ব্রেকিং নিউজ

রাত ১১:৩১ ঢাকা, মঙ্গলবার  ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ব্যাংকগুলো মানতে পারছেনা!

বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যে প্রতিটি ব্যাংকে পড়ে আছে উদ্বৃত্ত তহবিল। কারো সমস্যা হলে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে হাত বাড়ালেই মিলছে কম রেটে ধার। ব্যাংকগুলোও আর উচ্চহারে আমানত নিচ্ছে না; বরং গত কয়েক বছরের মধ্যে ব্যাংক থেকে সবচেয়ে কম মুনাফা পাচ্ছেন আমানতকারীরা। কিন্তু এর পরেও ব্যবসায়ীদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে উচ্চ সুদ গুনতে হচ্ছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঋণ আমানতের সুদের ব্যাপ্তি (স্প্রেড) ৫ শতাংশের নিচে নামছে না। ২০টি ব্যাংকের স্প্রেড এখনো ৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বয়ং ব্যাংকারদের মুরব্বি বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তিনি বলেছেন, সেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার কম তাদের স্প্রেড কেন এতটা বেশি? গত সোমবার ব্যাংকের এমডিদের সাথে বৈঠকে তিনি এ প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি স্প্রেড ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশের পাশাপাশি এমডিদের অতি মুনাফার প্রবণতা রোধ করারও নির্দেশ দেন তিনি।

আমানতের সুদের হার কমলেও ঋণের সুদের হার কাক্সিক্ষত হারে কমছে না কেন এ প্রশ্ন সাধারণের মধ্যেও। তবে ব্যাংকারদের সাফ কথা, যে পর্যন্ত ঋণের সুদের হার নামিয়ে আনা হয়েছে, এর নিচে নামা সম্ভব নয়। কেন সম্ভব নয় এমন এক প্রশ্নের জবাবে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল বুধবার জানিয়েছেন, ব্যাংকের নানা ধরনের ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু নানা ধরনের আয় সঙ্কোচিত হয়ে গেছে। উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি শাখার এক হাজার গ্রাহকের হিসাব পরিচালনার জন্য লোকবল নিয়োগ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ভবন ভাড়া করা হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ব্যবসায়িক মন্দার ধারাবাহিকতায় এখন বিনিয়োগ অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে শাখা থেকে ঋণ দেয়ার মতো গ্রাহক নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেকটাই অলস সময় কাটাচ্ছেন। ফলে বিনিয়োগ থেকে আয় কমে গেছে। কিন্তু লোকবল ও ভবনের জায়গা কমানো সম্ভব হচ্ছে না। কেননা দেশে আবার বিনিয়োগ পরিস্থিতি চাঙ্গা হলে ওই সময় দক্ষ লোকবলের সঙ্কট দেখা দেবে। এ কারণে ব্যাংকের আয় কমলেও ইচ্ছে করলেই ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। আর এ ব্যয় নির্বাহ করার জন্যই ঋণের সুদহার কাক্সিক্ষত হারে কমানো যাচ্ছে না।

এ দিকে সরকারকে অনেকটা কম সুদে ঋণের জোগান দিতে হচ্ছে। ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করতে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সরকারকে ১০০ টাকা ঋণ দিয়ে তার চেয়ে কম অর্থ পাওয়া যাচ্ছে। এখানেও সরকারের ঋণের জোগান দিতে গিয়ে ব্যাংকের নিট লোকসান হচ্ছে। এ লোকসান সমন্বয় করতেই বিনিয়োগের সুদের হার ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কমানো যাচ্ছে না।

পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পরিবহন ভাড়াসহ নানা সেবা বিল বেড়ে গেছে। এসব বিলও বর্ধিত হারে ব্যাংককে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ দিকে ব্যাংকের আয় থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সিএসআর (সামাজিক সেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ) করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকের বার্ষিক মানদণ্ড নির্ণয়ের উপকরণের মধ্যে সিএসআর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনাও ব্যাংকগুলোকে পরিপালন করতে হচ্ছে।

এসবের বাইরে রয়েছে খেলাপি ঋণ। দেশের চলমান বিনিয়োগ মন্দার মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। এর ফলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমান সোমবারের বৈঠকে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। এ জন্য ঋণ নবায়ন, ঋণ অবলোপন, প্রয়োজনীয় কিছুটা সুদ মওকুফ করে আদায় বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের ব্যয় বেড়ে চলছে। কেননা খেলাপি ঋণের বিপরীতে শ্রেণীভেদে ২৫ শতাংশ থেকে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর এ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় ব্যাংকের আয় থেকে অর্থ এনে। অপর দিকে কু ঋণ বা মন্দ ঋণ বেড়ে গেলে ওই ঋণের বিপরীতে অর্জিত সুদ আয় খাতে নেয়া যায় না। এটা স্থগিত করে রাখতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে আট হাজার ১৭৫ কোটি টাকার সুদ আয় স্থগিত করে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সমপরিমাণ আমানতের বিপরীতে আমানতকারীদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সুদেআসলে ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর ফলে নতুন আমানত নিয়ে মেয়াদ শেষে গ্রাহকদের দায় পরিশোধ করতে হয়। এতে ব্যাংকের বিনিয়োগ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সবমিলে কাক্সিক্ষত হারে ঋণের সুদের হার কমানো যাচ্ছে না।

এ দিকে ঋণের সুদের হার না কমায় ব্যবসায়ীদের ব্যয় আরো বেড়ে যাচ্ছে। এমনিতেই ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দা, এর ওপর সুদজনিত ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিল্পের উৎপাদিত পণ্যমূল্য কমছে না। এতে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যমূল্য প্রতিযোগিতায় বিদেশী পণ্যের কাছে হেরে যাচ্ছে। ফলে বিনিয়োগ আরো সঙ্কোচিত হয়ে যাচ্ছে।