Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

দুপুর ১:৫৭ ঢাকা, বৃহস্পতিবার  ১৫ই নভেম্বর ২০১৮ ইং

প্রবাসীদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বিশেষ করে বিদেশে মিশনে কর্মকর্তাদের দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরা এবং প্রবাসীদের প্রতি সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে বিদেশে দেশের বিরুদ্ধে দুষ্টচক্রের অপপ্রচারের ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ব্যবসা বৃদ্ধি, বাণিজ্যের নতুন সুযোগ খুঁজে বের করা এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্টের পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের প্রয়াস চালানোর আহ্বান জানান।
তিনি কাজের গতিশীলতার লক্ষ্যে প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য তাঁর মন্ত্রণালয়সমূহ পরিদর্শন কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে আসেন।
শেখ হাসিনা বলেন, কূটনীতি হচ্ছে টিম ওয়ার্ক। তা কেবল অন্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেই আবদ্ধ নয়। বরং এ দায়িত্ব ব্যবসা-বাণিজ্যের খাতে সম্পর্কের উন্নয়ন এবং দেশের রফতানি ও অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ পর্যন্ত সম্প্রসারিত।
৮০ থেকে ৯০ লাখ বাংলাদেশী, যাদের পাঠানো রেমিটেন্সে দেশের অর্থনীতি সতেজ হচ্ছে, তাদের অবদান মনে রাখতে কূটনীতিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অবহেলিত হওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, কূটনীতিকদের প্রবাসীদের সমস্যার কথা ধৈর্যসহকারে শুনতে হবে এবং তার সমাধান করতে হবে। প্রবাসীদের সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশী অধ্যূষিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বক্তৃতা করেন। এসময় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
যথাযথ অভিবাসন কাগজ-পত্রের অভাবে প্রবাসীরা যেন কোনরকম সমস্যায় না পড়েন এ জন্য মেশিন রিডএ্যাবল পাসপোর্ট (এমআরপি) প্রক্রিয়া দ্রুত করতে কর্মকর্তাদের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, পাসপোর্টধারীদের যাচাইয়ের সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সহায়তার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টিম পাঠানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার জনশক্তি রফতানির জন্য স্বচ্ছ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পদক্ষেপ নিয়েছে। স্মার্ট কার্ড চালু করা হয়েছে। যা একজন ব্যক্তি সম্পর্কে সব তথ্যের যোগান দেবে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে কেউ যেন বিদেশে যেতে না পারে সে পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। এখন প্রবাসীদের প্রয়োজন দূতাবাসে কর্মরতদের পক্ষ থেকে ভাল ব্যবহার।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একদল চক্রান্তকারী দেশের ইতিবাচক বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোকে এইসব অসৎ উদ্দেশ্যগুলোর বিরুদ্ধে অবশ্যই আরো সক্রিয় থাকতে হবে।
কিছু সংবাদপত্রে ছবি ছাপা হচ্ছে এতে দেশের বাস্তব ছবি উঠে আসছে না। তিনি অরো বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার দেশে আধুনিক প্রযুক্তি এনেছে, এখন এই প্রযুক্তি আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিটা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত কালো মেঘ হিসেবে এসেছে, বাংলাদেশের মানুষ এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। বাংলাদেশ নিশ্চয় বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসবে এবং অগ্রসর হবে, তিনি আরো বলেন, কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখা উচিত এবং দেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগিয়ে যাবে।
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি ২০০৯ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে চায়নি, ২০১৪ সালে তারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছে। তারা নিরপরাধ মানুষদের জীবিত পুড়িয়ে নির্বাচন নস্যাৎ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা তা হতে দিতে পারি না।
তিনি বলেন, প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রতিকূল অবস্থায় তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা অনেক উন্নত দেশেও অস্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই নির্বাচনকে মেনে নিয়েছে এবং গত এক বছর দেশের মানুষ শান্তিতে বসবাস করেছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দেশের সব এলাকার উন্নয়ন করা হচ্ছে, এমন সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন কোনো কারণ ছাড়াই ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগের মত একই পরিস্থিতি তৈরি করে নিরপরাধ মানুষের উপর চড়াও হয়েছেন।
গত এক বছর ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের জয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি এসোসিয়েশন (সিপিএ) এবং আন্তঃ-পার্লামেন্টারি ইউনিয়েনের (আইপিইউ) এর নির্বাচনে ও একই সময়ে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশের নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভূতপূর্ব সমর্থন করেছে।
তিনি বলেন,“এটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য।”
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের জন্য প্রতিটি দেশে নিজস্ব ভবন হবে। দেশের অর্থনীতি আগের তুলনায় এখন ভালো, বিশাল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং খাদ্য মজুদ আছে, তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কোন সঙ্কট হবে না, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুও উদ্যোগ নিয়েছিলেন যে প্রতিটি দেশেই কূটনৈতিক মিশন থাকবে নিজস্ব জমির উপর। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার এ প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করে এবং ওয়াশিংটন, নয়া দিল্লি ও অস্ট্রেলিয়ায় ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে।
কিন্তু, পরবর্তীতে বিএনপি-জামায়াত সরকারের কূটনৈতিক সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে অস্ট্রেলিয়ায় কূটনৈতিক মিশনের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ করতে পারেনি এবং এর ফলে বাংলাদেশ তাদের জমি হারিয়েছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশ নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের মিশন জন্য নিজস্ব ফ্ল্যাট ক্রয় করেছে বলে প্রধানমন্ত্রী বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ২৪ বছরের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা এখন স্বাধী জাতি এবং স্বাধী জাতি হিসেবে আমরা মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চাই। আমাদের সকল কার্যক্রম এই লক্ষ্য অর্জনে পরিচালিত হবে।
স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালি কূটনীতিকদের অবদানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এ সময়ে কূটনীতিকরা যে ভূমিকা রেখেছেন তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রবাসী সরকার গঠনের অতি অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক কূটনীতিক বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন।
দেশের স্বাধীনতার জন্য আন্তর্জাতিক মতামত তৈরিতে তারা কাজ করেছেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ জোরদারে ও লাখ লাখ উদ্বাস্তুকে সহায়তা দিতে তারা কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সেতুবন্ধন হতে পারে। এই মানসিকতা ধারণ করেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেন- ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কাউকে হেয় করা নয়।’ তিনি ঘোষণা দেন বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড।
আমাদের সরকার বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করছে। বাংলাদেশ সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলছে এবং আমরা যে কোন দেশের সঙ্গে যে কোন সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারি এবং আমরা অতীতে প্রমাণ করেছি উল্লেখ করে এ ক্ষেত্রে তিনি ১৯৯৮ সালে ভারত ও পাকিস্তানের পরমাণু বোমা পরীক্ষার পর এ অঞ্চলে উত্তেজনা কমাতে তাঁর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, উদার পররাষ্ট্রনীতির কারণে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ১৫৪টির বেশি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং বাংলাদেশ এ সময়ে জাতিসংঘ, ওআইসি, এনএএম’র সদস্য নির্বাচিত হয়্ এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে তাঁর প্রথম ভাষণ বাংলায় দিয়েছেন, আমরা তাঁর অনুসৃত পথ অনুসরণ করছি এবং বাংলাদেশকে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
শেখ হাসিনা বরেন, ১৯৭৫ পরবর্তী সময় বাংলাদেশে ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়। এ সময় সামরিক স্বৈরাচার অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করায় এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে কূটনৈতিক পদে নিয়োগ দেয়ায় দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়।
খুনিদের কয়েকজনকে বিদেশে নিয়োগ দেয়া হলে পোল্যান্ডসহ অনেক বন্ধুপ্রতীম দেশ তাদের নিয়োগ গ্রহণ করেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের কূটনৈতিক মিশনে নিয়োগ প্রদান ছিল দেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বের কূটনৈতিক নীতি গ্রহণের ফলে ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র সীমানা সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার ফরেন সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সমস্যাসমূহ সম্পর্কে অত্যন্ত সজাগ রয়েছে। প্রশাসনের প্রত্যেক ক্যাডারের সমস্যা সমাধানে আওয়ামী লীগ সরকার সব সময় আন্তরিক।
তিনি বলেন, দেশ যদি উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়, তাহলে সকলেই এর সুবিধা ভোগ করবে।