ব্রেকিং নিউজ

রাত ৯:৩২ ঢাকা, বুধবার  ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

‘প্রকল্পের পাই পাই পয়সা যেন মানুষের কাজে লাগে’- প্রধানমন্ত্রী

দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার সারাদেশে মেয়েদের জন্য ৪টি সহ আরো ২৫টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য প্রত্যেক উপজেলায় একটি কারিগরি স্কুল স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি উপজেলায় ১টি করে টেকনিক্যাল স্কুল স্থাপনের মাধ্যমে বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ বৃত্তি প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি সরকার সকল বিদ্যালয় এবং কলেজে ‘ভোকেশনাল ট্রেনিং কোর্স’ অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আইডিইবি’র ২১তম জাতীয় কনভেনশন ও ৩৯তম কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)’র প্রতিষ্ঠাতা একেএমএ হামিদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। সম্মেলনের স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো.শামসুর রহমান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্ট নিহত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য, জেল হত্যার শিকার জাতীয় চার নেতা এবং প্রয়াত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

এরপরেই প্রধানমন্ত্রী আইডিইবি’র অ্যালবামে স্বাক্ষরের মাধ্যমে আইডিইবি’র ২১তম জাতীয় কনভেনশন ও ৩৯তম কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে সরকারি পয়সার অহেতুক অপচয় রোধ করে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ এবং অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তা সম্পন্ন করার জন্যও প্রকৌশলীদের প্রতি আহবান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের সত্যিকারের উন্নয়ন করতে চাই। এর পাই পাই পয়সা যেন মানুষের কাজে লাগে। অকাজে অহেতুক অর্থের ব্যবহার যেন না হয়।

তিনি বলেন, যে কাজগুলো আমরা করছি, তা যেন খুব দ্রুতই সম্পন্ন হয়। প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, ’৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তাঁর সরকারের গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনাসমূহ পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে সেই কাজগুলো পুনরায় সম্পন্ন করতে হয়। তাই সরকার প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী গোপালগঞ্জে তাঁর গ্রামের বাড়ির একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র প্রকৌশলীদের সামনে তুলে ধরেন।

তিনি প্রকল্প গ্রহণে প্রকৌশলীদের সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, কোন প্রকল্প গ্রহনকালে সেটির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, তাঁর সরকার অনেক কাজ করছে। উন্নয়ন বাজেট ৫ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এত বিশাল বাজেট অতীতে কোন সরকার করতে পারেনি যেটা আওয়ামী লীগ সরকার করতে পেরেছে।

২০১৪ সালের মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরও প্রায় আড়াই বছর সময় অতিক্রান্ত হওয়ার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের হাতে সময় আছে দুই বছর। কারণ ৬ মাস নির্বাচণের প্রস্তুতিতেই চলে যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজেই এই সময়ে আমরা গৃহীত প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে চাই। অন্ততপক্ষে যে প্রকল্পগুলো এই সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা সেগুলো অন্তত শেষ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে আন্তরিক হবার জন্য প্রকৌশলীদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে ভবিষ্যতে আর কেউ যেন কোন খেলা খেলতে না পারে সেটা আপনারা দেখবেন।

সরকারি কর্মচারিদের বেতন বৃদ্ধি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দাবি জানানোর আগেই সরকার বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছে। পদ মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। সবদিকে আমরা সুযোগ করে দিয়েছি যাতে আমাদের প্রকল্পগুলো সুন্দরভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। যাতে আমরা আরো নতুন নতুন প্রকল্প নিতে পারি, কাজ করতে পারি।

তিনি বলেন, বেতন-বৈষম্য দূরীকরণের জন্য পলিটেকনিক শিক্ষকদের স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অন্য সব সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দু’টি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের জনসংখ্যা অনেক বেশি বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু আমি মনে করি, এ বিশাল জনগোষ্ঠী আমাদের সম্পদ, যা পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই নেই। এ সম্পদকে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে সরকার কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষারে প্রসার ও এর উন্নয়নে সরকারের নানা উদ্যোগ এবং পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকার গঠনের সময়কার বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, আমরা যখন সরকার গঠন করি তখন বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা থাকা সত্বেও মন্দার ধাক্কা আমরা দেশের মানুষের গায়ে লাগতে দেইনি।

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে যাচ্ছি। আমাদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবৃদ্ধি হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৭ শতাংশের ওপরে। তথাপি মূল্যস্ফীতি কমিয়ে রাখতে পেরেছি। যার সুফল দেশের সাধারণ মানুষ পাচ্ছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে।

প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে ছিন্নমূল মেহনতি মানুষের জীবন-যাত্রার মান উন্নয়নের উদাহারণ টেনে বলেন, ‘এখন আল্লাহর রহমতে মানুষের পায়ে যেমন পরার জুতো, গায়ে তেমনি পোষাক রয়েছে, অতীতে যা ছিলনা।’

তিনি বলেন, কুঁড়ে ঘর বাংলাদেশে থাকবেনা এই ঘোষণা দিয়েছিলাম। এখন আর কুঁড়ে ঘর দেখা যায় না।

তিনি বলেন, সরকারের পরিসংখ্যান মোতাবেক সারাদেশের ২ লাখ ৮০ হাজার গৃহহীন মানুষকে আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেককে বিনা পয়সায় ঘর-বাড়ি নির্মান করে দেয়ার প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, এই দেশ জাতির পিতা স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। এই দেশের প্রতিটি মানুষ অন্তত দুবেলা পেট ভরে খেতে পাবে। রোগে চিকিৎসা পাবে, শিক্ষা পাবে মাথা গোঁজার ঠাই পাবে। তাঁর সরকার সে লক্ষ্য বাস্তবায়নেই কাজ করে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি সারাদেশে ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা মানুষের দোড় গোঁড়ায় নিয়ে যাবার সরকারি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে বর্তমান সরকারের সারাদেশে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, মাল্টিমিডিঢা ক্লাশ রুম চালু, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাষ্ট ফান্ড করে নিন্ম মাধ্যমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত মেধা বৃত্তি চালুর বিষয় উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে তাঁর সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বলেন, সারাদেশে রাস্তা-ঘাট, পুল, কালভার্ট, ব্রীজ আমরা করে দিচ্ছি। আমাদের ভৌগলিক অবস্থানটা বিবেচনা যতটুকু আমাদের প্রয়োজন ততটুকুই আমরা করবো। রাস্তা করার পাশাপাশি সেটা রক্ষাণাবেক্ষণ করার খরচ আছে। কাজেই যত কম খরচে বেশি মানুষের যাতায়াত করার ব্যবস্থা করা যায়, সে চেষ্টা করতে হবে।

রেল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রেল অত্যন্ত অবহেলিত ছিল। সেই রেলের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় করে সমগ্র বাংলাদেশকে রেল নেটওয়ার্কে আনার জন্য তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

দক্ষিণ বাংলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই দক্ষিণ বাংলা ও এক সময় অবহেলিত ছিল। সেই দক্ষিণ বাংলায় আমরা পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর করতে যাচ্ছি। সেখানে রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ বানিয়ে, নদী খননের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা বাড়িয়ে সরকার ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সড়ক পথ, রেল পথ, নৌ পথ, আকাশ পথ উন্নয়নে তাঁর সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, এখন সরকার ৬টি নতুন আধুনিক বিমান যুক্ত করেছে। আরো প্লেন আসছে। সবদিক থেকেই আমরা একটা উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়েছি।

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও ৭ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন এত সহজ ছিলনা বলেও উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী প্রকৌশলীদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই উন্নয়নের অংশীদার আপনারাও।

তিনি বলেন, দ্রুত প্রকল্প করেছি, আপনারা দ্রুততার সঙ্গে কাজ করেছেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প দ্রুত সম্পন্নের জন্য পুনরায় তাগিদ দিয়ে বলেন, এখন আপনারা আর একটু দ্রুততার সঙ্গে কাজ করুন, যাতে দেশটাকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি দৃঢ় আশা ব্যক্ত করেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবো। সকলকে সঙ্গে নিয়েই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবো।

আইডিইবি মেডেল-২০১৬ এর জন্য মনোনীত প্রকৌশলীরা হলেন- প্রকৌশলী ওয়াহিদুননবী (মরণোত্তর), প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল গোফরান এবং প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ।