ব্রেকিং নিউজ

বিকাল ৪:১২ ঢাকা, সোমবার  ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

লাখো কন্ঠে জাতীয় সঙ্গীত

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের ক্ষণটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আত্মসমর্পণের স্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে সমবেত কন্ঠে লাখো বাঙালী গেয়ে উঠলো জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা…’।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের ক্ষণটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এ আয়োজন করে বিজয় দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটি।
দুপুর একটায় দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। এ সময় তরুণ প্রজন্মকে আগামীর বাংলাদেশের শপথ পাঠ করান ‘বিজয় দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটি’র প্রধান উপদেষ্টা সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।
এছাড়া অনুষ্ঠানে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের কন্ঠে ‘মুক্তিযুদ্ধের গান’, ‘বিজয় আতশবাজী’ ছাড়াও বিজয় মঞ্চে তারকা ব্যান্ডদলের অংশগ্রহণে ‘কনসার্ট ফর ফ্রিডম’ এর আয়োজন করা হয়েছে।
গত বছরও ১৬ ডিসেম্বর ৪টা ৩১ মিনিটে বিজয় দিবস উদ্যাপন জাতীয় কমিটি কোটি কন্ঠে সম্মিলিতভাবে জাতীয় সঙ্গীতের আয়োজন করে। এবারের আয়োজনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মানুষের ঢল নামে। সকলের লাল-সবুজের পোশাক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে করে তুলেছে বর্ণিল।
এদিকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে রাজধানীবাসী আজ মহান বিজয় দিবসের ৪৩তম বার্ষিকী উদযাপন করছে। সেই সঙ্গে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী বাঙালীরা আগামী বিজয় দিবসের আগে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত ইসলামকে নিষিদ্ধের জোরালো দাবিও জানান।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ঢাকা পুরাতন বিমান বন্দর এলাকায় একত্রিশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির অনুষ্ঠানমালার সূচনা করা হয়।
সরকারি অনুষ্ঠানমালার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও নানা আয়োজনের মধ্যদিয়ে দিবসটি উদযাপন করছে। লাল-সবুজের পোশাকে সজ্জিত হয়ে লাখ লাখ মানুষ এসব অনুষ্ঠানে ভোর থেকেই অংশগ্রণ করছে। তাদের কেউ মাথায়, কেউবা কপালে জাতীয় পতাকা বেঁধে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় প্যারেড স্কয়ার, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ রাজধানীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থলে তারা বিজয় উৎসবের আনন্দ একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। সব ভেদাভেদ ভুলে ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবীসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে এক কাতারে এসে উৎসবে সামিল হতে দেখা গেছে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বিজয় উৎসবের শোভাযাত্রা বের করেছে। এর নেতৃত্ব দিয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এর আগে জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তৃতা করেন জোটের সাবেক সভাপতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু এবং সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ।
সভায় বক্তারা আগামী বিজয় দিবসের আগে জামায়াত ইসলামকে নিষিদ্ধের দাবি জানান। সেই সঙ্গে দেশী-বিদেশী নানা ষড়যন্ত্রের মধ্যদিয়েও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তারা ধন্যবাদ জানান।
জোটের শোভাযাত্রাটি শহীদ মিনার থেকে যাত্রা করে দোয়েল চত্বর, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন ও শাহবাগ হয়ে টিএসসিতে গিয়ে শেষ হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রটি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির এক মিলনমেলায় পরিণত হতে দেখা গেছে। এক ডজন ঘোড়ার গাড়ি ও ১৬টি ব্যান্ড দলে সজ্জিত বর্ণাঢ্য এ শোভাযাত্রায় ঠেলাগাড়ির উপর আরো ছিল সম্প্রতি প্রয়াত খ্যাতিমান শিল্পী কাউয়ুম চৌধুরীর কিশোর মুক্তিযোদ্ধার জীবন্ত প্রতিবিম্ব, শতাধিক প্লেকার্ড ও মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত নানা হাতিয়ারসহ বিভিন্ন সামগ্রী। শোভাযাত্রায় বিপুল সংখ্যক নারী-শিশু লাল-সবুজসহ নানা রঙের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় পোশাকে সজ্জিত হয়ে ও মাথায় ফুলের মুকুট পড়ে অংশগ্রহণ করে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বিজয় দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তরুণদের অংশগ্রহণই বেশি লক্ষ্য করা গেছে। ৩০ লাখ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে যে পতাকা বাঙালী পেয়েছে, তার স্থান মাথার উপরে থাকবে বলে প্রতিজ্ঞা করেন এবং স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে তা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়াই তাদের লক্ষ্য বলেও তরুণরা জানান।
রাজধানীর হাতির ঝিলের পশ্চিম পাড়, বাংলামোটর এলাকায় বিজয়ের দিনে স্থানীয় এলাকাবাসী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ও দেশাত্মবোধক বিভিন্ন গান পরিবেশন ও শিশু-কিশোরদের নানা ধরণের খেলাধুলার প্রতিযোগিতার মধ্যদিয়ে দিবসটি তারা দিবসটি উদযাপন করছে।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মসজিদে বিশে দোয়া পরিচালনা করেন বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা মো: সালাউদ্দিন।
দোয়ায় দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মার শান্তি কামনা করা হয়। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের অগ্রনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন খতিব
এদিকে বিজয়ের মাসে রাজধানীর বলাকা সিনেওয়ার্ল্ডে সপ্তাহব্যাপী ‘মুক্তিযুদ্ধ চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৪’ আয়োজন করেছে ঢুলী কমিউনিকেশনস। ১৯ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ উৎসবে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাতটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে।
ঢুলী কমিউনিকেশন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল মাহমুদ মানজুর জানান, উৎসবে ‘ওরা ১১ জন’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘জয়যাত্রা’, ‘গেরিলা’ এবং ‘মাটির ময়না’ প্রদশিত হবে।
চ্যানেল আই এবারও তেজগাঁওস্থ নিজ প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছে বিজয়মেলার। শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে সকালে মেলার উদ্বোধন করেন- সৈয়দ হাসান ইমাম, সুজেয় শ্যাম, সাইফুর রহমান প্যাটেল, কাজী রোজি, হাবিবুল¬াহ সিরাজী, অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরী, চ্যানেল আই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, রাশেদা কে. চৌধুরী, আবেদ খান প্রমুখ।
এ সময় মুক্তিযুদ্ধের চিত্রাঙ্কণ করেন মনিরুজ্জামানসহ নবীন-প্রবীণ চিত্রাঁকিয়েরা। ছোটদের বিজয় দিবসের চিত্রাঙ্কণ শেষে সেরা দশজনের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন স্বপ্ন’র পক্ষে মো. শামসুদ্দোহা শিমুল। লাল সবুজের বর্ণিল মঞ্চ, তোরণ ও ফেষ্টুনে সুসজ্জ্বিত মেলা প্রাঙ্গণে ছিল ৭ বীরশ্রেষ্ঠ’র নামে ৭টি স্মারক স্তম্ভ এবং ১১ সেক্টরের স্মরণে ১১টি নির্দিষ্ট স্থান। বিজয় মেলায় ছিলো মুক্তিযুদ্ধের নানা দলিল, মুক্তিযুদ্ধের গ্রন্থমালা, মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র, মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের ডায়েরি প্রদর্শনী ও গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যেবাহী কৃষ্টিকালচারে সুসজ্জিত স্টল।
দিনব্যাপী এ বিজয় মেলায় গান পরিবেশন করেন ফকীর আলমগীর, খুরশীদ আলম, তপন চৌধুরী, সেলিম চৌধুরী, মৌটুসী, চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ ও ক্ষুদে গানরাজের শিল্পীরা। গানগুলোর মধ্যে ছিলো- বিজয় নিশান উড়ছে ঐ, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, ও আমার দেশের মাটি, ভাত ছিটালে কাকের নেই অভাব, জন্ম আমার ধন্য হলো, ওরে এক ফাগুণে ফুটে নাইরে ফুল, আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে, আমার গানের সবটাই, আমি ভয় করবো না, এই পদ্মা, হাজার বছর ধরে, পদ্মা মেঘনা সুরমা ইত্যাদি।
কবিতা আবৃত্তি করেন কবি আসাদ চৌধুরী ও সৈয়দ হাসান ইমাম। শিশুশিল্পীরা পরিবেশন করেছে তাদের নিজ নিজ দলের সদস্যদের নিয়ে দেশের গানের সাথে নৃত্য। বিজয় মেলা ২০১৪ সরাসরি সম্প্রচার করেছে চ্যানেল আই।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ছায়ানট নিজস্ব মিলনায়তনে গণসঙ্গীত ও মুক্তিযুদ্ধের উপর সেন্টু রায় নির্মিত প্রামান্যচিত্র ‘পরিচয় কোন আছে নাকি’ প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে।