ব্রেকিং নিউজ

দুপুর ২:০৪ ঢাকা, বুধবার  ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বিদ্যুৎ: সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল, এটা চলবে না

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ ব্যবহারে জনগণকে মিতব্যয়ী হবার আহবান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাঁর সরকারকে অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই দেশের মানুষ এই বিদ্যুৎ যথাযথভাবে ব্যবহার করবেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে কিন্তু অনেক টাকা খরচ হয় এবং যে পরিমান টাকা খরচ হয় সেই টাকা কিন্তু বিদ্যুতের দাম আমরা গ্রহণ করি না এখানে আমরা ভর্তুকি দেই। সেক্ষেত্রে আমি প্রত্যেককেই বলবো বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে।’

শেখ হাসিনা আজ তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভেড়ামারা ৪১০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ১৫ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির উদ্বোধনকালে একথা বলেন।

তিনি অনুষ্ঠান থেকে উদ্ভাবনীমূলক অনলাইন ট্রেনিং প্লাটফর্ম ’কুশলী’র উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, কীভাবে স্বল্প বিদ্যুৎ খরচ করে আপনারা আপনাদের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে পারেন সেদিকে আপনাদের যতœবান হতে হবে। এমন না যে, সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল, এটা করলে কিন্তু চলবে না। প্রত্যেককেই এ ব্যাপারে যথাযথভাবে আন্তরিক থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় ঘর থেকে বের হবার সময় নিজ হাতে বিদ্যুতের সুইচটি অফ করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, স্কুল-কলেজ অফিস, আদালতে বা আপনারা যারা সরকারি কর্মচারি আছেন তারা নিজ হাতে সুইচটা অফ করলে আপনাদের কোন ক্ষতি হবে না বরং দেশের সম্পদটা আপনি রক্ষা করতে পারলেন।

তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়েও ঘর-বাথরুম থেকে বের হবার সময় নিজ হাতে বিদ্যুতের সুইচ অফ করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি নিজ হাতেই কিন্তুু বিদ্যুতের সুইচগুলো অফ করি তাতে আমার কোন সম্মান যায় না। নিজের কাজ নিজে করাতে কোন লজ্জা নেই। কিন্তু, এতে সুবিধা যেটা পাবেন বিদ্যুৎ ব্যবহারে যদি সাশ্রয়ী হন তাহলে বিদ্যুৎ বিলটা কম আসবে।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা এসব ইলেকট্রনিক ডিভাইস চার্জ শেষে চার্জারটি বিদ্যুতের সংযোগ থেকে খুলে রাখলেও অনেকটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায় বলে উল্লেখ করেন।

তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্পর্কে শিক্ষাদানেও শিক্ষকদের প্রতি আহবান জানান।

বিদ্যুতের পাশাপাশি পানি ব্যবহারেও সকলকে সাশ্রয়ী হবার পরামর্শ দিয়ে অপচয় রোধ করার আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী ।

জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত উদ্যোগ তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম, জাতীয় সংসদের হুইপ আতিউর রহমান আতিক, জাপান দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ এবং পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তাঁর সরকার কুশলী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে একটি ই-লার্নিং প্লাটফর্মও তৈরী করা হয়েছে, যারা এখানে কর্মরত আছেন তারাও যথেষ্ট লাভবান হবেন।

তিনি বলেন, তাঁর সরকারের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের মানুষ স্বাবলম্বী হবে, তাঁরা কাজ পাবে এবং কাজের মধ্যদিয়ে তাঁদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে। যেটা সরকারেরই লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তোরণকে একটি বিরাট অর্জন উল্লেখ করে উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য সরকার সেসব স্থানে যেসব প্রকল্প গ্রহণ করেছে তা যথাসময়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে এজন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী দেশের বিদ্যুতায়নের ইতিবৃত্ত তুলে ধরে বলেন, ’৭৫ পরবতর্তীকালে যারা হত্যা ক্যু ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের ক্ষমতায় এসেছিল তারা নিজেদের আখের গোটাতেই ব্যস্ত ছিল এবং দেশের মানুষের ভাগ্য গড়াটা তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পেতনা। যার জন্য মেধাবী ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের ঝনঝনানি, সারাদেশে কখনও সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, ১৯টি ক্যু সংঘটিত হওয়া-নানা ঘটনা এদেশের মানুষকে হতাশায় নিমজ্জিত করে।

তিনি বলেন, ’৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখনই আমরা দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলি পূরণের চিন্তা করি এবং আমাদের উদ্যোগের ফলেই সেই সময়ে ১৬শ মেগাওয়াট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে ৪ হাজার ৩শ মেগাওয়াট করতে সক্ষম হয়েছিলাম।

তিনি এই সময় উত্তরবঙ্গের মঙ্গার কথা স্মরণ করে বহুবার সেখানে গিয়ে, এমনকি বিরোধী দলে থাকার সময়েও লঙ্গরখানা খোলার কথা উল্লেখ করে বলেন, তাই ক্ষমতায় যাবার পরই তাঁর সরকারের লক্ষ্য ছিল এসব মঙ্গা ও দুর্ভিক্ষ পীড়িত এলাকার মানুষের জীবন মান উন্নয়ন করা। যেজন্য তাঁর সরকার রাস্তা-ঘাটসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন এবং ঘরবাড়ি তৈরী করা দেওয়া থেকে শুরু করে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতে না পারায় দেশ আবারো পিছিয়ে পড়ে উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তার ২০০১ সালে রেখে যাওয়া ৪ হাজার ৩শ মেগওয়াট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন না বেড়ে উল্টো কমে ৩ হাজার ২শ মেগাওয়াট হয়ে যাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় বিএনপি চেয়ারপার্সনের পুত্রের খাম্বা তৈরীর কারখানা চালানোর জন্য বিভিন্নস্থানে বিদ্যুৎ না দিলেও রাস্তার পাশে কেবল বিদ্যুতের খাম্বা পুঁতে রেখে মানুষকে ধোকা দেওয়ায় বিএনপি-জামায়াত সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ নাই কিন্তু রাস্তার পাশে খাম্বা পড়ে আছে। কারণ, আমরা জানতে পারলাম তখনকার যিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া তার ছেলে খাম্বা নির্মাণের ব্যবসা শুরু করেছিল। ঐজন্য দেশের মানুষকে খাম্বা দিয়েছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ দেয়নি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর আবার নতুন করে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা পুণর্গঠন করে তাঁর সরকার বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৬ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করেছে।

তিনি বলেন, ১৬ মেগাওয়াট থেকে শুরু করে এখন ১৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করছি।

সরকার প্রত্যেক ঘরে আলো জ্বালার লক্ষ্য নিয়ে বিদ্যুতের উৎপাদন বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানন্ত্রী বলেন, আমাদের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ শুরু হয়েছে, সোলার সিষ্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রদান করছি, আমরা কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছি, বড় পুকুরিয়া কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৩য় ফেইজে বিদ্যুৎ উৎপাদন চলছে।

তাঁর সরকার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে বলেই দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

যে ১৫টি উপজেলায় আজ শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- ধামরাই, নিকলী, রাউজান, পীরগঞ্জ, খোকসা, দেবহাটা, রূপসা, ফুলতলা, দীঘলিয়া, বিয়ানীবাজার, দক্ষিণ সুরমা, বাঘাতিপাড়া, বেড়া, হবিগঞ্জ সদর এবং চুয়াডাঙ্গা সদর।

প্রধানমন্ত্রী পরে বিদ্যুতায়িত ১২টি স্থানের জনগণের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময় করেন।