Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

দুপুর ২:০৪ ঢাকা, মঙ্গলবার  ২০শে নভেম্বর ২০১৮ ইং

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

যুদ্ধাপরাধের মামলায় ৬জনকে ফাঁসির আদেশ

গাইবান্ধার সাবেক সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা আবু সালেহ মুহাম্মদ আব্দুল আজিজ মিয়া ওরফে ঘোড়ামারা আজিজসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়েছে আদালত। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে যুদ্ধাপরাধের মামলার রায়ে এ ঘোষণা দেয়া হয়।

আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের বিচারিক প্যানেল আজ এ রায় দেয়। বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন-বিচারপতি আমির হোসেন ও অবসরোত্তর ছুটিতে থাকা ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর সাবেক বিশেষ জজ মো. আবু আহমেদ জমাদার। নবগঠিত এ ট্রাইব্যুনালে এটিই প্রথম রায়।

১৬৬ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্তসার পড়া হয়। রায়ের প্রথম অংশ পড়েন বিচারিক প্যানেলের সদস্য মো. আবু আহমেদ জমাদার, দি¦তীয় অংশ পড়েন বিচারপতি আমির হোসেন এবং দন্ড ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম।

প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ সাংবাদিকদের বলেন, আসামীদের বিরুদ্ধে আনীত তিনটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে সক্ষম হয়েছে প্রসিকিউশন। ছয় আসামীকে প্রথম অভিযোগে আমৃত্যু কারাদন্ড এবং অপর দুটি অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মামলার ৫ আসামীই এখনো পলাতক। ট্রাইব্যুনাল পলাতকদের গ্রেফতারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ও পুলিশের আইজিপিকে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন।

প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের দ্বিতীয় দফা যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ২৩ অক্টোবর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছিল। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে ৭১’এ মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচার শুরুর পর এটি হলো ২৯তম রায়।

আজিজ ছাড়া বাকি আসামিরা হলেন- মো. রুহুল আমিন ওরফে মঞ্জু, মো. আব্দুল লতিফ, আবু মুসলিম মোহাম্মদ আলী, মো. নাজমুল হুদা ও মো. আব্দুর রহিম মিঞা। এর মধ্যে আব্দুল লতিফ ছাড়া অন্যরা পলাতক।

এ মামলার প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বাসস’কে বলেন, এ মামলার আসামীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় ভয়ংকর অপরাধ করেছে। আসামীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসিকিউশন প্রমান করতে সক্ষম হয়েছে। এ আসামীরা তাদের স্থানীয় এলাকাকে নেতৃত্ব শুন্য করতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ১৩ জন নির্বাচিত প্রতিনিধিসহ (চেয়ারম্যান-মেম্বার) মোট ১৪ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করাসহ বিভিন্ন মানবতদাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করেন।

তিনি বলেন, গত ৯ মে এই মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল রায়ের জন্য মামলাটি অপেক্ষামাণ রেখেছিলেন। বিচারপতি আনোয়ারুল হক মৃত্যুবরণ করায় ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে গত ১১ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নবগঠিত ট্রাইব্যুনালে মামলাটি পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করে আদেশ দেয়। সে অনুযায়ী পুনরায় যুক্তিতর্ক অনুষ্টিত হয়। এর আগে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে গত বছর ২৮ জুন এই ছয় আসামির বিচার শুরু হয়।

আসামিদের মধ্যে কারাবন্দি লতিফের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন খন্দকার রেজাউল এবং পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।

আসামীদের বিরুদ্ধে আনা হয় মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, আটক, অপহরণ, লুণ্ঠন ও নির্যাতনের তিনটি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ।

আনীত প্রথম অভিযোগ: ৭১’ এর ৯ অক্টোবর সকাল ৮টা বা সাড়ে ৮টার সময় আসামিরা পাকিস্তানের দখলদার সেনা বাহিনীর ২৫/৩০ জনকে সঙ্গে নিয়ে গাইবান্ধা জেলার সদর থানাধীন মৌজামালি বাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়ে চার জন নিরীহ, নিরস্ত্র স্বাধীনতার পক্ষের মানুষকে আটক, নির্যাতন ও অপহরণ করে। পরে তাদের দাড়িয়াপুর ব্রিজে নিয়ে গিয়ে গনেশ চন্দ্র বর্মণের মাথার সঙ্গে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিয়ে হত্যা করে এবং বাকিদের ছেড়ে দেয়। আসামিরা আটককৃতদের বাড়ির মালামাল লুণ্ঠন করে। এ অভিযোগে আসামীদের আমৃত্যু কারাদন্ড দেয়া হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগ: ওই দিন বিকাল ৪টার দিকে আসামিরা সুন্দরগঞ্জ থানার মাঠেরহাট ব্রিজ পাহারারত ছাত্রলীগের নেতা মো. বয়েজ উদ্দিনকে আটক করে মাঠেরহাটের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করে। পরদিন সকালে আসামিরা বয়েজকে থানা সদরে স্থাপিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তিন দিন আটক রেখে নির্যাতনের পর ১৩ অক্টোবর বিকালে তাকে গুলি করে হত্যা করে লাশ মাটির নিচে চাপা দেয়া হয়। তৃতীয় অভিযোগ: ৭১’ এর ১০ অক্টোবর থেকে ১৩ অক্টোবর আসামিরা পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগিতায় সুন্দরগঞ্জ থানার পাঁচটি ইউনিয়নে স্বাধীনতার পক্ষের ১৩ জন চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে আটক করে। তাদের তিন দিন ধরে নির্যাতন করার পর পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পের কাছে নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে এবং লাশ মাটি চাপা দেয়। সেখানে ওই শহীদদের স্মরণে একটি সৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ অভিযোগে আসামীদের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

আজিজসহ গাইবান্ধার ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। আব্দুল আজিজ মিয়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পযর্ন্ত বিএনপি নেতৃত্বধীন চারদলীয় জোটের অধীনে জামায়াত থেকে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ-১ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন।