ব্রেকিং নিউজ

ভোর ৫:২৮ ঢাকা, রবিবার  ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

বিচারপতি খাইরুলের বক্তব্যই আওয়ামী লীগের বক্তব্য : বিএনপি

সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আইন কমিশনের আসনে বসে সুপ্রিম কোর্টের রায় ও প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা আদালত অবমাননার শামিল। তার বক্তব্যই আওয়ামী লীগের বক্তব্য বলে মনে করে বিএনপি।

দলটির দাবি, খায়রুল হকের বক্তব্যে মনে হয়েছে, এই রায়ের ফলে তার গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। এই রায়ে মধ্যে কোনো অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যও নেই; বরং সবই প্রাসঙ্গিক। এই রায়ে সুশাসন, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্রের জন্য, মানবাধিকারের জন্য, নিঃসন্দেহে আশার আলো। এতে করে বিচার বিভাগ রক্ষা পেয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে এসব কথা বলা হয়েছে।

এতে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত দুই দিক থেকে বক্তব্য তুলে ধরা হয়।

লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এছাড়া সংবাদিকদের নানা প্রশ্নে উত্তর দেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ,গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন।

এসময় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, অ্যাডভোকেট আহমদ আজম খান কেন্দ্রীয় নেতা আতাউর রহমান ঢালী, হারুন অর রশিদ, অ্যাডভোকেট সানা উল্লাহ মিয়া, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রমুখ।

লিখিত বক্তব্যে মির্জা ফখরুল জানান, ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে বিএনপির বক্তব্য দুই ভাগে বিভক্ত। একটি রাজনৈতিক বক্তব্য, অন্যটি আইনগত দিক থেকে বক্তব্য তুলে ধরা হবে।

তিনি বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বাতিল করেছেন। ৭৯৯ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক, দার্শনিক দিক-নির্দেশনামূলক বা দলিল এই রায়টির মাধ্যমে বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি ম্যাগনাকার্টা বলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে। সত্য উদ্ভাসিত হয়েছে নির্ভিকভাবে।

ফখরুল বলেন, হতাশাগ্রস্ত জাতি এ রায়ের মাধ্যমে আশার আলো দেখতে পেয়েছে। আমরা সেজন্যই এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছি এবং আপিল বিভাগকে অভিনন্দন জানিয়েছি।

তিনি বলেন, অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, সরকার বা সরকারি দল আওয়ামী লীগ কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়ার আগেই সাবেক প্রধান বিচারপতি বর্তমান আইন কমিশন চেয়ারম্যান বিচারপতি খায়রুল হক রায়ের বিরুদ্ধে বিষেদগার করলেন।

তিনি আরও বলেন, মনে হলো-এই রায়ের ফলে তার গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। আইন কমিশনের আসনে বসে সুপ্রিমকোর্টের রায় সম্পর্কে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে তিনি যেসব উক্তি করেছেন তা শুধু অশালীনই নয়, তা রীতিমত আদালত অবমাননার শামিল।

বিচারপতি খায়রুল হক (প্রধান বিচারপতি থাকাকালীন) তার সময় যেসব রায় দিয়েছেন তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তা দেশের মানুষ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।

তিনি বলেন, ৫ম, ৭ম ও ১৩তম সংশোধনী বাতিলের ফলে আজ দেশে যে সাংবিধানিক, রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা দেশের গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ভঙ্গুর করে ফেলেছে।

ফখরুল অভিযোগ করেন, বিচারপতি খায়রুল হকের বক্তব্য আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীদের বক্তব্যের মধ্যে কোনও অমিল নেই, একই সুরে বাঁধা। বিচারপতি খাইরুলের বক্তব্যই আওয়ামী লীগের বক্তব্য।

তিনি বলেন, বিচারপতি হকের রায়ের পরেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অস্থিতিশিলতা এবং হতাশা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার হয়ে উঠেছে লাগামহীন। এ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের ফলস্বরূপ আওয়ামী লীগ বহুদলীয় গণতন্ত্রের দর্শনের মূল উৎপাটন করে প্রায় একদলীয় একনায়কতান্ত্রিক সরকার চাপিয়ে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কোন কার্যকরী পার্লামেন্ট নেই। সরকারের কোন জবাবদিহিতা নেই। তাই সব গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে একদলীয় দুঃশাষণে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। দুর্নীতি আজ সব নজির ছড়িয়ে গেছে। জনগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান সরকারের জনগণের কোন ম্যান্ডেড নেই, পার্লামেন্টও নেই। তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেনি। ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা, বাকি ১৪৭ আসনে প্রকৃত পক্ষে কোনো ভোটারই ভোট দিতে যাননি। সেই পার্লামেন্টে বিচারকদের অভিসংশন, অপসারনের দায়িত্ব পেলে শেষ ভরসার জায়গাটুকু হারিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, বিচারপতি খাইরুল হকের বক্তব্যকে আমরা ধিক্কার জানাই যে, তিনি কৃতকর্মের জন্য কোনও শোচনা তো করেননি বরং একটি অন্যায়ের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

বৃহস্পতিবার ও বুধবার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রায়ের ওপর দেয়া প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, আওয়ামী লীগ এ রায়ের ওপর প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। তারা হতাশ হয়েছেন, সংক্ষুদ্ধ হয়েছেন, তাতো তারা হবেনই।

তিনি বলেন, তাদের সৃষ্ট দানব যে তাদেরকেই গ্রাস করতে চলছে-তা এখনও তারা বুঝতে পারছেন না। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগকে আর একবার ধন্যবাদ জানাই এই জন্য যে, তারা তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।

বিএনপির এ শীর্ষ নেতা বলেন, সীমাহীন দুর্নীতি, দ্রুত দুঃশাসন, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অহংকার আজ স্বাধীনতা যুদ্ধের সব স্বপ্ন ও অর্জনগুলিকে ভেঙ্গে চুরে চুরমার করে দিচ্ছে। এই দুঃসময়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এই রায় সুশাসনের জন্য, ন্যায়বিচারের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, মানবাধিকারের জন্য, নিঃসন্দেহে আশার আলো।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, আইনমন্ত্রী হিসাবে আনিসুল হক যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা তার একেবারেই বলা উচিত হয়নি। কারণ, আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব হলো দেশের আদালতগুলো যে রায় দেয়,সেগুলোকে বাস্তবায়ন করা। তিনি তার সে দায়িত্ব থেকে সরে এসেছেন রাজনৈতিক কারণে।

সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের সমালোচনা করে মওদুদ বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের যে, লজ্জাবোধ নেই। কারণ,গত সংশোধনীতিতে যেদিন রায়টা উনি দিলেন,সেদিন বললেন পরবর্তী দুই টার্ম কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যেতে পারে। জনগণের স্বার্থে এটা করা উচিত বলে রায় ঘোষণার দিন বলেছিলেন। ১৬ মাস পরে ওনি পূর্ণাঙ্গ রায় দিলেন। কিন্তু সেখানে এই কথাগুলো নাই।

তিনি দেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। তিনি যদি এই ধরনের অনৈতিক কাজ করেন। আমি মনে করি খায়রুল হক বিরাট একটা অপরাধ করেছেন। এটা জুডিশিয়াল ক্রাইম- যোগ করেন মওদুদ।

পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায় প্রসঙ্গে এ বিএনপি নেতা নেতা বলেন, খায়রুল এ সংশোধনী বাতিল করলেন-এটার প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো মার্শাল ‘ল’ ফরমান দিয়ে সংবিধান সংশোধন বেআইনি। উনি আমাদের রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে কথা বলাসহ নানা কথা বলেছেন।

তিনি আরও বলেন,খায়রুল হক বলেন,সামরিক ফরমানের মাধ্যমে যা হয়েছে সবই অবৈধ। আবার অন্যদিকে বলছেন প্রয়োজনে অনেকগুলো মার্জনা করেছেন। এই মার্জনার মধ্যে আর্টিকেল ৯৬ ছিলো, এই যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল।

মওদুদ বলেন, উনি পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করলেন কিন্তু সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিল করলেন না কেনো। এই অপরাধের জন্য উনাকে একদিন জনগণের কাঠগোড়ায় দাঁড়াতে হবে। এর জন্য তাকে জবাব দিতে হবে। এটা তার উচিত হয়নি।

খায়রুল হক প্রসঙ্গে মওদুদ আরও বলেন, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান খায়রুল হক একজন সরকারের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা। বিধি অনুযায়ী সরকারের কোনো কর্মকর্তা এই ধরনের সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন না। এটা সম্পূর্ণ আচরণবিধি লংঘন।

তিনি আরও বলেন, খায়রুল হক যে উদ্দেশ্যে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছিল বা পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছিলেন-এই যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রায় দিয়েছিলেন, দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য নয়। দলীয় আনুগত্যের কারনেই এই রায়গুলো দিয়েছিলেন খায়রুল হক।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্নাঙ্গ রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি খায়রুল হক যে বক্তব্য দিয়েছেন তা তিনি দিতে পারেন না। কারণ,একটি সিনেমা হলের মামলাকে কেন্দ্র করে ওনি পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায় দিয়েছেন। সেই খায়রুল হকের মুখে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্নাঙ্গ রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানায় কিনা জনগণের পাশাপাশি আমাদের প্রশ্ন।

এক প্রশ্নের জবাবে মওদুদ বলেন,সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের কারণে আমাদের বিচার বিভাগকে রক্ষা করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যই সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী এনেছিল। যাতে করে বিচার বিভাগ সুষ্ঠু বিচার করতে না পরে।

তিনি বলেন, একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, বলা হচ্ছে এই রায়ে অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা হয়েছে। স্পষ্ট করে বলতে চাই, এই রায়ে অপ্রাসঙ্গিক কোনো বক্তব্য নেই। কারণ,বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। সমাজ, রাজনীতি, সংবিধান,সংসদ, রাষ্ট্র সবকিছু এর সঙ্গে যুক্ত। অতএব রায়ে যা বলা হয়ে প্রত্যেকটি প্রাসঙ্গিক।

তিনি আরও বলেন, সরকারকে বলব, বিচার বিভাগকে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে বিতর্ক তৈরি করবেন না। আপনাদের যদি কোনো বক্তব্য থাকে, তা রিভিউ ফাইন পিটিশন করে তা তারা তুলে ধরতে পারে।