ব্রেকিং নিউজ

রাত ৩:৪৮ ঢাকা, রবিবার  ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

রেজওয়ানা সিদ্দিক টিউলিপ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি ব্রিটিশ এমপি রেজওয়ানা সিদ্দিক টিউলিপ, ফাইল ফটো

রাজনীতিতে আসতে হলে আত্মবিশ্বাসটা সবচেয়ে জরুরী : টিউলিপ

ব্রিটেনের এমপি টিউলিপ সিদ্দিক রাজনীতিতে নারীর অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য বাংলাদেশের নারীদের আরো আত্মবিশ্বাসী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
‘নারীদের রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের অভাবটাই সবচেয়ে বেশি। এটা ব্রিটেনেও দেখেছি। বাংলাদেশের নারীদের মধ্যেও দেখেছি। তাই রাজনীতিতে আসতে হলে আত্মবিশ্বাসটা লাগবে। সেটাই সবচেয়ে জরুরী,’ রাজধানীর উত্তরায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল স্কলাসটিকা আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি আজ একথা বলেন।
সাবেক শিক্ষা সচিব এন আই খান, স্কলাসটিকা স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা মাদিহা মুরশেদ এবং টিউলিপ সিদ্দিকের স্বামী ক্রিস পার্সি এসময় উপস্থিত ছিলেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি এবং স্কলাসটিকার প্রাক্তন ছাত্রী ব্রিটিশ বাঙালি টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক এবছর মে মাসে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেবার পার্টি থেকে এমপি নির্বাচিত হন। তিনি সেখানে লেবার পার্টির ছায়া মন্ত্রিপরিষদে সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়া বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি গত ২১ ডিসেম্বর সোমবার স্বামীসহ বাংলাদেশ সফরে আসেন। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এটাই তার প্রথম বাংলাদেশ সফর।
যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের এই নির্বাচনে আমার প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল আমি ব্রিটিশ বাঙালি। আমার আগে ওই আসনে যিনি এমপি ছিলেন তিনি একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী। দুইবার অস্কার পেয়েছেন। আমি যখন নির্বাচনী প্রচারণায় যাই তখন আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করতো আপনি কি অভিনয় করেন?
‘আমি নির্বাচন করার জন্য দু’বছর ধরে নিজেকে তৈরি করেছি। ব্রিটেনের সব স্কুল, সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করেছি। সব অবস্থার মধ্যে আমি আমার আত্মবিশ্বাস ধরে রেখেছি।’
ব্রিটেনের রাজনীতিতে লেবার পার্টির একজন প্রার্থী হয়েও টিউলিপ সিদ্দিকের রাজনৈতিক প্রচারণার ওপর প্রভাব ফেলেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মতাদর্শ।
‘অনেকেই বলতেন- উনি তো নির্বাচনে জিতে লেবার পার্টি করবেন না, আওয়ামী লীগ করবেন। এটা মানুষকে বোঝানোটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমি তাদের বলেছি, মানুষের জন্য কিছু করবো বলেই আমি রাজনীতি করি। বাংলাদেশে কে কোন দল করে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যিনি ব্রিটেনে লেবার পার্টি করেন আমি তার জন্য কাজ করবো। যিনি আমার নির্বাচনী এলাকায় বাস করেন তিনি যদি লেবার পার্টি নাও করেন আমি তার জন্যও কাজ করবো। এটাই আমার রাজনীতি।’
ব্রিটেনের এমপি নির্বাচিত হওয়ার পেছনে ব্রিটিশ বাঙালিদের অকুন্ঠ সমর্থনই তাকে জয়ের মালা পরিয়েছে বলে তিনি ব্রিটেনের বাঙালির কাছে তো বটেই বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের প্রতি অকুন্ঠ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে তার আসনে সিলেটের বেশি সংখ্যক মানুষ তাকে সমর্থন দিয়েছেন বলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে বাংলাদেশে এসে প্রথমে তিনি সিলেটেই পা রাখেন।
তিনি বলেন, আমি বিজয়ী হওয়ার পর সিলেট, টাঙ্গাঈল, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার অধিবাসীরা আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, আমি তাদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। কিন্তু সিলেটের মানুষ আমাকে যেভাবে সমর্থন যুগিয়েছেন তা না হলে আমি হয়তো জিততে পারতাম না।
সারা বিশ্বে ধর্মীয় সন্ত্রাসের বিস্তার ব্রিটেনের নাগরিকদের মনে ইসলাম সম্পর্কে যে বিরূপ ধারণার জন্ম দিয়েছে সেই চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করতে হয়েছে টিউলিপ সিদ্দিককে। তিনি বলেন, ‘আমার মুসলিম নাম শুনে অনেকেই দ্বিধান্বিত হতেন। কেউ কেউ প্রশ্ন করতেন ধর্মীয় সন্ত্রাস নিয়ে। অনেক সময় এসব প্রশ্নের ব্যাখ্যাও আমাকে দিতে হয়েছে।’
তবে তিনি বলেন, ব্রিটেনের রাজনীতিতে নারীর জন্য আরো একটি চ্যালেঞ্জ হলো গণমাধ্যমের কাছে গুরুত্ব পাওয়া। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের সে সমস্যা খুব কম বলেই মনে করেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার নারী, বিরোধী দলের নেতাও নারী। ব্রিটেনে এমনটি কখনো ঘটেনি। অনেক আগে শুধু একবার একজন নারী ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
টিউলিপ বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে কেউ হোন না কেন, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো দেশপ্রেম। যিনি দেশপ্রেমিক, যিনি গরীব মানুষের দুঃখ দূর করতে চান তার পক্ষেই সম্ভব একটি উন্নত জাতি গঠন করা।
ভবিষ্যতে কেমন বাংলাদেশে দেখতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে টিউলিপ বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সূচকে অনেকটা এগিয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ, শান্তি মিশন, পোশাক উৎপাদন থেকে শুরু করে চিত্রশিল্প, কল-কারাখানা ও চাকরি সব ক্ষেত্রে মেয়েরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে আমাদের দেশেই সর্বাধিক সময় ধরে নারী সরকার প্রধান রয়েছেন। আমরা যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখতে চাই তাহলে অবশ্যই তরুণীদের আরো বেশি সুযোগ দিতে হবে। তবেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় হবে।
‘বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ রোধে করণীয়’ বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছুদিন আগ পর্যন্ত ব্রিটেনেও বাল্যবিবাহ একটি বড় সমস্যা ছিল। এখন অনেকটা কমে এসেছে। তাই সবকিছুর উর্ধ্বে নারীকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। বাংলাদেশের মেয়েরা উচচ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই বাল্য বিবাহ কমবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে আছে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের জন্য কিছু করতে চাইলে দেশের গন্ডির মধ্যে থেকেই করতে হবে এমনটি আমি মনে করি না। আমি ব্রিটেনে থেকেও আমার দেশের জন্য কাজ করতে পারি।
‘অনুপ্রেরণাময়ী নারী’ শীর্ষক এ আলোচনা অনুষ্ঠানে ঢাকার বিভিন্ন স্কুলের প্রায় দুই’শ শিক্ষার্থী এবং দেশের ২৪ জন সফল নারী উপস্থিত ছিলেন।