ব্রেকিং নিউজ

ভোর ৫:০৮ ঢাকা, বৃহস্পতিবার  ২০শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

যৌন জীবনে অসততা নিয়ে বিজ্ঞান কী বলে?

‘যৌন জীবনে অসততা’ নিয়ে বিজ্ঞান কী বলে?

একরাতের জন্য সহবাস কিংবা পরকীয়া সব ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে৷ কিছু মানুষ একে মনোগামী বা একগামিতার ব্যর্থতা মনে করেন৷ আসলেই কি তাই? মানুষের বহুগামিতা কিংবা যৌন জীবনে অসততা নিয়ে বিজ্ঞান কী বলে?

সেটা ছিল পড়ন্ত বিকেল, মদের নেশাটাও বাড়ছিল, মোটের উপর সঙ্গিনীও ছিল আকর্ষণীয়৷ ফলে হাসিঠাট্টা একপর্যায়ে চুমুতে রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে বিছানায়৷ ম্যাক্স মাঝেমাঝেই এভাবে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান৷ আর এটা কোনো সমস্যা হতো না, যদি না তিনি বিবাহিত হতেন৷ ম্যাক্স মনে করেন, তাঁর এই যৌনাকাঙ্খা স্বাভাবিক ব্যাপার৷ তবে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও এমনটা করা ঠিক নয়৷

যুগল এবং সেক্স থেরাপিস্ট গের্টরুড ভোল্ফ অবশ্য এ ব্যাপারে তাঁর অবস্থান এককথায় জানিয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই একগামী নয়৷”

ভোল্ফের এক তৃতীয়াংশ ক্লায়েন্টই তাঁর কাছে আসেন প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে৷ একটি দম্পতি বা যুগলের যে কোনো একজন অন্য জনের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন, এমন অভিযোগই বেশি৷ আর অনেক যুগলের কাছেই, যৌন জীবনে সৎ থাকা মানে একগামিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার৷ এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমি প্রায়ই এমন মানুষের মুখোমুখি হই, যাঁরা বলেন যে তাঁরা কোনোদিনই প্রতারণা করবেন না৷ এবং তাঁদের সঙ্গী বা সঙ্গিনী যদি প্রতারণা করেন, তাহলে তাঁকে ক্ষমা করবেন না৷”

তিনি বলেন, ‘‘অনেক সময় দেখা যায়, তাঁদের অনেকে আবার আমার সামনে এসে বসেন, কেননা, তাঁরা আসলে যৌন জীবনে সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন৷”

অনেক মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, একগামিতার বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্ত৷ একটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিনা সেটা নিয়ে সন্দিহান তাঁরা৷ আর কারো কারো মতে, একগামিতা আসলে সেকেলে ব্যাপার, যা শীঘ্রই সমাজ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাবে৷

ভোল্ফ মনে করেন, একগামিতা হচ্ছে পুরুষের আবিষ্কৃত এক ধারণা, যাকে সাংস্কৃতিক অর্জন বলা যেতে পারে৷ আর এটা এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারও৷

যৌনতার দুই ধরন

ভোল্ফ তাঁর বই ‘কন্সট্রাকশন অফ অ্যাডাল্ট’-এ মানুষের যৌনাকাঙ্খার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন৷ সেখানে তিনি দু’ধরনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন৷ একটি ধরন হচ্ছে, যেটি পুরোপুরি শারীরিক চাহিদা থেকে সৃষ্ট৷ এখানে ঘনিষ্ঠতার কোনো ব্যাপার নেই, বরং পুরোটাই শারীরিক চাহিদা৷ এই সম্পর্ক সাময়িক৷

ম্যাক্স এটা জানেন৷ জানেন রেবেকাও৷ বর্তমানে ৩০ বছর বয়সি এই নারী বয়স ২০ পেরুনোর পর নানাভাবে যৌনতার স্বাদ নিয়েছেন৷ কখনো সুইন্গার ক্লাব মানে তাৎক্ষণিক সঙ্গী বদলের ক্লাবে গিয়েছেন, কখনো এমন সব স্থানে সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন, যা স্বাভাবিকভাবে ভাবা যায় না৷ তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল যতটা সম্ভব আনন্দ, উত্তেজনা উপভোগ করা৷

আর দ্বিতীয় ধরনের সম্পর্ক হচ্ছে, যেখানে যৌনতার মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া ঘনিষ্ঠতা, যা মানসিকও হতে পারে৷ ভোল্ফের ভাষায় যাকে বলে, ‘‘সংস্কৃতির আদলে যৌনতা৷” তাঁর মতে, এ ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একগামিতা বিশেষ ভূমিকা পালন করে, কেননা, দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ককে মজবুত করে তোলেন৷

যৌনতাকে সম্পর্কে রূপ দেয় ‘অক্সিটকিন’

ম্যাক্স সবসময় নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়েন৷ তিনি স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সঙ্গে একবারের বেশি সহবাস করেন না, কেননা, তিনি সেসব সাময়িক সম্পর্কে কোনো ধরনের ঘনিষ্ঠতা চান না৷ ম্যাক্সের শরীর সম্ভবত কোনোভাবে বীর্যপাতের সময় অক্সিটকিন হরমোনের নিঃসরণ বন্ধ রাখতে পারে৷ এই হরমোন মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে৷ একজন মা যখন তাঁর সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান, তখন তাঁর শরীরে এই হরমোন ভাসতে থাকে৷ ফলে মা এবং সন্তানের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত গাঢ় হয়৷

ই হরমোনের উপস্থিতির কারণে সাময়িক যৌনসম্পর্কও ভিন্ন রূপ নিতে পারে৷ অর্থাৎ, কোনো একজন সঙ্গী বা সঙ্গিনী অপরজনের প্রতি ঘনিষ্ঠতা অনুভব করতে শুরু করতে পারেন৷ অনেক যুগল এই ঝুঁকি এড়াতে একগামী হন, অর্থাৎ, সম্পর্কের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ান না৷ রেবেকাও নিজের অতীতকে পেছনে ফেলে এখন একগামী সম্পর্কে রয়েছেন৷ তবে তিনি তাঁর ছেলেবন্ধুকে মনে করেন একজন রক্ষণশীল মানুষ, যে যৌন জীবনটা রেবেকার মতো উপভোগ করতে পারে না বা চায় না৷

রেবেকা বলেন, ‘‘অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক করতে না পারা নিয়ে আমার এখন কোনো আক্ষেপ নেই৷ তবে, আমি অতীতের সেই উত্তেজনা এখনো মাঝে মাঝে মিস করি৷”

রেবেকার আশা, তাঁর ছেলেবন্ধু একসময় আরো উদার হবেন এবং যৌনমিলনের ব্যাপারটি শুধু বেডরুমেই সীমাবদ্ধ রাখবেন না৷ রেবেকার জন্য সেটা অনেক উত্তেজনাকর ব্যাপার হবে বটে, কিন্তু যদি তাঁর ছেলেবন্ধু সেটা কখনো না করেন, তাহলে কী হবে?

গের্টরুড ভোল্ফের কাছে আরো এক ধরনের ক্লায়েন্ট আসেন, যাঁদের যৌনচাহিদা তাঁদের সঙ্গী বা সঙ্গিনী পূরণ করেন না৷ অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, দু’জনের চাহিদা ভিন্ন কিংবা একজনের চাহিদা অন্যজনের পছন্দ নয়৷ সেসব যুগলের ক্ষেত্রে সম্পর্কটা একসময় এমন এক পর্যায়ে চলে যায় যে, তাঁদের কেউ কেউ নিজের চাহিদা পূরণে অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান৷ এবং প্রতারণা তাঁদের কাছে অস্বাভাবিক কিছু মনে হয় না৷

ভোল্ফ মনে করেন, যৌনতা নিয়ে এমন কোনো একক সমাধান নেই, যা সব যুগলের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে৷ কিছু যুগল এই সমস্যার সমাধানে তাঁদের সম্পর্কটা উন্মুক্ত করে দেন, অর্থাৎ যৌন জীবনে একগামী থাকার ব্যাপারটি বাদ দিয়ে দেন৷ ক্যাথরিনা এবং তাঁর ছেলেবন্ধু ঠিক এই কাজটি করেছেন৷

এই যুগল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, নিজেদের সম্পর্কের বাইরে সাময়িক যৌন সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে তাঁরা একে অপরকে বাধা দেবেন না৷ ক্যাথরিন অবশ্য জানেন, এভাবে যে পরীক্ষা তাঁরা করেন, সেটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটা কোনো মজার ব্যাপার নয়৷ তিনি বলেন, ‘‘আমার কাছে এই উন্মুক্ত সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে, আমি যা খুশি তা-ই করতে পারবো৷”

যেহেতু তাঁদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আর কোনো সীমান্ত নেই, তাই তাঁকে নিজের কৃতকর্মের জন্য দায় নিতে হয়৷ ফলে তিনি এমন কিছু করতে পারেন না, যা তাঁর নিজের এবং তাঁদের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে৷

অনেকক্ষেত্রে পরকীয়াও একটি সম্পর্ককে উন্মুক্ত করে দেয়৷ তবে সেক্ষেত্রে যে এভাবে প্রতারণা করছেন, তাঁর সঙ্গী বা সঙ্গিনী বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে চান না৷

‘‘পরকীয়া বা উন্মুক্ত সম্পর্ক যা-ই হোক না কেন, যুগলের মধ্যে সেটা সংকট তৈরি করতে পারে৷ আবার, এই সংকটের কারণে একটি সম্পর্ক বৃদ্ধিও পেতে পারে,” বলেন ভোল্ফ৷

একগামিতাই একমাত্র ‘অর্থবহ সম্পর্কের ধারণা’ নয়

ডি ডব্লিও এর প্রতিবেদিনে বলা হয় যে, এই সেক্স থেরাপিস্টের কথা হচ্ছে, ‘‘একগামিতাই যেমন সম্পর্কের একমাত্র অর্থবহ ধারণা নয়, আবার একগামিতার ধারণা ব্যর্থও হয়নি৷” ফলে একটি যুগল কোন ধরনের সম্পর্ক গড়বেন, সেটা দিনের শেষে তাঁদেরই নির্ধারণ করতে হবে, অন্য কেউ সেটা ঠিক করে দিতে পারবে না৷

‘‘কেননা, যৌনতা অবশ্যই একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার,” বলেন ভোল্ফ৷