ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৭:৪১ ঢাকা, শুক্রবার  ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

শিশু জিহাদকে উদ্ধারে রুদ্ধশ্বাস অভিযান অব্যাহত

খেলতে গিয়ে পাইপের ভেতরে পড়ে ৬০০ ফুট গভীরে চলে যায় শিশু জিহাদ। মৃত্যুকূপে থেকে বাঁচার আকুতি জানায় চার বছর বয়সী এই শিশু। খবর পেয়ে ওয়াশার রেলওয়ের ওই পরিত্যক্ত পাইপ থেকে তাকে উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ ঘন্টা শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান চালিয়েও জিহাদকে উদ্ধার করা যায়নি। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত ছিল। গতকাল বিকালে রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনীর মাঠসংলগ্ন পানির পাম্পে এ ঘটনা ঘটে।
গর্তের ওই পথে তুলনামূলভাবে সরু একটি পাইপ ঢুকিয়ে জিহাদকে উদ্ধারের একটি বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে রাত ১২টার পর ঘটনাস্থলে যান বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি প্রতনিধি দল। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান জানান, বুয়েটের প্রস্তাবিত এই পদ্ধতিকে তারা অনুসরণ করছেন। এই পদ্ধতিতে পাইপের নিচের অংশে এমন ব্যবস্থা থাকবে তা নিচে পৌঁছে গুটিয়ে রাখা একটি অংশ খুলে দেবে শিশুসহ তা উপরে উঠিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকবে। তার আগে শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য বশির আহমেদ নামের এক স্বেচ্ছাসেবী ঝুঁকি নিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করতে গর্তে নামতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাকে নামানোর প্রস্তুতি নিলেও পরে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। স্বেচ্ছাসেবী বশির এর আগে রানা প্লাজার উদ্ধার অভিযানেও অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
জিহাদকে উদ্ধারের জন্য রাত সাড়ে ১০ টার দিকে পাইপ টেনে তোলা শুরু করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ক্রেইন দিয়ে পাইপ টেনে তুলে শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, পাইপ টেনে তুলে উপর থেকে  তা কেটে ফেলা হয়। ওই সময়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মেজর শাকিল নেওয়াজ জানিয়েছেন, জিহাদ বেঁচে আছে বলেই মনে হচ্ছে। তার জন্য দড়িতে বেঁধে দুধের বোতল পাঠানো হয়েছে। তাকে জীবিত উদ্ধার করার আশা করছেন তারা।
তাকে উদ্ধারের জন্য প্রথমে পাইপের ভেতর রশি দিয়ে শিশুটিকে টেনে তুলার চেষ্টা করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। গর্তের মধ্যে রশি ছেড়ে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। ওপর থেকে ফেলা দড়ি চারবার ধরতে পারে জিহাদ। কিন্তু পাইপের ব্যস মাত্র এক ফুট হওয়ার কারণে তাকে তুলে আনা যায়নি। রশি দিয়ে চেষ্টা করার পর এতে কাঠ ও প্লাস্টিকের বস্তা ছেড়ে তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করা হয়। তাতেও ব্যর্থ হন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। অভিযান শুরুর দিকেই পাইপের ভেতরে অন্ধকারে আলো দেয়ার জন্য জিহাদের কাছে টর্চ লাইট পাঠানো হয়। সন্ধ্যার দিকে রশির সাহায্যে তার খাবারের জন্য জুস পাঠান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। শিশু জিহাদ এসব জিনিস পেয়ে সাড়া দেয় তারা জানান। তার আগে জিহাদের কান্নার শব্দ শুনে তারা নিশ্চিত হন যে সে বেঁচে আছে। রাত ১০ টার দিকে জিহাদ বেঁচে আছে কি-না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ওই গর্তে অক্সিজেন দেয়া হয়। সেই সঙ্গে একটি মাইক্রোফোন ও ক্যামেরা পাঠানো হয়েছে। এরমাধ্যমে তার কান্নার আওয়াজ শোনা গেছে বলে জানান উদ্ধারকর্মীরা।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (ঢাকা) রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনটি টিম নিয়ে শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য কাজ করা হয়। বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছি আমরা। তিনি জানান, জিহাদকে উদ্ধারের জন্য গর্ত ব্যস বড় করা হয়। এজন্য গর্তের পাশের দুটি পাইপ উত্তোলন করা হয় বলে জানান তিনি।
পাইপে আটকা পড়া জিহাদের পিতার নাম মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন। তার এক কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে জিহাদ ছোট। তিনি মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজের একজন প্রহরী। শাহজাহানপুরে রেলওয়ে কলোনির ৪১ নম্বর বিল্ডিংয়ে দ্বিতীয় তলায় স্ত্রী, সন্তান নিয়ে তিনি বাস করেন। তাদের গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুরের দামোটা উপজেলায়। অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলার সময় দুর্ঘটনাবশত পরিত্যক্ত পাইপের খোলামুখ দিয়ে গভীরে চলে যায় জিহাদ। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা প্রথমে জানান, জিহাদ প্রায় তিন শ’ ফুট গভীরে রয়েছে। পরবর্তীতে গর্তের ৪০০ ফুট গভীর পর্যন্ত স্ক্যান করা হলেও এতে জিহাদের অবস্থান পাওয়া যায়নি। রাত ১১ টায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, জিহাদ প্রায় ৬০০ ফুট গভীরে রয়েছে বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। সেখান থেকেই পাইপটি টেনে তুলে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
জানা যায়, গর্তের পাশে খেলাধুলা জিহাদসহ অন্য শিশুরা। তাদের একজন খেলার প্রয়োজনে গর্তের পাশে গেলে কান্নার শব্দ শুনে শুনতে পায়। পরে তারা আশপাশের লোকজনকে বিষয়টি জানায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। জিহাদ গর্তে পরে যাওয়ার সংবাদ শুনে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঘটনাস্থলের চারপাশে ভিড় করে। তাদের সামাল দিতে শাহজাহানপুর থানা পুলিশকে বেশ বেগ পোহাতে হয়। হৃদয় বিদারক এই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে রেলওয়ের সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমকে বরাখাস্ত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এস আর হাউজকে কালো তালিকাভূক্ত করা হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে। উদ্ধার তৎপরতার খোঁজ নিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল, বিএনপির ঢাকা মহানগরের আহবায়ক মির্জা আব্বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিএম এনামুল হক প্রমুখ।