Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

দুপুর ১২:০৬ ঢাকা, বৃহস্পতিবার  ১৫ই নভেম্বর ২০১৮ ইং

রামপুরায় সাংবাদিক কন্যা ফাহমিদার হাত পা বাঁধা লাশ উদ্ধার

Like & Share করে অন্যকে জানার সুযোগ দিতে পারেন। দ্রুত সংবাদ পেতে sheershamedia.com এর Page এ Like দিয়ে অ্যাক্টিভ থাকতে পারেন।

 

রাজধানীর রামপুরায় নিজের ফ্ল্যাট বাসায় সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত আখতার-উল-আলমের মেয়ে ফাহমিদা আক্তার বিথুনকে। শুক্রবার চোখে-মুখে মরিচের গুঁড়া ছিটানো, গলায় উড়না পেঁচানো, কম্বল দিয়ে শরীর ঢাকা ও ঘাড় মটকানো অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
সকালে রামপুরা মহানগর আবাসিক প্রকল্প এলাকার ডি-ব্লকের পাঁচ নম্বর সড়কের ১০৫ নম্বর বাড়ির ছয়তলা ভবনের পাঁচতলার ফ্ল্যাট থেকে উপুড় অবস্থায় পুলিশ ফাহমিদার লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডটি সুপরিকল্পিত। এতে একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে। সকালে লাশ উদ্ধার হলেও ধারণা করা হচ্ছে, বৃহস্পতিবার দিনে বা রাতে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার মরদেহ থেকে গন্ধ বের হচ্ছিল। ফাহমিদার ব্যবহার করা সেল ফোনটিও খোয়া গেছে।
রামপুরায় যে ভবনে থাকতেন ফাহমিদা আক্তার ওই ভবনটির নাম ‘বন্ধন’। পাঁচতলার দু’দিকে দুটি ইউনিট রয়েছে। সামনের দিকে বা রাস্তার পাশের ইউনিটে ফাহমিদা একা থাকতেন। পাশের ইউনিট ভাড়া দেয়া হয়েছে। সেখানে দুটি কক্ষে চারজন ব্যাচেলর থাকেন। এর মধ্যে শুক্রবার মাত্র একজনকে পাওয়া গেছে। বাকিরা কাজে বাইরে ছিলেন।
ওই বাসায় গিয়ে পুলিশ, দারোয়ান, কাজের বুয়াসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বাসাটিতে একাই থাকতেন ফাহমিদা। তিনি বেশি বাইরেও বের হতেন না। আর ওই বাসায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আসা-যাওয়া বলতে শুধু তার দেবর গোলাম সোবহানের নাম জানা গেছে। তিনি মাঝে মাঝে আসতেন ও ফাহমিদার খবর নিতেন। ফাহমিদার স্বামী গোলাম রাব্বানী থাকেন বাহরাইনে। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেন। সর্বশেষ তিনি গত কোরবানির ঈদে দেশে এসেছিলেন। একমাত্র ছেলে সিরাতুল মুস্তাকিম উচ্চশিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস ইউনিভার্সিতে পড়ছেন।
ভবনের কেয়ারটেকার আবদুর রউফ ও ফাহমিদার ফ্ল্যাটের কাজের বুয়া সাবিহা বেগমকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। রউফ ৩ মাস আগে এ ভবনে কাজে যোগ দেন। আর সাবিহা দু’বছর ধরে কাজ করছেন। রামপুরা থানা পুলিশ হেফাজতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
কেয়ারটেকার আবদুুর রউফ জানান, ম্যাডামকে তিনি বেশি নিচে নামতে দেখেননি। গত তিন মাসে মাত্র একবারই তিনি দেখেছেন।
ফাহমিদা আক্তার হত্যার ঘটনায় তার ফ্ল্যাটের দরজা লাগা ও খোলা নিয়েও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। কাজের বুয়া সাবিহা জানিয়েছেন, তিনি সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাসায় আসেন। ধাক্কাধাক্কির পর দরজা না খোলায় বিষয়টি দারোয়ানকে জানান। এরপর দারোয়ান ও আশপাশের লোকজন এসে দরজা খোলেন।
সাবিহার তথ্যানুযায়ী, তিনি বৃহস্পতিবার রাতেও ম্যাডামের বাসায় সিগারেট ও চিনি কিনে নিয়ে আসেন। রাতে ম্যাডাম দরজা না খোলায় দরজার পাশে এগুলো রেখে যান সাবিহা। পুলিশ বলছে, দরজার পাশে চিনি ও সিগারেট রেখে যাওয়ার ভেতরে কোনো রহস্য আছে। এ ক্ষেত্রে বাসার ভেতরে কেউ আগে মেহমান হিসেবে প্রবেশ করে থাকতে পারে। আর সেই মেহমানই খুনি হতে পারে। খুনিদের শনাক্তে বাসার ভেতরে থাকা কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।
এদিকে ফাহমিদার খোয়া যাওয়া সেলফোনটিও রহস্যের সৃষ্টি করেছে। তার ফোনটি নিয়ে যাওয়ার কী কারণ থাকতে পারে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, খুনি পরিচিত হলে নিশ্চয়ই তার সঙ্গে কথা হয়েছে। সে কারণে ফোন সেটটি সে নিয়ে যেতে পারে। তবে দুটি ফোনকলের সূত্র এ তদন্তে কাজে লাগানো হচ্ছে। ফাহমিদার চোখে-মুখে কী কারণে অতিমাত্রায় মরিচের গুঁড়া দেয়া হয়েছে এ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের অপরাধ সাধারণত পেশাদার অপরাধী করে থাকে। কিংবা যে বা যারা খুন করেছে তারাও অপরাধীর কৌশল জানে।
খুনের প্রাথমিক কারণ প্রসঙ্গে পুলিশ বলছে, দেখে মনে হয়নি এটা কোনো ডাকাতি ও চুরির ঘটনা। এমনটা হলে মালামাল খোয়া যেত। এ খুনের নেপথ্যে কোনো পারিবারিক কারণ, জমিসংক্রান্ত বা পূর্বশত্র“তা কিংবা বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য ছিল। তিনি বলেন, ফাহমিদা আক্তারকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। গুঁড়া মরিচ মুখে নিক্ষেপ করে ফাহমিদাকে ক্ষান্ত করা হয়েছে। এতে এক বা একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, হত্যার পর খুনি ভোরে বা গত রাতেই বের হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে বাসার দারোয়ানের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে।
নিহত ফাহমিদার বড় ভাই টিআইবির আউট রিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন পরিচালক রিজওয়ান-উল-আলম।
এদিকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ফ্লাটের ভাড়া দেয়া ইউনিটের ভাড়াটিয়া ব্যাচেলরদের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। শুক্রবার ইউনিটে শুধু ভাড়া দেয়া ইউনিটে ছিলেন আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটির সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শেষ বর্ষের ছাত্র রায়হান খান রাব্বী। লাশ উদ্ধারের দিন দুপুরে তিনি গনমাধ্যমকে জানান, তার সঙ্গে থাকে খালাতো ভাই বুয়েটের শিক্ষার্থী সিফাত। সে বেশ কিছুদিন ধরেই গ্রামের বাড়িতে আছেন। আর তার বন্ধু একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহীদও এখানে থাকেন। তিনিও চট্টগ্রামে গেছেন।
রায়হান জানান, সকালে দারোয়ান ও বুয়া তাকে ঘটনাটি জানান। যে বুয়া ফাহমিদার বাসায় কাজ করেন তিনিই তাদের রান্না করে দেন। তিনি আরও বলেন, বাসা ভাড়া নেয়ার সময় ফাহমিদা সবার বায়োডাটা নেন। আর তার সঙ্গে শুধু বাসা ভাড়া দেয়ার সময় কথা হয়।
এদিকে রামপুরা থানা পুলিশের হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদে কাজের বুয়া সাবিহা অসংলগ্ন তথ্য দিয়েছেন।
নির্মম হত্যকাণ্ডের শিকার ফাহমিদা আক্তা বিথুনের লাশ দুপুরে উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে নেয়া হয়। ঢামেক ফরেন্সিক বিভাগের চিকিৎসক প্রদীপ বিশ্বাস নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন শেষে সাংবাদিকদের জানান, ভারি কোনো বস্তু দিয়ে নিহতের মাথায় আঘাত করা ছাড়াও তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।
নিহতের মামাতো ভাই সাব্বির হাসান জানান, ফাহমিদা আক্তারের লাশটিকে বারডেমে হিমঘরে রাখা হবে। তার স্বামী দেশে এলে তাকে মিরপুরে দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। রামপুরা থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ফাহমিদা হত্যার ঘটনায় শুক্রবার একটি হত্যা মামলা হয়েছে (মামলা নম্বর ৩৪)। এ মামলার বাদী হয়েছেন নিহতের ভাই রিজওয়ান-উল-আলম। এতে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। এজাহারে কারও নাম উল্লেখ নেই।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রয়াত আখতার উল আলম ২০১০ সালের ২৫ জুন মারা যান। তিনি ১৯৯১ সালে ব্র“নাইয়ের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ১৯৮৮ সাল থেকে ব্র“নাই যাওয়ার আগ পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও পরে দীর্ঘদিন উপদেষ্টা সম্পাদকদের দায়িত্ব পালন করেন। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে নিহত ফাহমিদা আক্তার বিথুন ছিলেন দ্বিতীয়। ৪৭ বছর বয়সী ফাহমিদা এক সন্তানের জননী। তিনি একজন আইনজীবীও ছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুরে।