ব্রেকিং নিউজ

সকাল ১০:৩৯ ঢাকা, রবিবার  ২২শে জুলাই ২০১৮ ইং

লন্ডনের গার্ডিয়ানকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলেন প্রধানমন্ত্রী

বিরোধী দলের কর্মকাণ্ডে ও মিডিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন- এমন অভিযোগ জোর দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লন্ডনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান তার সাক্ষাৎকারভিত্তিক এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে। ‘বাংলাদেশ প্রাইম মিনিস্টার রিজেক্টস একিউজেশনস অব অথরিটারিয়ান রুল’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনটি লিখেছেন সিমন টিসডাল ও আনা রিডআউট। গতকাল প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে খর্ব করা হচ্ছে এবং পুলিশ, নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে- এমন অভিযোগও খারিজ করে দেন তিনি। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় সরকার প্রধান শেখ হাসিনা। এক দুর্দান্ত নেত্রী তিনি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, তথাকথিত গুম, বিরোধীদলীয় ও ইসলামপন্থিদের নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার, মিডিয়া ও ইন্টারনেটের স্বাধীনতায় নতুন করে বাধা সৃষ্টির ফলে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ মুসলিম জাতির এ দেশটি একটি দমনমূলক, একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে- এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেছেন, আমার কাজ হলো সাধারণ মানুষকে সহায়তা করা। আমি জনগণের জন্য রাজনীতি করি। আমার জন্য নয়। জনগণ এখন গণতন্ত্র উপভোগ করছে। জনগণ যা চায় তা হলো তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ। তাই আমি তাদের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার জন্য চেষ্টা করছি। এগুলো হলো- খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, চাকরির সুযোগ ও উন্নত জীবন। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি মধ্যম আয়ের দেশ। ২০৪১ সালের মধ্যে হবে একটি উন্নত দেশ। এখানে সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কার্যকর। জনগণ তাতে সন্তুষ্ট। তারা তা উপভোগ করছে। সুতরাং আপনি যেমনটা বলছেন যে, আমি আধিপত্য বিস্তার করেছি। আমি আধিপত্য বিস্তার করি নি। আমি জনগণের সেবা করছি।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে জাতিসংঘের দারিদ্র্যবিরোধী ও উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ যে সহযোগিতা করছে সে জন্য হাসিনাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে। দৃশ্যত দেশের ভেতরে তিনি ব্যাপক সমর্থন উপভোগ করছেন। নিরাপত্তা বাহিনীগুলো, বিশেষ করে র‌্যাবের হাতে তথাকথিত ব্যাপক ক্রসফায়ারে হত্যা নিয়ে ভীতি আছে। এসব বাহিনী সাংবিধানিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন শেখ হাসিনা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ইস্যুতে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার অপ্রত্যাশিতভাবে বিস্তর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্র, অনলাইন মিডিয়ার অনুমোদন দিয়েছে ১৯৯০-এর দশক থেকে। শেখ হাসিনা বলেন, কে এই পরিবর্তন এনেছে? আমি। আমি এটা উন্মুক্ত করে দিয়েছি। এখন দেশে ৪১টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আছে। সারা দেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৭০০ সংবাদপত্র আছে। তাই সাংবাদিকরা লিখছেন। তারা পুরোপুরি মুক্ত। এনজিওগুলো কাজ করছে তাদের আইনকানুনের অধীনে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি গত বছরের নির্বাচন বর্জন করে নিজের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মেরেছে।’ ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট শরিক দলগুলো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়। বিএনপি ও তাদের বিতর্কিত ইসলামপন্থি শরিক দল জামায়াতে ইসলামী এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবিতে কয়েক বার সহিংস আন্দোলন এবং দেশব্যাপী হরতাল অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এতে তারা সফল হয় নি। বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন হাসিনার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়া। সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে ফোন করেছিলেন তিনি। তাকে অন্তর্বর্তীকালীন সর্বদলীয় সরকারে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। নির্বাচনে জালিয়াতি হতে পারে বিএনপির এমন সন্দেহ কাটানোর উপায় হিসেবে এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। হাসিনার ভাষ্য অনুযায়ী, কড়া সুরে তা প্রত্যাখ্যান করেন খালেদা জিয়া। হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে রাজনৈতিক ভুল করেছেন খালেদা জিয়া।’ সন্ত্রাসবাদে সমর্থন এবং দেশজুড়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করারও অভিযোগ করেন তার বিরুদ্ধে। রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর একাধিক হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছেন শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সুনাম নষ্ট করার জন্য সন্ত্রাসবাদ নিয়ে মানুষের ভয়ভীতি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আর এটা ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের যথার্থতা নিরূপণ করেন। সমালোচকরা বলেন, তার কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও তিনি দেশব্যাপী চলমান ইসলামপন্থিদের উত্থান সম্পৃক্ত কর্মকাণ্ড কমিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। উগ্রপন্থিদের সঙ্গে তিনি ‘ধ্যান-ধারণার লড়াইয়ে’ হেরে যাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধে রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রায় দিনই ঘটছে। গত সপ্তাহে ঢাকার একটি ফ্ল্যাটে বোমা তৈরির সরঞ্জাম রাখার অভিযোগে ১৩ জামায়াতে ইসলামী নেতাকে আটক করা হয়। এর মধ্যে সাবেক দুই এমপি ছিলেন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বলছে, এসব মামলা ভিত্তিহীন। এগুলো ইচ্ছাকৃত হয়রানির জন্য করা। বিরোধী দলগুলোর দাবি, সরকার ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ বিচারে দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে (আইসিটি) অপব্যবহার করছে। হাসিনার পিতা প্রয়াত শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল জামায়াতে ইসলামী। ২০০৯ সালে আইসিটি চালু হওয়ার পর থেকে একাধিক জামায়াতে ইসলামী নেতার মৃত্যুদণ্ড বা দীর্ঘ কারাদণ্ড হয়েছে।
বাংলাদেশ পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, ‘কর্তৃত্বপরায়ণ গতিধারা এক ব্যক্তির শাসনের দিকে যাচ্ছে। এর ফল হলো আমরা গণতন্ত্র হারাতে বসেছি। পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বায়ত্তশাসন হারাচ্ছে।’ পরিচয় গোপন রাখার শর্তে গার্ডিয়ানকে মন্তব্য দেন সাবেক এক জেনারেল। তিনি উল্লেখ করেন, ‘মানুষ রাতের অন্ধকারে স্রেফ হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। আমি তাদের একজন হতে চাই না।’ তিনি মন্তব্য করেন, ২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জনের কারণে হাসিনার শাষণ করার ম্যান্ডেটে ঘাটতি আছে। এ কারণে তারা রাষ্ট্রের ‘কোর ম্যাশিনারি’র  ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে। কোর ম্যাশিনারি অর্থাৎ- র‌্যাব, পুলিশ, বর্ডার গার্ড, সিভিল সার্ভিস এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে সেনাবাহিনী।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক ইফতেখার জামান বলেন, একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার সময় (টিপিং পয়েন্ট) আসছে। তা কখন ঘটবে কে জানে! তবে তা হবে এবং খুবই বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ অথবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অথবা যুক্তরাজ্য কারও জন্য তা সুখকর হবে না। অন্য সমালোচকরা জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের হাতে সম্প্রতি ব্লগার হত্যার বিষয়ে কর্মকর্তারা যেভাবে জবাব দিয়েছেন তা নিয়ে সমালোচনা করেন। যখন ওই সব হামলার নিন্দা উঠেছে তখন পুলিশের মুখপাত্র প্রধানমন্ত্রীর কথাই আওড়িয়েছেন। ৩রা সেপ্টেম্বর তিনি বলেছেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন মন্তব্য সহ্য করা হবে না। এমন ঘোষণায় মুক্তমনা ব্লগাররা ভাবতে পারেন যে, তাদের ওপর হামলার জন্য যেন তারাই দায়ী।
বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘সরকার তাদের সকল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিশ্চিহ্ন করেছে। এখন তারা গণমাধ্যমে সমালোচনার দিকে মনোযোগ দিয়েছে, কেননা আমরা স্বাধীন। দুর্নীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিষয়ে আমাদের অবস্থান অনেক জোরালো। তারা কোন ভিন্নমত গ্রহণ করতে চান না। আপনি হয়তো বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে একটি প্রচলিত কথা শুনেছেন, তা হলো সবার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সমান। কিন্তু এখানে তা ভিন্ন। হাসিনাই প্রথম। তার সমকক্ষ কেউ নেই।’
ঢাকাভিত্তিক সিনিয়র জাতিসংঘ কর্মকর্তা রবাট ওয়াটসন আসন্ন কোন সমস্যা দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না বড় কোন আলোড়ন সৃষ্টি হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত  অর্থনীতির অগ্রগতি হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ ঢাকায় আসতে পারছে, চাকরি নিতে পারছে, যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার মানুষকে কর্মব্যস্ত রাখতে পারছে এবং তাদের তিন বেলা খাবার যোগান নিশ্চিত করতে পারছে তারা গণতন্ত্র নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম উদ্বিগ্ন হবে। তিনি আরও বলেন, বেশির ভাগ মানুষের কাছে এটা অগ্রাধিকার নয়। তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনের ফল নিয়ে সন্তষ্ট নন। কিন্তু জীবন চালিয়ে নিয়ে যাওয়াটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি যখন প্রতিবছর ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এবং অতীতের তুলনায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন অপেক্ষাকৃত শান্ত তখন বেশির ভাগ বাংলাদেশী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সন্তুষ্ট। নিয়েলসেন-বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এক জরিপে ৬৭ শতাংশ মানুষ তাকে সমর্থন দিয়েছেন। আন্তর্জাতিকভাবে, হাসিনা যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের কাছ থেকে মৌন সমর্থন পেয়েছেন। উভয় সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা এসেছিল। তারা নতুন নির্বাচনেরও দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু এখন তারা সমালোচনা করা বন্ধ করেছেন। ভারত ও চীনের সমর্থন রয়েছে সরকারের প্রতি। উভয় দেশ বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সচেষ্ট। হাসিনা এ মাসে ৬৮ তে পা দেবেন।  ভবিষ্যৎ ইচ্ছা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সি ওয়াজ হ্যাপি টু কেরি অন ইন্ডেফিনিটলি। হাসিনা অবসর নিলে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, যিনি জয় নামেই বেশি পরিচিত, ভবিষ্যতে উত্তরসূরি হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রধান হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।  হাসিনার বাংলাদেশের কঠিন বাস্তবতা হলো- জোরজবরদস্তি করার ক্ষমতা কারো নেই। খুব কম মানুষেরই অসম্মতি প্রকাশের সাহস আছে। বরাবরই শেষ কথা হাসিনার। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দেশে আমরা গণতন্ত্র চর্চা করি তোমাদের ওয়েস্টমিনিস্টার ধরনের গণতন্ত্রের মতো। যতদিন মানুষ চাইবে আমি থাকবো। তারা যদি না চায়। সেটাই হবে। আমি ক্ষমতায় থাকি বা না থাকি, মানুষের জন্য কাজ করবো। আর মানুষের জন্য কাজ করছি।

নিম্নে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার লিঙ্ক

 

http://www.theguardian.com/world/2015/sep/21/bangladesh-prime-minister-rejects-accusations-of-authoritarian-rule