ব্রেকিং নিউজ

বিকাল ৫:২৬ ঢাকা, বুধবার  ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

বিটিসিএল কে দেয়া ঋণের ২০০ কোটি টাকা ফেরত নিলো জাইকা

রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-কে দেয়া ২০০ কোটি টাকা ফেরত নিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। এর মাধ্যমে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্প (লট-বি) ঘোর অন্ধকারে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ই মে অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সিনিয়র সচিবকে দেয়া এক এক চিঠিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাইকা’র প্রধান মিকিও হাতাইদা জানান, বারবার অনুরোধের পরও বিটিসিএল লট-বি বাস্তবায়নে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় জাপান সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রকল্পে ঋণের টাকা ফেরত নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, এজন্য এই সিদ্ধান্ত থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও বিটিসিএলকে শিক্ষা নিতে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২রা জুন জাইকার সঙ্গে সরকারের ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এ অর্থ ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। বিটিসিএল ও ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ মাস ধরে সরকার-স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তি এবং জাইকার নির্দেশনা ভঙ্গ করে বিভিন্ন অনিয়ম থেকে সৃষ্টি হওয়া দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত হয়ে জাইকা বিটিসিএলকে নিয়ম মেনে চলতে তাগাদা দিয়ে আসছিল। আলোচিত লট-বি টেন্ডারের বিপরীতে যোগ্য ও সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়নি বিটিসিএল। বরং তৃতীয় দফা দরপত্র আহ্বানের চেষ্টা করে তারা। এ নিয়ে গত ১৮ই জানুয়ারি বিটিসিএল, ২২শে জানুয়ারি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ১৬ই ফেব্রুয়ারি ইআরডির সচিবকে চিঠি দেয় জাইকা। তাতেও বিহিত না হওয়ায় ঋণ প্রত্যাহার করে নেয়। এসব চিঠির অনুলিপি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দেয়া হয়। এরপরও বিটিসিএলের ক্ষমতাধর সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে বিষয়টি সুরাহা হয়নি। টিঅ্যান্ডটি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ভেতর এবং আন্তর্জাতিক প্রবেশ পথগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপনের জন্য টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পটি (লট-বি) হাতে নেয়া হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে এক বা একাধিক ক্যাবল কাটা গেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিকল্প পথে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হয়। মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ সুদে ৩০ বছরে পরিশোধযোগ্য ঋণের মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল জাইকা। এর ভিত্তিতে ২০১১ সালের মাঝামাঝি লট-বি প্রকল্পের প্রাক-যোগ্যতার দরপত্র আহ্বান করা হয়। পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে উচ্চমূল্যে কাজ দিতে প্রাক-যোগ্য দরপত্রে নেটাস নামে তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠানকে যাচাই পর্যায়ে বাদ দেয় বিটিসিএল। এরপর থেকেই সমস্যা শুরু হয়। প্রাক- যোগ্যতার বাদ পড়ার পর নেটাস সরকার-গঠিত রিভিউ প্যানেলের কাছে এর প্রতিকার চায়। বিচারে রিভিউ প্যানেল নেটাসকে প্রাক-যোগ্য ঘোষণা করে আদেশ দেয়। এরপরও বিটিসিএল নরম হয়নি। তাদেরকে প্রাক-যোগ্য ঘোষণা করেনি। এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে। দুদক থেকে বাঁচতে বিটিসিএল রিভিউ প্যানেলের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট ও পরে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। বিচারে হাইকোর্ট রিভিউ প্যানেলে রায় সঠিক বলে নেটাসের পক্ষে রায় দেয়। পরে সুপ্রিম কোর্টও আপিল খারিজ করে দিয়ে নেটাসকে প্রাক- যোগ্য ঘোষণা করে পুনঃ দরপত্রের নির্দেশ দেয়। এভাবে পুনঃদরপত্র আহবানের নামে সময় পেরিয়ে গেছে তিন বছর। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আদেশ আমলে না নিয়ে কার্যাদেশ না দেয়ার চেষ্টায় কেটে গেছে আরও এক বছর। এভাবেই প্রকল্পের সময় চার বছর খেয়ে ফেলা হয়। টিঅ্যান্ডটি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় টিক করা হয়েছিল ১ কোটি ৩৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার বা ১১১ কোটি টাকা। নেটাসকে প্রাকযোগ্যতায় বাদ দিয়েই তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের ব্যয় ১  কোটি ১১ লাখ ৭ হাজার ডলার বাড়িয়ে ২ কোটি ৪৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার (২০০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা) করে বিটিসিএল। এরপর জাপানের এনইসি ও কোরিয়ান কেটির মধ্যে দরপত্র ডাকে বিটিসিএল। এ বিষয়ে দেশের শীর্ষ এক গোয়েন্দা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে জানায়, আকস্মিক প্রাক্কলন ব্যয় বাড়ানোর উদ্দেশ্য শতকোটি টাকা আত্মসাৎ। এতে প্রকল্প পরিচালকসহ বিটিসিএলের কিছু কর্মকর্তা, বিদেশী পরামর্শক ও দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার আর্থিক সুবিধার সংশ্লিষ্টতা পায় সংস্থাটি। প্রমাণ হিসেবে কথোপকথনের রেকর্ডও প্রতিবেদনের সঙ্গে জমা দেয়া হয়। এভাবে নানা পর্যায়ে সময়ক্ষেপণের কারণে বিরক্ত হয় জাইকা। মে মাসে ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করলে ঋণ ফেরত নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জাইকা। এসব বিষয়ে জানতে বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহফুজ উদ্দিন আহমদকে তাঁর মুঠোফোনে কয়েকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি।