শীর্ষ মিডিয়া

ব্রেকিং নিউজ

দুপুর ১:৩৯ ঢাকা, শনিবার  ১৫ই ডিসেম্বর ২০১৮ ইং

শেয়ার ব্যবসা জুয়ার কাছাকাছি এর দ্বারা অর্থনীতির কল্যাণ হয় না

শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি আলোচনার আগে এ-সংক্রান্ত কয়েকটি বিষয়ের আলোচনা করতে চাই। শেয়ার হচ্ছে মালিকানার অংশ। শেয়ার কিনে আমরা বিভিন্ন ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়ে থাকি। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, ওই কোম্পানির লাভে অংশীদার হওয়া, যাকে ডিভিডেন্ড বলা হয়। এটা সুদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ইসলামে সুদ অবৈধ এবং লভ্যাংশ বৈধ।
অন্য দিকে যারা নতুন ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান করতে চান, তাদের জন্য শেয়ার বিক্রি হচ্ছে ব্যাংক ঋণের বিকল্প পুঁজি সংগ্রহের উপায়। এ জন্য ক্যাপিটাল মার্কেট বা পুঁজিবাজার হচ্ছে ফিন্যান্সিয়াল মার্কেট বা অর্থবাজারের (ব্যাংক ব্যবস্থার) বিকল্প পুঁজি সংগ্রহের মাধ্যম। পুঁজি সংগ্রহ ও শেয়ার কেনা সহজ করার জন্য স্টক মার্কেটের উদ্ভব হয়েছে। নতুন পুঁজি সংগ্রহের জন্য প্রথমবারের মতো যখন শেয়ার ছাড়া হয়, তখন সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের নিয়মমাফিক শেয়ার ক্রয় করতে হয়। এগুলোকে প্রাইমারি শেয়ার বলা হয় এবং এগুলো ক্রয়-বিক্রয়কে প্রাইমারি মার্কেটের কাজ বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে যদি এসব শেয়ার বিক্রি বা ক্রয় করতে হয়, তা হলে তা নিয়মমাফিক করা যায় এবং এটাকে সেকেন্ডারি স্টক মার্কেট বলা হয়।

একটি কথা সবারই জানা দরকার যে, বর্তমানে স্টক মার্কেটে দৈনিক যে কমবেশি দু’হাজার কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়, তা নতুন পুঁজি নয়। এসব শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের প্রকৃত পুঁজি বৃদ্ধি পায় না। বেশির ভাগ শেয়ার মালিক এভাবে কেনাবেচাও করেন না। তারা শেয়ার কেনার পর সাধারণত তা ধরে রাখেন এবং যথাসময়ে কোম্পানির লভ্যাংশ পান। আমারও কিছু শেয়ার আছে। আমি এসব শেয়ার ধরে রেখেছি এবং দৈনিক বাজারে কী হচ্ছে তা খেয়ালও করি না। আমি প্রতি বছর লভ্যাংশ পেয়ে থাকি।

আর একদল লোক তারা মূলত শেয়ার ধরে রাখেন না, কেনেন এবং বেচেন। তারা সারা দিন ইন্টারনেটে নজর রাখেন কোনোটার দাম বাড়ছে এবং কোনোটার কমছে। তারা তাদের বুঝ মোতাবেক শেয়ার ছেড়ে দেন বা কেনেন। তারা লভ্যাংশের জন্য শেয়ার কেনাবেচা করেন না। তারা এ কাজ করেন কেনাবেচার মাধ্যমে মুনাফা করার জন্য। এটা এক নতুন পেশায় পরিণত হয়েছে।

এই পেশায় কিছু লোকের লাভ বা লোকসান অবশ্যই হয়। কিন্তু এর দ্বারা অর্থনীতির কোনো কল্যাণ হয়, এটা আমার মনে হয় না এই ব্যবসা অনেকটা জুয়ার কাছাকাছি। কারো মতে জুয়াই। কেনাবেচার এ চরিত্র দূর হতে পারে যদি কোনো শেয়ার কেনার পর তার বিক্রির ওপর শর্তারোপ করা হয় যে, অন্তত সাত দিন ধরে রাখতে হবে, না হলে তা জুয়া থেকে পৃথক করা কঠিন হবে। আমি আমার বন্ধুদের সব সময়ই বলি, তারা যেন এ ব্যবসায় থাকতে হলে এরকম কিছু দিন শেয়ার ধরে রাখেন। আরো একটি বিষয় হচ্ছে, মার্জিনে শেয়ার না কেনা। তা হলে সুদে জড়িয়ে যেতে হবে। যারা সুদ বৈধ মনে করেন না, তাদের এটি বাদ দিতে হবে। নগদে কেনাবেচা করতে হবে, তা হলে ফটকাবাজারি কমে যাবে। সামান্য মূল্য দিয়ে শেয়ার কেনার সুযোগ থাকার কারণেই বাজার অস্বাভাবিক স্ফীত হয়।

শেয়ারবাজার সারা বিশ্বেই পরিকল্পিতভাবে কিছু লোক প্রভাবিত করে থাকে, যাকে ম্যানিপুলেশন বলা হয়। ১৯৯৬ সালে যখন আমি ব্যাংকিং সচিব, তখন দেখেছি কিভাবে শেয়ারবাজারকে ম্যানিপুলেট করা হয়েছিল। আমি নিজেও এটা বন্ধ করতে সমর্থ হইনি। এ থেকে শেয়ারবাজারকে বাঁচানোর জন্য সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। সাধারণ জনগণকে সাবধান থাকতে হবে। তারা খুব চিন্তা করে শেয়ার কিনবেন। তারপর শেয়ার ধরে রাখবেন। তারা লভ্যাংশের জন্য শেয়ার কিনবেন। দরপতনে ঘাবড়াবেন না। সেটা ম্যানিপুলেশনেও হতে পারে। আবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এটা ঠিক হয়ে যাবে। ম্যানিপুলেটররা খুবই চালাক। তাদের মোকাবিলা করা কঠিন। সুতরাং তাদের ফাঁদে পা দেবেন না। দরপতন হলেই শেয়ার বেচে দেবেন না। এসব হতেই থাকবে। এটাকে বেশি গুরুত্ব দেবেন না।

আমার মনে হয়, আমাদের সাধারণ যুবকের শেয়ার কেনাবেচাকে প্রধান পেশা না করা সঙ্গত। এটা তাদের অতিরিক্ত ব্যবসা হতে পারে। এ ব্যবসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। লোকসানের সম্ভাবনা অনেক। অনেক প্রতারণা আছে এখানে। সবারই এ ব্যবসা সম্পর্কে সাবধান হওয়া উচিত। এসব কেনাবেচায় শেয়ারের কেবল হাতবদল হয়। এটা নতুন পুঁজি নয়। এর সাথে দেশের প্রকৃত উন্নয়নের কোনো সংযোগ নেই। সূত্রঃ নয়া দিগন্ত

লেখক : শাহ্ আব্দুল হান্নান, সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

Like & share করে অন্যকে দেখার সুযোগ দিন