Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

রাত ৪:১০ ঢাকা, মঙ্গলবার  ১৩ই নভেম্বর ২০১৮ ইং

মৃত্যুদণ্ডেই কি ভারতে ধর্ষণের সমস্যার সমাধান হবে?
দিল্লিতে ধর্ষণের প্রতিবাদে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ, ছবিঃ ২৪ ডিসেম্বর, ২০১২, বিবিসি

মৃত্যুদণ্ডেই কি ভারতে ধর্ষণের সমস্যার সমাধান হবে?

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রায় ছ’বছর আগে চলন্ত বাসে একজন প্যারামেডিক্যাল ছাত্রীকে নৃশংস গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আজ (সোমবার) সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট ধর্ষণকারীদের ফাঁসির সাজা বহাল রেখেছে।

ভারতে ‘নির্ভয়া’ নামে পরিচিত ওই ছাত্রীর ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে নজিরবিহীন প্রতিবাদ হয়েছিল, যার জেরে সে দেশে এমনকী ধর্ষণের সংজ্ঞা ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা রোখার আইন পর্যন্ত পাল্টানো হয়েছিল।

নির্ভয়ার পরিবার ও দেশের একটা বড় অংশ সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে ঠিকই – কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে ভারতে ধর্ষণের হার আদৌ কমানো যাবে কি না, সেই বিতর্কও কিন্তু পাশাপাশি চলছে।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে সারা ভারত শিউরে উঠেছিল যে নির্ভয়ার ধর্ষণের ঘটনায় – তাতে চার প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়েছিল গত বছরেই। তাদের মধ্যে তিনজন সেই সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করার জন্য শীর্ষ আদালতে যে আবেদন করেছিলেন, সেটা সোমবার খারিজ হয়ে গেল।

প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে এমন কোনও নতুন তথ্যপ্রমাণ আদালতে পেশ করা হয়নি যাতে সুপ্রিম কোর্ট তাদের আগেকার রায় পুনর্বিবেচনা করবে।

ধর্ষণকারীদের পক্ষে আইনজীবী এ পি সিং অবশ্য দাবি করছেন, তার মক্কেলরা এখানে সুবিচার পাননি। মি সিংয়ের বক্তব্য, “এই বাচ্চা ছেলেদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে যে ন্যায় বিচার পাওয়া উচিত ছিল সেটা তারা পায়নি। তীব্র জনমতের চাপ, রাজনৈতিক চাপ ও মিডিয়ার চাপেই এই ফয়সালা নেওয়া হয়েছে।”

ভারতে মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্টদের একাংশও এই মৃত্যুদন্ডের রায়ের বিরোধিতা করছেন।

কিন্তু সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বিক্রম সিং, যিনি একটা সময় নির্ভয়া মামলাও সামলেছেন, তিনি মনে করেন এখানে অপরাধীদের বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখানোর সুযোগ নেই।

মি সিং জানাচ্ছেন, “ছত্রিশ বছরের পুলিশ কেরিয়ারে এই চারজন ধর্ষণকারীর মতো ঠাণ্ডা মাথার অপরাধী আমি আর দেখিনি। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাদের বিরুদ্ধে নই, তাদের ফাঁসি হলে আমার কোনও লাভ নেই – তারপরও বলব তাদের ফাঁসি হওয়াই উচিত কারণ এরা সমাজের জন্য একটা ঝুঁকি, আমাদের মেয়েদের জন্য একটা বিপদ।”

“এদের সহানুভূতি ততক্ষণই দেখানো যায় যতক্ষণ আপনি নিজে বা আপনার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত না-হচ্ছেন। কিন্তু বুকে হাত রেখে বলুন তো, আপনি কি রাস্তাঘাটে-বাসে-ট্রেনে এই বিকৃতমনস্ক অপরাধীদের সঙ্গে আপনার মেয়েকে যেতে দিতে পারবেন?”

ভারতে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত বলে যারা মনে করেন, তারাও মোটামুটি এই ধরনের যুক্তিই দেন। সুপ্রিম কোর্টের ফয়সালার পর নির্ভয়ার বাবা-মাও ফাঁসির পক্ষেই জোরালো সওয়াল করেছেন।

নির্ভয়ার মা আশা দেবী যেমন বলছেন, গত ছ’বছর ধরে আদালতে চক্কর কাটতে তার অসম্ভব কষ্ট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যখন দেখেন যে আদালত ফাঁসির সাজার পক্ষেই রায় দিচ্ছে তখন তিনি শান্তি পেয়েছেন।

তার বাবা বদ্রিনাথ সিং আবার বিশ্বাস করেন, “যতদিন না দোষীদের ফাঁসি হচ্ছে দেশে ধর্ষণের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। কারণ এখন কেউ ধর্ষণ করতে ভয় পায় না – হয়তো ফাঁসিতে ঝোলালে একটা ভয় তৈরি হবে। কাজেই আইনি প্রক্রিয়া জলদি শেষ করে এদের ফাঁসিতে লটকাও!”

কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী করুণা নন্দী মনে করেন, মৃত্যুদণ্ডই ধর্ষণের সমস্যার সমাধান কি না, এর পরও তা নিয়ে ভাববার অবকাশ আছে।

মিস নন্দীর কথায়, “এত নৃশংস একটা ঘটনায় ফাঁসির দাবিতে জোরালো জনমত আছে সন্দেহ নেই – তার পরিবারও নিশ্চয় খুশি যে তারা একটা ক্লোসারের দিকে এগোচ্ছেন। কিন্তু সামাজিক স্তরে আমাদের এর পরেও বুঝতে হবে যে মৃত্যুদণ্ডে কোনও কাজ হয় না।”

“বহু ক্ষেত্রে ধর্ষণের মামলায় আদালতও সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে সঠিক রায় আদৌ দেওয়া যাচ্ছে কি না – আর একবার ফাঁসি হলে তা রদ করারও তো কোনও উপায় থাকে না। এমনকী, বিলকিস বানো ধর্ষণ মামলায় ধর্ষিতা নিজেও কিন্তু অপরাধীদের ফাঁসি চাননি – সশ্রম কারাদণ্ড চেয়েছিলেন। কাজেই সমাজ হিসেবে আমাদের এই দিকটায় অন্যভাবে দেখারও দরকার আছে।”

নির্ভয়ার মামলায় দোষীদের ফাঁসি হওয়ামাত্র ভারতে ধর্ষণের ঘটনা কমে যাবে, দেশের বেশির ভাগ লোকই অবশ্য তা বিশ্বাস করেন না। কিন্তু তার পরেও তাদের এই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করার মতো কন্ঠস্বর ভারতে প্রায় নেই বললেই চলে! -বিবিসি

FOLLOW US: