ব্রেকিং নিউজ

বিকাল ৪:৩১ ঢাকা, মঙ্গলবার  ১৯শে জুন ২০১৮ ইং

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
এটিসিএসএ) ২৬তম বার্ষিক সম্মেলন

রোগীদের সর্বোত্তম সেবা দেন : প্রধানমন্ত্রী

চিকিৎসা পেশাকে একটি মহান ব্রত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি রোগীকে নিজ পরিবারের একজন সদস্য মনে করে যত্নের সঙ্গে চিকিৎসা সেবা প্রদানে চিকিৎসক সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চিকিৎসা শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান ব্রত এবং আপনারা নিষ্ঠা ও মেধা প্রয়োগ করে বিশেষজ্ঞ হয়েছেন। আপনাদের মধ্যে সেবাদানের মনোভাব তৈরি করতে হবে। প্রতিটি রোগীকে নিজের পরিবারের একজন সদস্য মনে করে সেভাবে সেবা প্রদান করতে হবে। ’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিকেলে হোটেল রেডিসন ব্লুুতে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব থোরাসিক অ্যান্ড কার্ডিওভাসকুলার সার্জনস অব এশিয়া’র (এটিসিএসএ) ২৬তম বার্ষিক সম্মেলন উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশিষ্ট কার্ডিয়াক সার্জন অধ্যাপক ডা. অসিত বরণ অধিকারী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে এটিসিএসএ সভাপতি ডা. জেরাডো মাঞ্জো এবং মহাসচিব অধ্যাপক কামরুল হাসান বক্তৃতা করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে চিকিৎসকদের চিকিৎসা সেবায় আন্তরিকভাবে মনোনিবেশের পাশাপাশি গবেষণা কাজও সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে যাবার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি করে হৃদরোগের মৃত্যুহার কমানো যাবে না। কেন এত বেশি মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে, কীভাবে হৃদরোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়- এসব বিষয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের আহ্বান জানাবো চিকিৎসাসেবা প্রদানের পাশাপাশি গবেষণার উপর আপনারা বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করবেন। পাশাপাশি হৃদরোগ প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য আপনাদের আরও বেশি বেশি গণমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চশিক্ষার জন্য আমরা সব সুবিধা নিশ্চিত করে যাচ্ছি। একের পর এক বিশেষায়িত হাসপাতাল করে দিচ্ছি। আপনারা এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে জ্ঞান অর্জন করেন, রোগীদের সর্বোত্তম সেবা দেন- এটাই আমার প্রত্যাশা।

দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা তৈরীর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি জনগণকে শুধুমাত্র চিকিৎসা দিলেই চলবে না। আমাদের চিকিৎসাসেবার উপর মানুষের আস্থা তৈরি করতে হবে। যাতে মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী না হয়।

তবে, আগে যে হারে মানুষ বিদেশে যেতেন চিকিৎসার জন্য, এখন তা অনেক কমে গিয়েছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, হৃদরোগের শল্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিগত ৩ দশকে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৮১ সালে প্রথম ওপেন হার্ট সার্জারি সম্পন্ন হয়। ১৯৯৭ সালে যেখানে দেশে ৫০০-এর কাছাকাছি অপারেশন হয়, ২০১৫ সালে সেখানে সারাদেশে ২২টি হাসপাতালে ১০ হাজারের মত অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে আমাদের দক্ষতা ও সেবার মান অনেক বেড়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে শুধু জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে হৃদরোগের অপারেশন হলেও খুব শিগগিরই এই সেবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং খুলনায় শহীদ শেখ আবু নাসের হাসপাতালে চালু হতে যাচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর মেডিকেল শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং উন্নত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেশে প্রথমবারের মত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেই। তারই অংশ হিসেবে তৎকালীন পিজি হাসপাতালকে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি। অদূরদর্শী একটি মহল তখন এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের চরম বিরোধিতা করেছিল। আজকে দেশের মানুষ এর সুফল ভোগ করছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শয্যা সংখ্যা ৭০০ থেকে বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৫০০ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা রাজশাহী এবং চট্টগ্রামে আরও দু’টি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। অটিস্টিক শিশু সনাক্তকরণের জন্য জরিপ কার্যক্রম চলছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসকরণের জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ‘এমডিজি’ পুরস্কার লাভসহ স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সাফল্যের অনেক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত সাড়ে ৭ বছরে দেশে নতুন ১৬টি সরকারি ও ৫টি আর্মি মেডিকেল কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১০ হাজার ৬৬২টি নতুন শয্যা যুক্ত করেছি। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৩৪৫টি নতুন চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, চিকিৎসা শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মোট ১২ হাজার ৮০৪টি আসন বাড়ানো হয়েছে। আমাদের সরকারের সাড়ে সাত বছরে ১২ হাজার ৭২৮ জন সহকারী সার্জন এবং ১১৮ জন ডেন্টাল সার্জন নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এ পর্যন্ত ৫ হাজার নতুন নার্স নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আরও ১০ হাজার নার্স নিয়োগ দান প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ৩ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নার্সদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করা হয়েছে, উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

মাঠ পর্যায়ে জনগণকে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের সরকারি উদ্যোগ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার ৪৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে প্রায় ৩০ ধরনের ঔষধ দেয়া হচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির প্রসারের ফলে সকল জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে মোবাইল ফোনে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, বিভিন্ন হাসপাতালে টেলিমেডিসিন সেবা প্রবর্তন করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা স্বাস্থ্যনীতি ২০১১ এবং জনসংখ্যা নীতিমালা ২০১২ প্রণয়ন করেছি। স্থানীয় পর্যায় থেকে- গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলা ভিত্তিক তিনস্তর-বিশিষ্ট স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। স্বাস্থ্যসেবা এখন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে পৌঁছেছে। তৃণমূলের প্রান্তিক মানুষ নামমাত্র মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, তাঁর সরকার বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণীর সর্বমোট ৩ হাজার ৭১টি পদে জনবল নিয়োগ দিয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতায় বিভিন্ন পর্যায়ে ৪ হাজার ৮৫৮ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারিকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।

বক্তব্যের শুরুতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে বিশেষ গ্ররুত্ব প্রদান করেন। তিনি জনগণ-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে থানা পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্য কাঠামোকে সম্প্রসারণ করেছিলেন। জাতির পিতা চিকিৎসকদের পদ-মর্যাদা ১ম শ্রেণীতে উন্নীত করেছিলেন।

তিনি বলেন, জাতির পিতার দর্শনকে ধারণ করে আমরা জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে গত সাড়ে ৭ বছরে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার ২০২১ সালের মধ্যে একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত মধ্যম-আয়ের বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। যে বাংলাদেশে মানুষ রোগ-শোকে ভুগবে না, সব ধরনের মৌলিক অধিকার ভোগ করবে।

এলক্ষ্য অর্জনে চিকিৎসক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রে সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।