ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৬:০৯ ঢাকা, রবিবার  ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

যায় দিন ভাল যায়

এটা হয়তো অনিবার্যই ছিল। পলিটিক্স ইজ আর্ট অব কমপ্রোমাইজ। সারা দুনিয়ায় এ কথা সত্য হলেও বাংলাদেশে তা নয়। ৪৩ বছরের ইতিহাস সংঘাতের। রক্তাক্ত আর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক সময়ের সাক্ষী এই জনপদের মানুষ। তবে ২০১৪ সাল ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম। ৫ই জানুয়ারি হতবিহ্বল করে দেয় বিরোধী শক্তিকে, জাতিকে। অর্ধেকের বেশি আসনে ভোটই হয়নি নতুন ধারার এ নির্বাচনে। বাকি আসনগুলোতেও ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। কিন্তু নানা সমীকরণ রাজনীতি থেকে অনেকটা তাড়িয়েই দেয় বিরোধীপক্ষকে। বছরের শুরুতেই অবরোধ কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ায় বিএনপি জোট। এরপর আর রাজপথে তাদের তেমন কোন উপস্থিতি চোখে পড়েনি। চার দেয়ালে বন্দি হয়ে পড়ে তাদের কার্যক্রম। যদিও কয়েকটি প্রকাশ্য সমাবেশেও বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তবে বছরের শেষ প্রান্তে এসে আবারও উত্তাপ্ত ছড়িয়ে পড়েছে রাজনীতিতে। খালেদা জিয়ার আদালতে হাজিরাকে কেন্দ্র করে ২৪শে ডিসেম্বর আলিয়া মাদরাসা এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের শোডাউনে ছাত্রলীগ হামলা চালালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ছাত্রলীগের বাধা আর প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞায় গাজীপুরের সমাবেশ থেকে পিছু হটে বিএনপি। এ ঘটনা রাজনীতির উত্তাপে নতুন মাত্রা যোগ করে। সোমবার সারা দেশে হরতাল পালন করে ২০ দলীয় জোট। এরই মধ্যে মঙ্গলবার জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। এ রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতের দু’দিনের হরতাল পালিত হচ্ছে। ২০১৪ সালের শেষ আর ২০১৫ সালের প্রথম দিনটি হরতালের মধ্যেই কাটাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে অনুমান করা যাচ্ছে সামনের দিনগুলো নিশ্চিত করেই হবে আরও অনিশ্চিত আর সংঘাতময়। ক্ষমতাহীন গোষ্ঠী ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে আপ্রাণ। যদিও তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গণভবন আর গুলশান দুই জায়গাতেই কৌশল পালটা কৌশলের কষাকষি চলছে। দৃশ্যত সরকার আগের চেয়েও সতর্ক ও কঠোর। প্রশাসন আর দলীয় দুই দিক থেকেই শতভাগ প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ৫ই জানুয়ারির আগে বিরোধীদের আন্দোলন দমনে শুধু প্রশাসন ব্যবহার করা হয়েছিল। সে সময় ঢাকার বাইরে সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের অনেকটা আড়ালে থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হয়। কিন্তু এবারের চিত্র কিছুটা আলাদা। এবার সবার আগে মাঠে নেমে পড়েছে ছাত্রলীগ। যদিও একাধিক সূত্রের দাবি, ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির নেতারা নিজেদের মেয়াদ বাড়ানোর জন্যই এতটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নিজেদের বিপর্যস্ত অবস্থাও কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বহুল আলোচিত-সমালোচিত সংগঠনটি। আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোও রাজপথে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণের চেষ্টা করছে। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় একাধিক কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে সরকার সমর্থক সংগঠনগুলোর। অন্যদিকে, প্রশাসনও ঢেলে সাজানো হয়েছে। পুলিশের শীর্ষ পদগুলোতে রদবদল করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে শিগগিরই। আরও নানা সুযোগ-সুবিধাও দেয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অবশ্য কোন কিছু গোপন করেননি। ক’দিন আগেই তিনি প্রকাশ্যই বলেছেন, সরকারের জন্য একটি সেটিসফাইড প্রশাসন প্রয়োজন।

বিরোধী জোট বছর ধরে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিলেও তা নিয়ে খোদ জোটের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেই সন্দেহ-সংশয় রয়েছে। বকশীবাজারে ছাত্রদল ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও সোমবারের হরতালে বিএনপি সমর্থকদের খুব বেশি তৎপরতা দেখা যায়নি। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, এটা কৌশলেরই অংশ। জানুয়ারির আন্দোলনের আগে কোন ধরনের শক্তিক্ষয় করতে চায় না বিএনপি। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি’র এক ধরনের দূরত্বও দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরকে ফ্রন্টলাইনে দেখা গেলেও এবার তা দেখা যাচ্ছে না। জামায়াতের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এবার সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি’র ভূমিকা দেখেই নিজেদের কৌশল ঠিক করবে দলটি। তাদের নিজস্ব বিশ্লেষণ, বিএনপি প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন না করায় বিগত সরকার বিরোধী আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এবার বিএনপি ফ্রন্টলাইনে থাকলেই কেবল রাজপথে শক্ত ভূমিকায় দেখা যাবে জামায়াত-শিবির কর্মীদের। তবে সরকারের পতনের কোন সম্ভাবনা দেখা গেলে তারা সর্বশক্তি দিয়েই মাঠে নামবে। রাজনৈতিক অঙ্গনের নয়া শক্তি হেফাজতে ইসলাম অবশ্য এখন সরকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সমঝোতার ভিত্তিতেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, মামলা আর কারাগার- পুরনো এই কৌশল নতুন করে বিরোধী শক্তির ওপর প্রয়োগ করছে সরকার। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, যুবদল সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ঢাকা মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক মির্জা আব্বাসসহ বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। দেখা মাত্র গুলির হালআমলের নীতিও বহাল আছে শক্তভাবেই। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এ আসলে বিরোধী আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যাওয়ারই কৌশল।

সব কিছু মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে আবারও সংঘাতের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে পুরোদমেই। মিছিল-পাল্টা মিছিল, বিস্ফোরণ, গাড়িতে আগুন, যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের আর্তনাদ, ইটের আঘাতে নিহত শিক্ষিকা- এসব আবার শুরু হয়েছে নতুন করে। ২০১৫ সাল বাংলাদেশের মানুষ শুরু করছে সংঘাত আর সংঘর্ষের আগমনী বার্তার মধ্যেই। এ বার্তা মনে করিয়ে দিচ্ছে বহু পুরনো বাংলা প্রবাদ- যায় দিন ভাল যায়।