Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৬:৫৬ ঢাকা, সোমবার  ১৯শে নভেম্বর ২০১৮ ইং

রাজউকে মহা ডাকাতি: ৩ হাজার ৬শ’ কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতি

যথাসময়ে কাজ শেষ না করে তুলে নিয়েছে বিল। বেশি দরে মাটি ভরাট কাজে টাকা পরিশোধ করা। দরপত্র প্রক্রিয়া যথাযথ অনুসরণ না করেই কার্যাদেশ। একই পদে ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে একাধিক কর্মকর্তা তুলে নিয়েছে বেতন-ভাতা। পদ নেই, তবুও অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ । এভাবে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করা হয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল, ঝিলমিল, উত্তরা অ্যাপার্টমেন্টসহ অন্যান্য প্রকল্পে। কম্পট্রোলার অডিটর জেনারেল (সিএজি) কার্যালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে রাজউকের বিভিন্ন খাতে ১৬৪টি অডিট আপত্তির বিপরীতে ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকার ‘আর্থিক অনিয়ম’ চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে এ অনিয়মকে একটি খণ্ডচিত্র হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গভীরভাবে তদন্ত করলে আরও বিশদ অনিয়ম ধরা পড়তে পারে। ২০০৯-১৪ সময়ে রাজউকের চলমান আবাসন প্রকল্পসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর এই প্রতিবেদনে ব্যাপক অনিয়ম উদ্ঘাটন করা হয়। সিএজি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে রাজউকের কর্মকাণ্ডের ওপর কোনো অডিট বা নিরীক্ষা করা হয়নি।

রাজউকের কেরানীগঞ্জ উপজেলায় ‘ঝিলমিল আবাসিক’ প্রকল্পে মাটি ভরাট কাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এ প্রকল্পে ভূমি উন্নয়নের জন্য বেসিক ড্রেজার কোম্পানিকে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, মাটি ভরাটের জন্য প্রতি ঘনমিটার মাটির দর নির্ধারণ করা হয় ১০৮ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ কাজের জন্য প্রতি ঘনমিটার দাম ধরেছে ১৩৬ টাকা। অর্থাৎ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রতি ঘনমিটার মাটির ‘অতিরিক্ত’ দর নিয়েছে ২৮ টাকা। আইন অনুযায়ী দর পরিবর্তন করতে হলে পুনঃদরপত্র আহ্বান করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা বিভাগের অনুমোদন না নিয়েই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে করে সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য সরকারের ২২ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে। এ প্রকল্পের গাজীপুর অংশে মাটি ভরাট কাজে নিয়োগ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এআরকে-আইএইচকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। সিএজির প্রতিবেদন মতে এ কাজের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়নীতি বা পিপিপিআর অনুসরণ না করে রাজউক টাকা পরিশোধ করেছে তা আইনসঙ্গত হয়নি। এ ছাড়া একই প্রকল্পের মাদানি এভিনিউ সম্প্রসারণ কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সময়মতো না করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পে মঞ্জুরিকৃত জনবল ছিল ৩০ জন। এর মধ্যে প্রকল্প পরিচালক প্রেষণে এবং অন্যদের বিভিন্ন পদে সরাসরি নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়। আলোচ্য প্রকল্পে সরাসরি কোনো জনবল নিয়োগ করা হয়নি। এর পরিবর্তে ১০০ কর্মচারীকে অনিয়মিতভাবে এ প্রকল্পে নিয়োগ দেখিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছে রাজউক। সিএজির প্রতিবেদনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়, নতুন পদ সৃজন না করেই ‘অতিরিক্ত’ জনবল নিয়োগ করে তাদের পেছনে ৬ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এই ব্যয় নিয়মবহির্ভূত এবং আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এ ছাড়া উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে একটি পদের বিপরীতে ২ কর্মকর্তাকে বেতন-ভাতা দেওয়ায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৮১ লাখ টাকা। ভুয়া বাউচার দেখিয়ে বেতন-ভাতা উত্তোলন করা হয়েছে বলে সিএজির প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করেই শতাধিক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এই অনিয়ম উদ্ঘাটন করা হয়েছে রাজউকের উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো_ এনা ডুঙ্গা জেভি ও মেসার্স বিএফএল। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে ওই প্রকল্পের আওতায় ফ্ল্যাট নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। নিরীক্ষক দল আলোচ্য প্রকল্পের প্রয়োজনীয় নথি পর্যবেক্ষণ করে বলেছে যে, চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময় শেষ করেই বিল পরিশোধের কথা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটি যথাসময়ে কাজ শেষ না করেই টাকা তুলে নিয়েছে। এতে করে সরকারের ১৪০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

অবৈধ দখলের কারণে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, এ প্রকল্পের ৩০ নম্বর সেক্টরে জিন্দাপার্ক নামে ত্রিশ একর জমি জোর করে দখল করেছে জনকল্যাণ সমিতি নামে একটি বেসরকারি সংগঠন। এই জমি উদ্ধারে কোনো বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করেনি রাজউক। এর ফলে সরকারের ৩৬০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অন্যান্য অনিয়মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জামানত বাজেয়াপ্ত করার পরও সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় ক্ষতি ১০৬ কোটি টাকা, পাকা রাস্তা নির্মাণকাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অনিয়মিত পরিশোধ ও জরিমানা কর্তন না করায় ক্ষতি ২৫ কোটি টাকা, ব্রিজ নির্মাণে অসমাপ্ত কাজের কার্যমূল্যের ওপর জরিমানা আদায় না করায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় ক্ষতি ৩ কোটি টাকা, রাজউকের ব্যালান্সশিটে ভুয়া খাতে ব্যয় প্রদর্শন করায় ক্ষতি ৫০ কোটি টাকা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে পাওনা অগ্রিম যথাসময় সমন্বয় না করায় ক্ষতি প্রায় ৪২ কোটি টাকা, নিয়ম অনুযায়ী প্লট বরাদ্দ না করায় ক্ষতি ৩৯২ কোটি টাকা, নির্ধারিত সময়ে ভবন নির্মাণকাজ সমাপ্ত না করা সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জরিমানা কর্তন না করায় আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৯ কোটি টাকা। উল্লেখিতসহ আরও অন্যান্য খাতে সব মিলে গত পাঁচ বছরে রাজউকের বিভিন্ন প্রকল্পের ওপর সরেজমিন পরিদর্শন করে ১৬৪টি অডিট আপত্তির বিপরীতে ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি ২০ লাখ টাকার ‘আর্থিক অনিয়ম’ ও দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে নিরীক্ষক দল।

সাবেক রাজউক চেয়ারম্যান নুরুল হুদার সময়কালে এসব আর্থিক অনিয়ম’ ও দুর্নীতি সংঘটিত হয়। তবে বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়ার এ ব্যাপারে কতটুকু দ্বায়দায়িত্ব এবং কম্পট্রোলার অডিটর জেনারেল (সিএজি) কার্যালয়ের প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন বা করেন নাই বা কি করনীয় ছিল সে বিষয়ে অনুসন্ধান সাপেক্ষে ও বক্তব্য নিয়ে পরবর্তীতে পাঠকদের জানানোর চেষ্টা করবো।