ব্রেকিং নিউজ

সন্ধ্যা ৭:২৫ ঢাকা, বৃহস্পতিবার  ১৯শে জুলাই ২০১৮ ইং

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বেপজা’ও সাফল্য দেখাতে সক্ষম হবে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ দেশের রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলো (ইপিজেড) সফলভাবে পরিচালনায় বেপজা’র ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ইপিজেডের মত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) পরিচালনায়ও বেপজা সাফল্য দেখাতে সক্ষম হবে।

তিনি বলেন, ‘বেপজা বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আমি বিশ্বাস করি ইপিজেডের মত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনায়ও বেপজা সাফল্যের পরিচয় দিবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বেপজা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন-২০১৮’র উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তাঁর সরকার বেসরকারি খাতের উন্নয়নে কাজ শুরু করে। দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য তাঁর সরকারই প্রথম দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিয়ে বেপজা ইনভেস্টরস্ কনফারেন্স করেছিল।

তিনি বলেন, সে সময় দেশে চট্টগ্রাম ইপিজেড এবং স্বল্প পরিসরে ঢাকা ইপিজেড চালু ছিল। পরবর্তীকালে বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য তাঁর সরকার ঢাকা ও চট্টগ্রাম ইপিজেডের সম্প্রসারণ করে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কুমিল্লা, মংলা, ঈশ্বরদী এবং নীলফামারিতে ইপিজেড স্থাপন করে।

‘দেশের অধিকাংশ ইপিজেড আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থাপিত হয়েছে। ইপিজেড স্থাপনের ফলে ঐসব অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে,’ -বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তাঁর সরকারের সময়ে বেপজা’র সাফল্যের বিষয়ে মানুষকে তথ্য প্রদানের পাশাপাশি (বিইপিজেডএ-বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটি) বেপজা’র মাধ্যমে বিনিয়োগ, রপ্তানী ও কর্মসংস্থানের চিত্র তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়েই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনে বেপজার গত ৯ বছরের অবদান ও সাফল্য তুলে ধরা হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এবং বেপজা ইনেভেস্টরস এসোসিয়েশন চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। বেপজা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. হাবিবুর রহমান খান স্বাগত বক্তৃতা করেন।

অন্যান্যের মধ্যে এভারগ্রীন প্রডাক্টস ফ্যাক্টরি (বিডি) লি. এর ব্যাপস্থাপনা পরিচালক চ্যাং ইয়ো চ্যাং এবং কর্ণফুলী ইপিজেড-এর একজন চাকরিজীবী পান্না ইয়াসমিন ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারোন্সের মাধ্যমে চট্টগ্রামে বেপজার অধীনে পরিচালিত মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী নির্মাণ ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এই ইপিজেড-এর যাত্রা শুরু করেন।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চট্টগ্রাম প্রান্ত থেকে বক্তৃতা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভিত্তিফলক উন্মোচনের মাধ্যমে আজ মিরসরাইয়ে বেপজার অর্থনৈতিক অঞ্চলের আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হল। এজন্য বেপজাকে ইতোমধ্যে ১ হাজার ১৫০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। শিল্পের প্রসার, রপ্তানি খাত সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। সরকার এ ক্ষেত্রে সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

দেশের জমির পরিমাণ সীমিত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সীমিত জমিতে একদিকে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদন করতে হবে, অন্যদিকে শিল্প-কারখানা স্থাপন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

দেশে এখনও অনেক অনূর্বর ও পতিত জমি রয়েছে, শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য এ ধরনের জমি বাছাই করার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বছরে ৩-৪টি ফসল হয় এমন উর্বর কৃষি জমিতে কলকারখানা স্থাপন নিরুৎসাহিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এ কারণেই তাঁর সরকার সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে, যেখানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ হবে। শিল্প কলকারখানা গড়ে উঠবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এক জায়গায় সমন্বিতভাবে কলকারখানা স্থাপন করলে বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে তাদের সেবা দেওয়া সহজ হয়। পাশাপাশি জমির অপচয়ও বন্ধ হয়।’

তাঁর সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতির ফলেই চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৩৮টি দেশের বিনিয়োগকারীগণ ইপিজেডের কারখানায় বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড পণ্য উৎপাদন করছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘বেপজার অধীনে ইপিজেডগুলি দেশের মোট জাতীয় রপ্তানি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখছে। সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি, সময়োপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং আপনাদের প্রচেষ্টা এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হয়েছে।’

সরকার প্রধান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বেপজার বিনিয়োগ দ্বিগুণের বেশি এবং রপ্তানি প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের ৮টি ইপিজেড মাত্র ২ হাজার ৩০৭ দশমিক ২৭ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। এই ৮টি ইপিজেডে মোট ৪৬৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশী নাগরিকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যার শতকরা ৬৪ ভাগই নারী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত নয় বছরে ইপিজেডগুলিতে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬২০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য তাঁর সরকার মূলধন এবং মুনাফা প্রত্যাবাসন, ট্যাক্স হলিডে প্রদানসহ বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ সুুুবিধা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, আমাদের রয়েছে তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং দক্ষ জনবল। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সমস্যা আমরা কাটিয়ে উঠেছি।

বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে তাঁর সরকার বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় মেট্রোরেলের কাজ চলছে। আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করছি। পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের তো বটেই, সারাদেশের আর্থ-সামজিক উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

তাঁর সরকার রূপসা সেতু ও পায়রা বন্দর নির্মাণ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। ঢাকা-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। বাগেরহাটে একটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরসহ দেশে আরও একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা হবে।

বর্তমানে দেশের ৮৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করছে উল্লেখ করে প্রদানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিদ্যুত উৎপাদন সক্ষমতা ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। মাতারবাড়ি ও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ এগিয়ে চলছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজও সন্তোষজনক গতিতে এগিয়ে চলছে।

সীমিত পণ্যের উপর নির্ভরশীলতা আমাদের দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম দুর্বলতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সরকার রপ্তানি তালিকায় নতুন নতুন পণ্য যুক্ত করার এবং কম অবদান রাখছে এমন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল তৈরিতে বেপজা আন্তরিকভাবে কাজ করছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, বেপজা ‘লো কার্বন গ্রিন জোন’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

তিনি বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের সময়েই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা ইপিজেডে কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) চালু হয়েছে। আদমজী ইপিজেডের একটি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিশ্বের গ্রিন ফ্যাক্টরির তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।

তাঁর সরকার শ্রমিক-মালিক-ব্যবস্থাপনার সুসম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে থাকে উল্লেখ করে শ্রমিকদের কল্যাণে তাঁর সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার স্বার্থে ‘ইপিজেড শ্রমিক কল্যাণ সংঘ ও শিল্প সম্পর্ক আইন-২০১০’ প্রণয়ন করেছি। এই আইনের আওতায় ইপিজেডের শ্রমিকেরা গোপন ভোটের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন।’

নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ ট্রেড ইউনিয়নের ন্যায় শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিগত ৭ বছরে আমরা ইপিজেডের শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি দুইবার বৃদ্ধি করেছি। ইপিজেডের শ্রমিকেরা বিনামূল্যে ওষুধ ও স্বাস্থসেবা পাচ্ছেন। নারী শ্রমিকেরা মাতৃত্বকালীন ছুটি, ইপিজেডে বেপজা পাবলিক স্কুল ও কলেজগুলিতে শ্রমিকদের ছেলেমেয়েরা কম খরচে লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অধিকাংশ ইপিজেডেই ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে। তিনি এ সময় শ্রমিকদের এসব সুবিধাদি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বেপজা ও বিনিয়োগকারীদের ধন্যবাদ জানান।

শেখ হাসিনা শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট। ইপিজেডের বাইরের পোশাকখাতের শ্রমিক-কর্মচারিদের বেতনভাতা বৃদ্ধির জন্য আমরা মজুরি কমিশন গঠন করেছি। এর আগে আমরা দু’দফা বেতনভাতা বৃদ্ধি করেছিলাম।’

প্রধানমন্ত্রী কোনরকম উস্কানীতে বিভ্রান্ত না হবার জন্যও এ সময় শ্রমিকদের প্রতি অনুরোধ করেন।