ব্রেকিং নিউজ

রাত ৪:৫৭ ঢাকা, মঙ্গলবার  ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

“শ্রমিকের মূল্যই আমার সরকারের কাছে সবচেয়ে বড়”- প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শ্রমিকের মূল্যই তাঁর সরকারের কাছে সবচেয়ে বড়। তিনি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য শিল্প কারখানায় শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘উৎপাদন বাড়াতে হলে আমাদের মালিক-শ্রমিকের একটা সুন্দর সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। মালিকদের মনে রাখতে হবে যে, শ্রমিকের উৎপাদনমুখী কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হলে শ্রমিকরা আনন্দের সাথে কাজ করবে। এতে উৎপাদন ও পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। পক্ষান্তরে বেশী লাভবান হবে মালিকরাই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা একান্তভাবেই জরুরী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষই বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঐতিহাসিক মে দিবস উপলক্ষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

শ্রমিকরা যে কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, সেই কারখানা যাতে টিকে থাকে এবং সেটা যেন ভালভাবে চলে সেটার কিছু দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরো বলেন, উভয় পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। এই দায়িত্ববোধটা সকলের মাঝে থাকতে হবে এবং মালিক-শ্রমিক একটা সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

pm253

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক চুন্নু। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন জাতীয় সংসদের শ্রম ও কর্ম সংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান এবং আইএলও’র কান্ট্রি ডিরেক্টর শ্রিনিবাস বি রেড্ডি।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপার অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ এবং মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ এপ্লয়ার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি সালাউদ্দিন কাশেম খান বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, মুখ্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম সহ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, মন্ত্রী পরিষদ সদস্য বৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, কূটনৈতিক মিশনের সদস্যবৃন্দ, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ, শ্রমিক ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধিগণ এবং সাধারণ শ্রমিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী দেশে বিদ্যমান উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার আহবান জানিয়ে বলেন, ‘এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আমরা লক্ষ্য অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা সম্ভব হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বিশ্বাস করি আমাদের এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। আজকে প্রবাসে যেই শ্রমিকরা যান তাদের কল্যাণের জন্য সরকার বহুবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি বলেন, তাদের স্মার্ট কার্ড দেয়া হচ্ছে। যেখানে সকল তথ্য থাকে। তাদের অনলাইনে রেজিষ্ট্রেশন করা হয়। তারা কোথায় কাজ করবে, বেতন কত পাবে, আদৌও তারা বেতন পাচ্ছে কিনা, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এসব বিষয় তদারকির ব্যবস্থাও আমরা নিয়েছি।

অতীতে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির দুরবস্থার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে শ্রমিকদের কল্যাণের কোনরকম উদ্যোগই ছিল না। কোনরকম পার (সীমান্ত) করতে পারলেই তারা ভাবত বিরাট একটা কাজ করে ফেলেছি।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর প্রবাসের শ্রমিকদের কল্যাণে বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শ্রমিকের মূল্যই তাঁর সরকারের কাছে সবচেয়ে বড়। ‘তাদের হাতেই দেশের অর্থনীতি সচল থাকে। তাদের কারণেই দেশ উন্নত হয়।’

প্রধানমন্ত্রী মহান মে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, এক সময় আমেরিকায় কোন শ্রমিক অধিকারের অস্তিত্ব ছিলো না। তাদের ক্রীতদাসের মত ব্যবহার করা হত। সেই আমেরিকার শিকাগো শহরে বুকের রক্তের বিনিময়েই শ্রমিকদের অধিকার আদায় করতে হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী ১৮৮৬ সালের ১ মে শ্রমিকের অধিকার আদায়ে শহীদদের স্মরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী এদেশে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, জাতির পিতার সকল আন্দোলন-সংগ্রামে, সকল উদ্যোগেই শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি অগ্রাধিকার পেয়েছে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি স্বাধীন দেশ গড়তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের একাগ্রতার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন মা যেমন তাঁর রুগ্ন শিশুকে পরিচর্যা করে, তেমনি বঙ্গবন্ধুও ধ্বংসপ্রাপ্ত শিল্প কারখানা একের পর এক গড়ে তুলে শ্রমিকের কর্মসংস্থান করেছিলেন। তিনিই প্রথম পহেলা মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন।

পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক অধ্যায়ের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতাকে হত্যার পর লাভজনক নয় এই কথা বলে অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। পরের সরকারগুলোর আমলেও কারো কারো প্রেসক্রিপশনে এদেশে শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু মাথা কেটে ফেলা কোন সমাধান নয়। আমরা মনে করি কারখানা খোলা রেখেই দেশের উন্নয়ন হবে।

তৈরি পোশাক শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে সরকারি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বেতন বাড়ানোর জন্য তিনিই ছিলেন শ্রমিক পক্ষের ’বার্গেনিং এজেন্ট’। ’৯৬ পরবর্তী তাঁর সরকারের প্রচেষ্টায় এবং ২০০৯ সালের বিশেষ উদ্যোগের ফলে শ্রমিকদের মজুরি কয়েক দফায় বেড়ে বর্তমানে পাঁচ হাজার তিন শ’ টাকা হয়েছে। এজন্য মালিক পক্ষের অনেক দাবিও সরকার মিটিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে উন্নত করতে হলে নতুন নতুন শিল্পকারখানা চালু করতে হবে, শ্রমিকদের স্বার্থও দেখতে হবে। কারণ তাদের শ্রমেই তো দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকদের মূল্য আওয়ামী লীগের কাছে অনেক বেশি। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই তাঁর সরকার এগিয়ে চলছে।

তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে রমজান মাসেও আন্দোলনরত শ্রমিকদের হত্যা করা হয়েছিল। সারের দাবিতে আন্দোলন করা ১৮ জন শ্রমিককে লাশ হয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছিলো। কিন্তু এখন দেশে সে অবস্থা নেই। দেশের শ্রমজীবী মানুষ এখন নিয়মিত বেতন-ভাতা, মজুরি পাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অনেক বন্ধ কারখানা চালু করেছি। অনেক কারাখানার যন্ত্র পুরাতন হয়ে গেছে। সেগুলো দিয়ে ভালো উৎপাদন করা সম্ভব না। তাই সেগুলো চালু করতে যা যা করা দরকার আমরা করছি।

সারাদেশে প্রায় একশ’টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সরকারি উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী যত্রতত্র শিল্প কারখানা গড়ে না তুলে এসব অঞ্চলে শিল্প কারখানা গড়ে তোলার জন্য শিল্প উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, যত্রতত্র জমি কিনে শিল্প গড়ে না তুলে সারাদেশে অন্তত একশো অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। সেখানে বিনিয়োগ করুন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিল্পাঞ্চলে জলাধার সহ পরিবেশবান্ধব সব বিষয় থাকা এবং শ্রমবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

শ্রমিকদের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি, যেন শ্রমিকরা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে নূনতম সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে তৈরী পোষাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থার জন্য সরকারি উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রীয় খাতের শ্রমিকদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর নির্দিষ্ট করেছি। আমাদের শতভাগ রপ্তানীমুখী শিল্পের জন্য কল্যাণ তহবিল গঠন করা হচ্ছে। মোট রপ্তানীমূল্যের দশমিক ৩ ভাগ অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে এই তহবিলে প্রদান করা হবে। এজন্য শ্রম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর অধীনে একটা বোর্ডও গঠন করা হবে।

তিনি বলেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমকেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। মাতৃত্বকালীন সময়ে ছুটি ও মজুরি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ সহ প্রি-প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা খাত পর্যন্ত দেশে বৃত্তি, উপবৃত্তি চালু করা হয়েছে। শ্রমিকদের মেধাবী সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য প্রয়োজনে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত বৃত্তি প্রদান করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত আমরা অনেক কাজ করেছি। মনে রাখতে হবে যে, সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য করতে আসেনি। আমরা দেশের কল্যাণ করতে এসেছি।

জনগণের কল্যাণ করাই তাঁর সরকারের লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই লক্ষ্য নিয়েই তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে। উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শ্রমিক-কৃষক তারা এদেশের মানুষ। তাদের জন্যই আমার এই রাজনীতি। আমার কাছে দাবি-দাওয়া করার প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই জানি কার কি সমস্যা। আর সেই সমস্যাগুলোর কথা চিন্তা করেই আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নেই।

জীবন-জীবিকার জন্য সকলকেই কষ্ট করতে হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা কথা মনে রাখতে হবে এই দেশটা আমাদের। দেশটাকে আমাদের গড়ে তুলতে হবে। দেশটাকে উন্নত করতে হবে। সমৃদ্ধশালী করতে হবে। তবেই সকলে ভালো থাকতে পারবেন। ভবিষ্যত বংশধরেরা আরো ভালো থাকবে। আমাদেও বাংলাদেশ উন্নত হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী জাতি। বিশ্বসভায় আমরা মাথা উঁচু করে চলতে চাই। আর মাথা উঁচু করে চলতে হলে কারো কাছে ভিক্ষা চেয়ে নয়, কারো কাছে হাত পেতে নয়। নিজেদের শ্রম, নিজেদের মেধা দিয়েই আমাদের দেশকে গড়ে তুলতে হবে।

তিনি জাতির পিতার ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সকলকে একযোগে কাজ করে যাবারও আহবান জানান।
আলোচনার পর মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।