ব্রেকিং নিউজ

সকাল ১০:১৮ ঢাকা, শনিবার  ২২শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঝুঁকিতে অর্থনীতি

গত বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন বছরের শুরুতে হরতাল-অবরোধে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে অর্থনীতি। নির্বাচনের বর্ষপূর্তি ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির জেরে বিএনপি অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা করেছে। সহিংসতায় এরই মধ্যে কয়েকজন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

গবেষণা সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো মনে করে, মূলত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে গত অর্থবছরে কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়নি। গত অর্থবছরে জিডিপির অংশ হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগ তার আগের অর্থবছরের তুলনায় কমে গেছে। এ সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ ঋণাত্মক ছিল। চলতি অর্থবছরে অর্থনীতিতে কিছু ভালো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। যেমন_ প্রথম ছয় মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ। কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার কমছে। প্রথম চার মাসে ঋণাত্মক অবস্থা থাকার পর পাঁচ মাসে এসে তা বেড়েছে। আগামীতে রফতানি কিছুটা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। বাড়ছে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি। অর্থনীতিতে গতি ফিরে পাওয়ার এ সময়ে ফের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সবাই। সম্প্রতি প্রকাশিত চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালের শেষার্ধে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের পরিণতিতে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা ২০১৪ সালে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে। এর ফলে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি তার আগের বছরের চেয়ে কম হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর, ২০১৪) তুলনামূলক শান্ত পরিবেশের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এ প্রত্যাশার প্রতিফলন কতটুকু ঘটবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এর মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতা সাময়িক হলে ক্ষতি পোষানো সম্ভব হবে; দীর্ঘস্থায়ী হলে তা পোষানো দুরূহ হয়ে পড়বে।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর এর মতে, দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রধান শর্ত হচ্ছে স্থিতিশীল পরিস্থিতি। যে কোনো সংঘাতময় অবস্থা ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে না। বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোটের সংলাপের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির একটা সমাধান দরকার। তা না হলে দেশি বিনিয়োগ বাড়বে না, বিদেশি বিনিয়োগও কমে যাবে। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে যে অবস্থায় ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, তা থেকে উত্তরণ পুরোপুরি ঘটেনি। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক নেতারা বাংলাদেশের অর্থনীতির ধ্বংস চান না। রাজনীতিবিদরা ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুক_ এটাই ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা।

বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম এর মতে, এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। রফতানি পণ্য উৎপাদন হরতাল-অবরোধের আওতামুক্ত থাকলেও ঠিকভাবে সরবরাহ করতে না পারায় রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে না। রফতানি পণ্য সরবরাহের জন্য হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করে জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা চেয়েছেন তারা। অন্যদিকে, এসব পণ্য অবরোধসহ সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির আওতামুক্ত রাখার দাবি জানান তিনি।

গত সোমবার সারাদেশে সহিংসতার আশঙ্কায় দোকানপাট, মার্কেট, বিপণিবিতান, শপিংমল ও ফ্যাশন হাউসগুলোর বেশির ভাগই বন্ধ ছিল। গতকাল দোকানপাট কিছুটা খোলা রাখলেও বেচাকেনা না থাকায় ক্ষতিতে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ স্থানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকান খোলেননি। বড় বিপণিবিতান বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় খোলা থাকলেও ক্রেতা উপস্থিতি ছিল কম। বেচাকেনা তেমন হয়নি। দোকান মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, হরতাল ও অবরোধে দিনে ক্ষতি প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন ৫৫০ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হচ্ছে। হরতালে এসব পণ্য রফতানি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি পণ্য সরবরাহ অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে। এফবিসিসিআইর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে হরতাল ও অবরোধ হয়েছে ৬২ দিন। এফবিসিসিআই ও ঢাকা চেম্বারের হিসাবে একদিনের হরতাল কিংবা অবরোধে এক হাজার ৫৪০ থেকে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ বিবেচনায় ওই বছরে এক লাখ টাকার বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।

চলমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি জানায়, চলমান সহিংসতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অবরোধে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বাধাগ্রস্ত করবে। সহিংসতা পরিহার করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছে এফবিসিসিআই। ২০ দলের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন। গত সোমবার এক বিবৃতিতে সংগঠনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, ২০১৪ সালে বীমাশিল্পসহ দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত অধিকাংশ খাতে আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা একটু ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। এ মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর ডাকা হরতাল ও অবরোধের কারণে দেশে আবারও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। এফবিসিসিআইর সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন এর মতে, দেশে রাজনৈতিক যে অস্থিরতা চলছে, তা ব্যবসা-বাণিজ্য আবারও ক্ষতির মুখে ফেলে দিচ্ছে।