ব্রেকিং নিউজ

রাত ৩:৪৮ ঢাকা, শুক্রবার  ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

‘প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক এবং বৃদ্ধদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেয়ার উদ্যোগ’

সরকার সকল প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক এবং বৃদ্ধদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনতে জীবনচক্রভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২৫তম আন্তর্জাতিক ও ১৮তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভাষণে একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাইকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনতে জীবনচক্রভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে।’

অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের দক্ষতা ও সক্ষমতার নিরীখে তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনমান উন্নয়নে তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রত্যেক প্রতিবন্ধি এবং অটিস্টিক ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক, চিকিৎসা এবং শিক্ষা সহায়তা প্রদান করা হবে। প্রতিটি স্কুলে প্রতিবন্ধি শিশুদের শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে আর দশটা স্বাভাবিক শিশুর সঙ্গে মিশে তারা শিক্ষা লাভ করে সমাজের মূল ধারায় সম্পৃক্ত হতে পারে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাস্তা-ঘাট, ফুটপাত এবং নতুন অবকাঠামো যেথানেই হচ্ছে সেখানে প্রতিবন্ধীদের সহজে চলাচলের জন্য পৃথক লেন এমনকি টয়লেট তৈরি করারও নির্দেশও আমাদের দেয়া আছে এবং সেভাবেই আমরা তা করে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রে বিত্তবানসহ সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে বলেন, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য পথ প্রশস্থ করতে কর্পোরেট সেক্টর এবং সমাজের বিত্তবান মানুষসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে এগিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদায়ি স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. মেজাম্মেল হোসেন বক্তৃতা করেন।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুজ্জামান আহমেদের সভাপতিত্বে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের সভাপতি রজব আলী খান নজিব এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব জিল্লার রহমানও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধি জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনটি ক্যাটাগরিতে ৯ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মাঝে ক্রেস্ট ও সনদপত্র বিতরণ করেন।

অনুষ্ঠানস্থল থেকে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের সঙ্গে কথা বলে মিরপুর-১৪ নং সেকশনে ৮ দিনব্যাপী প্রতিবন্ধীদের অংশ গ্রহণে আয়োজিত ‘প্রতিবন্ধি উত্তরণ মেলা’ উদ্বোধন করেন।

পঁচাত্তরে পরিবারের সবাইকে ও সবকিছু হারানোর পরও দেশে ফিরে নিজেদের সম্পদ জনগণের বিশেষ করে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে ব্যয় করেছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেনে, ‘প্রতিবন্ধীসহ অনগ্রসর-অবহেলিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছি’।

তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীসহ অনগ্রসর-অবহেলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণের কথা সংবিধানেই রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধানে জাতিরজনক শুধু সংবিধানেই এর সংযোজন ঘটাননি, প্রতিবন্ধীদের ভাগ্যের উন্নয়নের সকল পদক্ষেপ নেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক বিত্তবানই আছেন যারা টাকা খরচের আর জায়গা পান না। আবার অনেকের ছেলে-মেয়ে রয়েছে যারা জীবনে চাওয়ার কিছুই না পেয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের পথে চলে যায়। কাজেই সেই বিত্তবানদেরও আমি বলব তারা যদি এই ধরনের প্রতিবন্ধীদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন তাহলে সমাজ এতে উপকৃত হবে। নিজেরাও উপকার পাবেন এবং আল্লাহর দোয়াও পাবেন সবাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহিত নানামুখি পদক্ষেপের ফলে আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছি। এমডিজি বাস্তবায়ন করেছি এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছি। কাজেই বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব। আর সেই সাথে এই প্রতিবন্ধিতার বিষয়টাকে আমরা অতন্ত গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রতিবন্ধীরা আমাদের আপনজন, আমাদেরই সন্তান। কাজেই তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেয়া , সমাজে তাদের একটা সন্মানজনক অবস্থান সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে আরো সুন্দরভাবে বাঁচার সুযোগ করে দেয়া-এটাই আমাদের কর্তব্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেকের অন্তত এটুকু চিন্তা করা উচিৎ- প্রতিবন্ধী তো কেউ ইচ্ছে করে হয়নি। কাজেই তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে, আন্তরিক হতে হবে, তাদেরকে সহযোগিতা করতে হবে।’

বিশ্বের অনেক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী, সঙ্গীতজ্ঞ, কবি ও লেখক প্রতিবন্ধিতার শিকার মণীষীদের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী অন্য সবার মত প্রতিবন্ধীদেরও মেধা বিকাশের সুযোগ করে দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা অটিস্টিক বা প্রতিবন্ধী আছেন, তাদের ভেতরেও এরকম সুপ্ত মেধা থাকতে পারে, যেটা বিকশিত হবার সুযোগ আমাদের করে দিতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রতিবন্ধীরা ক্রিকেট খেলা থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে অবদান রাখছে। তারা বিদেশ থেকে স্বর্ণপদকও লাভ করেছে। স্পেশাল অলিম্পিকে ২১ টি স্বর্ণ পদকসহ প্রায় ৭৬টি পদক নিয়ে এসেছিল প্রতিবন্ধিরা।

’৯৬ সালে সরকারের থাকার সময় এই প্রতিবন্ধীদের বিশেষ অলিম্পিকে যাবার সুযোগ করে দেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁরা এখনও বিভিন্ন ক্রীড়া ক্ষেত্র থেকে দেশের জন্য সন্মান বয়ে আনছে।

তাদের খেলাধূলার বিকাশের জন্য তাঁর সরকার ইতোমধ্যেই কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার অদূরে ১২ একর জমিতে ৩শ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকার প্রতিবন্ধি ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া সংসদ ভবনের পাশেই প্রতিবন্ধীদের অনুশীলনের জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলেও জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সংসদ ভবনের পাশের উক্ত অনুশীলনের জন্য বরাদ্দ করা জায়গাটি এক সময় এটা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদেরই জায়গা ছিল। যেটি এক ভূমি খেকো ব্যক্তি একটি জাল দলিল করে সম্পত্তিটা আত্মস্যাৎ করার চেষ্টা করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখন এই জমিটি আত্মস্যাতের প্রচেষ্টা হয় তখন তিনি এই জমিটি দেখেই বলেন আমি এই জায়গাটা চিনি। এখানে একটি প্রতিবন্ধীদের স্কুল ছিল । ধানমন্ডি ৩২ এর বাড়িতে থাকার সময় তিনি তাঁর বাবা-মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে সেখানে যেতেন এবং তাঁদের সঙ্গে মিশতেন।

‘কাজেই এই জায়গাটা আমার খুব চেনা। আর তখনই এই জায়গাটা সংসদ ভবনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছিল। …সেই জায়গাটিকে আমরা প্রতিবন্ধিদের খেলাধূলার অনুশীলনের জায়গা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি’, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিবন্ধীদের জন্য আইন ও বিধিমালা প্রণয়নসহ তাদের অধিকার আদায়ে সহায়তা করছে সরকার। এমনকি শিক্ষা নীতিমালাতেও প্রতিবন্ধীদের অধিকারের বিষয়টি উঠে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক জরিপ অনুসারে বর্তমান দেশে প্রায় ১৫ লাখ প্রতিবন্ধি ব্যক্তি রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা একটা নেটওয়ার্ক করতে চাই সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিবন্ধিদের ভাতার ব্যবস্থা, চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং শিক্ষার সুযোগ প্রদান করা হবে।

তাঁর সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক নিরাপত্তা খাত ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারণ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সাড়ে ৭ লাখ অসচ্ছল প্রতিবন্ধিকে মাথাপিছু মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫ শ ৪০ কোটি টাকা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার বিসিএসসহ প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ১ শতাংশ এবং ৩য় ও ৪র্থ শ্রেনীর চাকরীতে ১০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করছে।

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিবন্ধি ব্যক্তিদের থেরাপি, সহায়ক উপকরণ, শ্রবণ পরীক্ষা, কাউন্সেলিং ও রেফারেলসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশের অটিজম আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ায় তাঁর কন্যার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিশিয়েটিভ ইন বাংলাদেশের জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপার্সন সায়মা হোসেন পুতুলের পরামর্শ ও দিক নির্দেশনায় বর্তমান সরকার দেশে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ও অসামর্থবানদের পুনর্বাসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন- প্রতিবন্ধীদের চিহ্নিতকরন (ডাটা বেজ তৈরি করা), তাদের কাউন্সিলিং প্রদান, তাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করাসহ অন্যান্য বিষেশায়িত পদক্ষেপ রয়েছে।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পদত্ত ‘এক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ’ এবং প্রতিবন্ধি জনগোষ্ঠীর ডিজিটাল এমপাওয়ারমেন্টের জন্য আমির জাবের আল আহমাদ আল জাবের আল সাবাহ পুরস্কারে ভূষিত হওয়ায় সায়মা ওয়াজেদ হোসেনকে অভিননন্দন জানান।
শেখ হাসিনা ‘প্রতিবন্ধি উত্তরণ মেলা’র উদ্বোধনকালে প্রতিবন্ধিদের উৎপাদিত পণ্য ব্যবহারে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, যেকোনো উৎসবে আমি প্রতিবন্ধিদের তৈরি কার্ড ব্যবহার করি। এসব কার্ড এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধিদের আঁকা ছবি নিয়ে সায়মা ওয়াজেদ হোসেন একটি অ্যালবাম তৈরী করছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সামগ্রিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশকে আমরা আরো এগিয়ে নেব। সেই সাথে প্রতিবন্ধীদের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেব।’