ব্রেকিং নিউজ

রাত ৮:৫৭ ঢাকা, শনিবার  ২২শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের কারণ ও অর্থের উৎস খুঁজুন : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে তাঁর দৃঢ় সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করে এই অশুভ শক্তিকে পরাজিত করতে এর কারণ ও অর্থের উৎস খুঁজে বের করার আহবান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ একটি বিশ্বব্যাপী উদ্বেগজনক সমস্যা। এই সভ্যতা বিনাশী প্রবণতা নির্মূলে এর কারণ, উৎস ও প্রতিকারের উপায় নিরূপণ জরুরি।’ তিনি বলেন, তাঁর সরকার জঙ্গি নির্মূল ও সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রয়োজনীয় সব রকম ব্যবস্থা নিয়েছে।

শেখ হাসিনা আজ সকালে মিরপুর সেনানিবাসে ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০১৬’ (এনডিসি) এবং ‘আমর্ড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০১৬’ (এএফডব্লিউসি)-এর গ্রাজুয়েশন অনুষ্ঠানে প্রদত্ত প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

 ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।

এ সময় মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যবৃন্দ, বিদেশি কূটনিতিকবৃন্দ এবং সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপর্যায়ের কমকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনে তাঁর সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রশিক্ষিত ও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের মাটিকে অতীতের মতো সন্ত্রাস বা বিছিন্নতাবাদী তৎপরতার জন্য আর কখনো কেউ ব্যবহার করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে।

তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশসমূকে সর্বদাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সহযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রেখে নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করতে হয়। এ প্রেক্ষিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তাদের অর্থনীতিকে বহুমুখী ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নিজেদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিভিন্ন নিরাপত্তাজনিত সমস্যা নিরসনে তাঁর সরকার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল একটি সমন্বিত আঞ্চলিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা। ইতোমধ্যে সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের সূচনা প্রত্যক্ষ করেছি। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিগত আট বছরে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতিসহ পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্ব-রাজনীতিতে এই রাষ্ট্রের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে আঞ্চলিক ঐক্য উন্নয়নে বাংলাদেশ অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

তিনি বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জনগণের অর্থনৈতিক স্ব-নির্ভরতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের অনুসৃত নীতি ও কৌশল গতির সঞ্চার করেছে। দেশের অর্থনীতির ক্রমাগত বিকাশ ও উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে সফলতার পাশাপাশি কিছু কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান।

গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে প্রধানিমন্ত্রী আস্থা প্রকাশ করে বলেন, সদ্যসমাপ্ত প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান দিয়ে আপনারা সে চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলা এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে সরকারকে যথাযথ সহায়তা করতে পারবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জেনে আনন্দিত যে- আপনারা বাংলাদেশ ও সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন। যার মধ্যে সামাজিক ও রাজনীতি বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো যুগোপযোগী বিষয় রয়েছে। আপনারা দেশের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানে ভবিষ্যত কর্মপন্থা সম্পর্কেও জ্ঞান লাভ করেছেন। যার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োগ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রগতির ধারাবাহিকতাকে আরও বেগবান করবে।

শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতা মানুষের মাঝে পারস্পারিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করছে। যা জীবনযাত্রাকে সহজতর করছে। আবার মাঝে মাঝে প্রতিকুল পরিবেশও তৈরি করছে। তাই, আমরা জাতীয় অগ্রগতি এবং নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারকেও উৎসাহিত করছি। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখেই আপনাদের প্রশিক্ষণ সূচি প্রণীত হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের উচ্চমানের প্রশিক্ষণের জন্য ১৯৯৬ সালের আগে নিজস্ব কোনো প্রতিষ্ঠান ছিলো না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের উচ্চশিক্ষার কথা বিবেচনা করে তাঁর সরকারের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদকালে এনডিসি প্রতিষ্ঠা করেছে। যা বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের খ্যাতি ও বহির্বিশ্বে এর অবস্থান আমাদের জন্য সত্যিই একটি গর্বের বিষয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরেই নয়, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ স্ট্র্যাটেজিক স্তরের একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে অসামরিক পরিম-লেও সমাদৃত হচ্ছে। তাঁর সরকার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে এ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে।

তিনি বলেন, এনডিসি পরিচালিত ‘ক্যাপস্ট্যান কোর্স’-এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিনির্ধারক পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের ওপর সম্যক জ্ঞান লাভ করছেন। অসামরিক-সামরিক সম্পর্ক উন্নয়নে নিঃসন্দেহে এনডিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে তাঁর সরকার নতুন প্রযুক্তি সম্বলিত আধুনিক সরঞ্জামাদির সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। সর্বোত্তম প্রশিক্ষণ প্রদানের তাগিদে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অবকাঠামো তৈরি করেছে এবং একটি পেশাদার ও প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনবরত কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা পরিবর্তনশীল যুদ্ধ-কৌশল ও প্রযুক্তির দিকে নিবিড়ভাবে লক্ষ্য রাখছি। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সামর্থ্যকে পুনর্মূল্যায়ন করে যাচ্ছি এবং একবিংশ শতাব্দির বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য সময়োচিত সকল পদক্ষেপ গ্রহণে সচেষ্ট আছি।

দেশ ও জনগণের সেবায় সশস্র বাহিনীর গৌরবজনক ভূমিকা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা যেকোন দুর্যোগ ও বিপর্যয়ে নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে জনগণের পাশে দাঁড়ায়। অবকাঠামো নির্মাণেও তাদের নির্ভরযোগ্যতা দেশে-বিদেশে সমাদৃত।

তাঁর সরকারের আমলে দেশের বিভিন্ন উন্নয়নের খন্ড চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিরতিহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একটি উন্নত ও আধুনিক দেশের জন্য প্রয়োজনীয় গভীর সমুদ্রবন্দর, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মেট্রো-রেল, আন্তঃদেশীয় রেল প্রকল্প এবং এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ও কর্নফুলি নদীর তলদেশে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। আমাদের আগে অতীতে অন্য কেউ অবকাঠামো খাতের এই যুগান্তকারী প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের কথা ভাবেনি। এ প্রসঙ্গে তিনি সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার কথা উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ এক বছরের কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের পথ পেরিয়ে গৌরবজনক এনডিসি ও এএফডব্লিউসি কোর্স শেষ করায় দেশি-বিদেশি গ্রাজুয়েটদের আন্তরিক অভিনন্দন জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে আমরা ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, এই প্রতিষ্ঠানটি আজ তার সেই অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান যা দেশ ও বিদেশের উচ্চপদবির অসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের মাঝে যথাযথ জ্ঞানশৈলী চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ হতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে থেকে পরবর্তীতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সেনা-নৌ-বিমান বাহিনী প্রধান ও পুলিশ প্রধানের মতো রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সফল উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সম্মানিত সংসদ সদস্যবৃন্দসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ বর্তমানে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ক্যাপস্ট্যান কোর্সে অংশগ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজকে এই মান বজায় রাখতে হবে এবং তার ক্রমাগত উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি আশাবাদী যে- ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ তাদের অর্জিত জ্ঞান, ইচ্ছাশক্তি এবং অঙ্গীকার দ্বারা জনগণ তথা দেশকে স্থিতিশীল পরিস্থিতি, উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

অত্যন্ত উঁচুমানের পেশাদারিত্বের জন্য ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট এবং অন্যান্য অনুষদ সদস্যগণ ও অফিসারদের প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে এবং এই প্রতিষ্ঠানের সর্বাঙ্গীন সাফল্যও কামনা করেন।

এ বছরের ডিফেন্স সার্ভিসেস কোর্সে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, প্রশাসন, পুলিশ এবং ফরেন সার্ভিসের ৫২ জন সদস্য এবং ১২টি বন্ধু রাষ্ট্রের ২৬ জন সদস্য অংশ গ্রহণ করেন।

একই সাথে আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্সে সেনাবাহিনী থেকে ২৫ জন লে. কর্নেল, নৌবাহিনী থেকে একজন ক্যাপ্টেন এবং চারজন কমান্ডার এবং বিমানবাহিনী থেকে দু’জন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এবং তিনজন উইং কমান্ডার অংশগ্রহণ করেন।