শীর্ষ মিডিয়া

ব্রেকিং নিউজ

দুপুর ১২:৪৭ ঢাকা, শনিবার  ১৫ই ডিসেম্বর ২০১৮ ইং

সত্য বললে রাজাকার, মিথ্যা বললে পুরুস্কার


ডক্টর তুহিন মালিক

মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লেখার সৎ সাহসী লোকগুলো আজ কোথায় হারিয়ে গেল নির্মোহ ইতিহাস লেখার সাহস হয়তো কোনো দিনই পাবেন না জেনারেল সফিউল্লাহ বীরউত্তমদের মতো ব্যক্তিরা। পঁচাত্তর-পরবর্তী তার ভূমিকা যে বড়ই বিতর্কিত। আওয়ামী লীগের মধ্যেই তাকে নিয়ে রয়েছে বিশ্বাসহীনতা আর অস্বস্তিবোধ। এই বয়সে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একচুল পরিমাণ সত্য লেখার সৎ সাহস অর্জন করা তার পক্ষে কঠিনতম। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্যেও এমন কেউ নেই, যে কি না সত্য লেখার জন্য কলম ধরবেন। কী করে ইতিহাস লিখবেন একজন উপদেষ্টা খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভার শপথের গল্পে ঘিরে আছে তার নাম। মওদুদের ভায়রা আরেক উপদেষ্টা ছিলেন দক্ষ আমলা। তিনি ঠিকই জানেন কলম ধরার বিপদের কথা।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা এভাবে আজ পর্দার আড়ালে চলে গেছেন। নূরে আলম সিদ্দিকী রীতিমতো আওয়ামী ঘরানায় একজন অবাঞ্ছিত ব্যক্তি। কেবল আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সমালোচনা করায় মাহমুদুর রহমান মান্না, অধ্যাপক আবু সাঈদ বা সুলতান মনসুররা আজ আওয়ামী ডিকশনারিতে রীতিমতো ‘মীরজাফর’তুল্য। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী তো অনেক আগেই নব্য রাজাকারের উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। শেখ হাসিনার ঐকমত্যের সরকারের এক সময়ের মন্ত্রী আসম আবদুর রব অনেকটাই শাসক দলের শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। অসুস্থ শাজাহান সিরাজ সুস্থ থাকলেও বোধহয় কোনো লাভ হতো না। ইমেজ-সংকট আর জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ মুক্তিযুদ্ধের অন্য নেতারা অনেক আগেই হারিয়ে গেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আজ আওয়ামী রাজনীতির চক্ষুশূল। তার গৌরবময় অবদান ও কীর্তি একেবারেই মানতে নারাজ তারা। তাজউদ্দীনকে হত্যা করতে চেয়েছিল মুজিব বাহিনীÑ এ কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াচ্ছেন তাজউদ্দীন আহমদের বড় মেয়ে শারমিন আহমেদ। তার লেখা ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’ বইটির প্রতিটি পাতার ভাঁজে ভাঁজে লুকানো আছে ইতিহাসের অনেক নির্মম সত্য আর ভয়ঙ্কর সব তথ্য।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের ১৯ জন মন্ত্রী যখন আনন্দচিত্তে মন্ত্রিত্বের শপথ গ্রহণ করে, তখন দলের অকুতোভয় যারা ছিলেন আজ তারাই দলের সবচেয়ে বড় শত্রু। গর্তে লুকানো রক্ষীবাহিনীর নেতারা আজকে বড় বড় পদে। অথচ দল বা সরকারে কোনো জায়গা নেই ইতিহাসের সাক্ষী ড. কামাল হোসেন আর ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামদের মতো ত্যাগী মানুষদের। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, মুজিবনগর সরকার গঠন এবং সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস সবচেয়ে বেশি তারাই জানেন। মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি সব চরিত্রকে আওয়ামী লীগই বিতর্কিত করেছে বলে অনেকেই মনে করেন।

এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকার সম্প্রতি তার লেখা বইয়ে নতুন কিছু কী লিখেছেন ৭ মার্চের ভাষণে ‘জিয়ে পাকিস্তান’ শব্দ দুটির কথা এর আগে নির্মল সেন ‘আমার জীবনে ৭১-এর যুদ্ধ’ বইতে লিখেছেন। আরেক সেক্টর কমান্ডার কাজী নুরুজ্জামান ‘রিমেমবারস বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার ১৯৭১’ বইতে লিখেছেন। আহমেদ ছফার প্রবন্ধ সংকলন থেকে সলিমুল্লাহ খানের সম্পাদনায় ‘বেহাত বিপ্লব ১৯৭১’ বইতেও এ কথা বলা আছে। অলি আহাদের ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫’ বইতে এ কথা আছে। ২০১১ সালের ৭ মার্চ তারিখের এক পত্রিকায় আতাউস সামাদের ‘যেভাবে আমরা পেলাম দিনটি’ শীর্ষক কলামেও একই কথা আছে। বদরুদ্দীন উমরের লেখা ‘আমার জীবন (তৃতীয় খ-)’ বইতে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ‘বাংলাদেশের তারিখ’ নামের বইয়ের প্রথম সংস্করণে তিনিও তাই লিখেছেন। কবি শামসুর রাহমান নিজেও তার স্মৃতিচারণমূলক বই ‘কালের ধুলোয় লেখা’ বইতে লিখেছেন যে বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা, জিয়ে পাকিস্তান’ বলে তার বক্তব্য শেষ করেছিলেন।

এই বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ‘৯৬-এর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায়ই এ নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ এবং ‘দেয়াল’ গ্রšে’ এই তথ্য সন্নিবেসিত করলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, একে খন্দকার আওয়ামী সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী থাকাকালীন প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ গ্রšে’ও একই তথ্য প্রকাশ করলে তখন কেউ তাকে রাজাকার বা পাকিস্তানের এজেন্ট বলেনি!

আমাদের রাজনৈতিক চরিত্রগুলো সুপারম্যান বা সুপার ভিলেনের। এখানে রক্ত-মাংসের কোনো মানুষের চরিত্র যেন থাকতে নেই। বঙ্গবন্ধু রক্ত-মাংসের একজন মানুষ ছিলেন। তিনি কোনো সুপারম্যান নন। তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক নেতা। রাজনৈতিক কলাকৌশল মেনেই তাকে রাজনীতি করতে হয়েছিল।

এ দেশের মুক্তি সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। নেতৃত্বের ফলেই তিনি মহানায়ক হয়েছিলেন। যারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাণিজ্য করে, বঙ্গবন্ধুর নাম বিক্রি করে সংসার চালায়, তারা বঙ্গবন্ধুর সমালোচনাকে সহ্য করতে পারে না নিজেদের বাণিজ্য ঘাটতির ভয়ে। এই অবিবেচকরাই বঙ্গবন্ধুকে ৭ মার্চের ভাষণে আর মুজিব কোটে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চায়। মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু তার সব সীমাবদ্ধতা নিয়েই ইতিহাসের মহানায়ক হয়েছিলেন। স্বাধীনতা নিয়ে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা কোনোক্রমেই তার অবমাননা হতে পারে না। সমালোচনার অধিকার আমাদের প্রত্যেকের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার। সমালোচনা করলে বঙ্গবন্ধু কখনো খাটো হওয়ার নন। আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর পরিবার কেন সমালোচকদের ঘোর শত্রু মনে করে বঙ্গবন্ধু চরিত্রের মূল উপাদানও তো শাসকদের সমালোচনায় মহিমান্বিত।

মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এবং যার সম্মুখে হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে সেই বীর সেনানী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকারকে রাজাকার, কুলাঙ্গার বা আইএসআইর এজেন্ট বলা চরম দুঃখজনক ও লজ্জাকর। দেউলিয়া রাজনীতির এ কোন হিংস্র শিকারে পরিণত হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের এহেন কাজে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নবিদ্ধ ও হাস্যকর হয়ে ওঠে। এ দায় কাদের ওপর বর্তাবে এমন প্রশ্ন সবার।

এগুলো নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত করে জ্বালাময়ী ভাষণ আর কুলাঙ্গার-রাজাকার আখ্যা দিয়ে মাঠ গরম করা যায় সত্যি। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে মানুষের মনে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগও পাকাপোক্ত করা হয়। জাতীয় জীবনে এটি একটি ভয়ঙ্কর খেলা। কারণ ৭ মার্চের ভাষণ যারা রেডিওতে শুনেছেন বা যারা সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন তাদের অনেকেই এখনো জীবিত আছেন। আরও ভয়ঙ্কর হচ্ছে, এখনো হয়তো সেই ভাষণের টেপ ভারত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বন্ধুপ্রতিম দেশের হাতে রয়েছে। অনর্থক এগুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়।

এ কেমন নীতি সত্য বললে দেশদ্রোহী রাজাকার! আর মিথ্যা বললে পদ-পদক পুরস্কার! সারা জাতি আজ পদ পুরস্কারের মোহে আবদ্ধ। ক্ষমতা আর অর্থের লোভে সত্য আজ নির্বাসিত। আসলে আমাদের জ্ঞান প্রবেশ করে দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি দিয়ে। আর লোভও কিন্তু সে রকমই চোখ আর কান দিয়েই প্রবেশ করে। কিন্তু আমাদের মন একসঙ্গে দুটোকে মনের মাঝে জায়গা দিতে পারে না। তাই মনের মাঝে লোভ জায়গা দখল করে বসলে তাতে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায় অনায়াসে। এই লোভী রাজনীতির কবল থেকে মুক্ত করতে হবে আমাদের মহান অর্জনগুলোকে। ইতিহাস নিয়ে বাণিজ্যিক চর্চা না করে আমাদের আগামীর গৌরবময় ইতিহাস রচনার কাজ শুরু করতে হবে। এটিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ডক্টর তুহিন মালিক সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০১৪  ফেসবুকে আজ লিখেছেন তা হুবাহু তুলে ধরা হল ।

লেখক : আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ