন্য কোনো প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে, বাজাদ (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) নির্বাচনে না এলে আলীর কীই বা করার থাকে। কারও ‘মামার বাড়ির আবদারে’ তো আর সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক আদালত অবমাননার দায়ে সাজা পেলে কোনো মন্ত্রীকে মন্ত্রিত্বে রেখে দেয়ার কোনো কৌশল জনগণ মেনে নিচ্ছে না। এতে আলী এবং আলী-সরকার জনপ্রিয়তা হারানোর পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলা যেতে পারে।

জনগণ আলী-সরকারকে, বিশেষত শেখ হাসিনাকে পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় দেখতে আগ্রহী। উন্নয়নের ধারাবাহিকায় এ সরকার খুব জনপ্রিয়। এ জনপ্রিয়তার কারণে উপজেলা, সিটি, পৌর, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বেশ অনিয়ম হলেও মানুষ হজম করে যাচ্ছে বটে; কিন্তু এ দুই মন্ত্রীর মন্ত্রিত্বে বহাল থাকা বা কৌশলে ‘দেখি কী হয়’ ভাবে বহাল রাখা জনগণ মেনে নিতে চাচ্ছে না। প্রাতঃভ্রমণ থেকে শুরু করে যেখানেই এ আলোচনা হচ্ছে সেখানেই একই কথা, এমনকি গোঁড়া আলী সমর্থকদেরও, সাজাপ্রাপ্ত দুই মন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব থাকা সমীচীন নয়।

জনগণ আশা করে, শেখ হাসিনা তাদের সরিয়ে দেবেন। আমরা নিশ্চিত বলতে পারি যে, কামরুল আগেও বেশ সমালোচিত হয়েছেন, গম কেলেংকারিতেও তিনি পচা গমের মতোই পচেছেন; এমন ‘পচা’ একজন আলী-সরকারের মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ পড়লে সমুদ্রের বিন্দুসম জল যাওয়ার মতোই হবে শুধু, আলী বা সরকারের কিছুই হবে না; বরং জনপ্রিয়তা বাড়বে, জনগণের সরকারের বিশেষত শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা বাড়বে। আর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোজাম্মেল তো আলীর বড় কোনো সম্পদ নন, এমন এক মন্ত্রী থাকলেই কী, না থাকলেই কী।

আমরা এমন চালাকি পছন্দ করি না যে, সাপও মরুক, লাঠিও না ভাঙ্গুক। অতএব আলীর কাউন্সিলের পর রদবদলে এ বিষয়টির সুরাহা হওয়া উচিত। দুই মন্ত্রীকে বাদ দিলে বাজাদ কোনোভাবেই রাজনৈতিক ফায়দা নিতে পারবে না, বাজাদের কোনো গলাবাজিও জনগণ গ্রহণ করবে না, কেননা বাজাদ এখন জীবন্মৃত এক রাজনৈতিক দল। অতএব নিজের দু’জন মন্ত্রীকে সরিয়ে আলী-সরকারই তথা শেখ হাসিনাই বেশি লাভবান হবেন। তাই আমরা জোর গলায় বলতে চাই, সাজাপ্রাপ্ত মন্ত্রীর মন্ত্রিত্বে থাকা অসমীচীন বিধায় তাদের অবিলম্বে সরানো হোক। এ মন্তব্য প্রতিবেদনটি যুগান্তরকে দেয়া এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমানের।

আরো পড়ুন

 আইনমন্ত্রী ‘তাহলে কি করলে মন্ত্রীদের শপথ ভঙ্গ হয়??

http://sheershamedia.com/?s=%E0%A6%86%E0%A6%87%E0%A6%A8%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%80