ব্রেকিং নিউজ

রাত ৪:১৪ ঢাকা, বুধবার  ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

বেকায়দায় বাণিজ্যিক ব্যাংক

ডিসেম্বর প্রান্তিকে ঋণ আদায় বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতিটি শাখায় লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়া হচ্ছে। শাখাব্যবস্থাপকেরাও আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঋণ আদায়ের জন্য গ্রাহকদের কাছে যাচ্ছেন কর্মকর্তারা। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হতাশ মনে ফিরে আসছেন। এ পরিস্থিতিতে ডিসেম্বর প্রান্তিকে ভালো কোনো কিছু আশা করছেন না।
কথাগুলো বলেছেন দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী। গত বৃহস্পতিবার তার সাথে আলাপকালে জানান, অতীতে ব্যাংকিং খাত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি, অন্তত ২৮ বছরের তার ব্যাংকিং ক্যারিয়ার তাই বলছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দাভাব যেন কাটছে না। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাব, চলমান পরিস্থিতিতে আস্থার সঙ্কটে বিনিয়োগ স্থবিরতা যেন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। ব্যবসাবাণিজ্যের এ অচলাবস্থায় বেকায়দায় পড়েছেন ব্যবসায়ী বিশেষ করে মধ্যবর্তী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। লোকসানের ঘানি টানতে টানতে একসময়ে হাঁপিয়ে উঠছেন। ঋণনির্ভর ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বড়, মাঝারি ও ছোট মাপের শিল্পকারখানায় বিভিন্ন অঙ্কের মেয়াদি ঋণ বিতরণ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এসব ঋণ বিতরণ ও আদায়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেকায়দায় রয়েছেন মাঝারি আকারের ব্যবসায়ীরা। গত অর্থবছরে মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেছিলেন ৯ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। অথচ আগের দুই বছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল আরো বেশি। যেমন ২০১২-১৩ অর্থবছরে তারা ঋণ পরিশোধ করেছিলেন ৯ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা এবং তার আগের অর্থবছরে অর্থাৎ ২০১১-১২ অর্থবছরে পরিশোধ করেছিলেন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। একইভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে তা আরো কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের এ সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়ে ব্যবসায়ীরা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন। বর্তমান অবস্থায় ব্যবসায়ীদের দিনও ভালো কাটছে না। কেননা ব্যবসাবাণিজ্য না থাকলে পুঁজি ভেঙে কতদিন চলবে ব্যবসায়ীদের। যাদের বহুমুখী ব্যবসায় রয়েছে তারা একটা লোকসান করে আরেকটিতে কিছুটা মুনাফা করে কোনো রকম টিকে আছেন। কিন্তু বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই স্বল্প পুঁজি বা একমুখী ব্যবসার সাথে জড়িত। এর ফলে একটি ব্যবসায় মার খেলে আর ওই ব্যবসায় উঠতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে তাদের ব্যবসায় বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প পথও খোলা থাকে না। গত জানুয়ারির আগে ছিল এক পরিস্থিতি। কেননা সাধারণত আমাদের দেশে প্রায় দুই দশক ধরে সরকার পরিবর্তনের সময় বিরোধী দল হরতাল ধর্মঘট করে সরকারকে দুর্বল করতে চায় তাদের দাবি-দাওয়া আদায় করতে। এ কারণে জানুয়ারির আগের পরিস্থিতি বাংলাদেশের জনগণের কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু ডিসেম্বরের পর থেকে অনেকটাই স্থবিরতা নেমে এসেছে। যাদের কাছে বিনিয়োগ করার মতো অর্থ রয়েছে, যারা এত দিন অপেক্ষায় ছিলেন, নতুন বিনিয়োগ করবেন তারা আর নতুন বিনিয়োগে আসছেন না। তারা এখন অন্তত পাঁচ বছরের রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশের জন্য অপেক্ষা করছেন। ফলে যারা চলমান ব্যবসায়ে ছিলেন তারাও যেমন ভালো নেই, যারা নতুন বিনিয়োগের জন্য পরিকল্পনা করে ছিলেন তারাও ভালো নেই।
প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানিয়েছেন, ব্যবসাবাণিজ্যের এমন পরিস্থিতে বেকায়দায় পড়েছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এক দিকে ব্যবসাবাণিজ্য মন্দা, পাশাপাশি ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। আর খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় আয় থেকে অর্থ নিয়ে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে নিট আয় কমে যাচ্ছে। কিন্তু অপর দিকে, ব্যয় কমছে না, বরং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা, ইউটিলিটি বিল বর্ধিত হারে পরিশোধ করতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামনে ব্যাংকিং খাতের জন্য কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।