ব্রেকিং নিউজ

রাত ৯:২২ ঢাকা, শুক্রবার  ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

২২ নম্বর পুরানা পল্টনের হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনের দশম তলায় পুঁজিবাজার ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’

পুঁজিবাজার সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’

পুঁজিবাজার সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে দেশে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’। ১৯৯২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শেয়ার কারসাজি ও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের কারণে বিএসইসির দায়ের করা সকল মামলাগুলো এ বিশেষ ট্রাইব্যুনালের আওতায় নিষ্পত্তি হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মোট ৫৩৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি নিয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করেছে। বাকি মামলাগুলো ধাপে ধাপে ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হবে। তবে এগুলোর মধ্যে ২৫০টির বেশি সার্টিফেকেট মামলার বিচার প্রচলিত আদালতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় পুঁজিবাজার সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের পরামর্শে বিশেষ জজ হুমায়ুন কবিরকে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। আর গত ১৬ মার্চ বিচারক হুমায়ুন কবির কাজে যোগদান করেন। ২২ নম্বর পুরানা পল্টনের হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনের দশম তলায় পুঁজিবাজার ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’-এর কার্যক্রম চলছে।
এ দিকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম চালু হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রকৃত আসামী বা রাঘব বোয়ালদের সত্যিকার অর্থে বিচার করা হলে এ বিশেষ ট্রাইব্যুনালের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা আসবে। তবে আসামীপক্ষ শক্তিশালী বলে ছাড় দেওয়া হলে ট্রাইব্যুনাল গঠন ও বিচারিক কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

গত ২১ জুন পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেন বিচারক হুমায়ুন কবির (বিশেষ জজ)। প্রথম দিনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষে ২০১০ সালে দায়ের করা মামলার (পুরনো মামলা নম্বর ৭২০৭/২০১০, নতুন মামলা নম্বর ১৭/২০১৫) বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বিবাদীপক্ষের আসামী ছিলেন মাহাবুব সারোয়ার। আর বাদীপক্ষে সাক্ষ্য দেন বিএসইসির পরিচালক (আইন) মাহবুবুর রহমান চৌধুরী। এ সময় বিবাদীপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষীকে জেরা করেন।

মাহাবুব সারোয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে— সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মাহাবুব সারোয়ার শেয়ারবাজার সংক্রান্ত মিথ্যা ও প্রতারণামূলক তথ্য প্রচার করেন। ওই তথ্যগুলো ছিল পুরোপুরি বিভ্রান্তকর। এ জন্য ওই সময় অসংখ্য বিনিয়োগকারী প্রতারিত হয়েছিলেন। বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করে ফায়দা হাসিলের জন্য তিনি এ ধরনের কাজ করেছিলেন বলে মনে করে বিএসইসি।

এ মামলার ওপর ২১ ও ২২ জুন বিএসইসির পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলা হয়, ১৯৯৯ সালে মাহাবুব সারোয়ার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন শেয়ারের মিথ্যা ও প্রতারণামূলক তথ্য প্রচার করেছিলেন। ওই তথ্যগুলো ছিল পুরোপুরি বিভ্রান্তকর। এ জন্য ওই সময় অসংখ্য বিনিয়োগকারী প্রতারিত হয়েছিলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওই সময় বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করে ফায়দা হাসিলের জন্য তিনি এ ধরনের কাজ করেছিলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে বিএসইসি মাহাবুব সারোয়ারের বিরুদ্ধে মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলা দায়ের করে।

এ দিকে বিবাদীপক্ষের আইনজীবীর পক্ষে মাহাবুব সারোয়ারকে নির্দোষ বলে দাবি করা হয়।

এ বিষয়ে বিএসইসির পক্ষের আইনজীবী হাসিবুর রহমান বলেন, ‘আসামীর বিরুদ্ধে যাবতীয় অভিযোগ বিচারকের সামনে তুলে ধরা হয়। বিচারক বিএসইসি পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। আসামীপক্ষের জেরা শোনেন। এ সব বিবেচনা করে বিচারক বাদী ও বিবাদীপক্ষকে হাজির হওয়ার জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।’

এ দিকে ২২ জুন আরও দু’টি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের কথা ছিল। তবে বাদীপক্ষ উপস্থিত থাকলেও বিবাদীপক্ষের কেউ উপস্থিত না থাকায় ওই মামলা দু’টির বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি। মামলা দু’টি মধ্যে একটিতে আসামী হলেন (পুরনো মামলা নম্বর- ৭২৯/২০১২, নতুন মামলা নম্বর- ৪/২০১৫) আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ও মো. মোবিন মোল্লা। অন্যটিতে (পুরনো মামলা নম্বর- ৩৫৮৯/১৯৯৯, নতুন মামলা নম্বর- ৪/২০১৫) আসামী রয়েছেন— এ রউফ চৌধুরী, মশিউর রহমান, সাঈদ এইচ চৌধুরী ও আনু জায়গিরদার।

এ ছাড়া অন্যান্য ১৪টি মামলা ও বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হল— ৩৫৯৭/১৯৯৯ নম্বর মামলাটির চার্জ শুনানী, ২৫৫৪/২০১৭ মামলাটি পরবর্তী বিচার, ১৬৩০/২০১২ মামলাটি বিচারাধীন, ১৪০/২০১৫ মামলাটি তদন্তাধীন, ৩৯৮৮/২০১২ মামলাটি বিচারাধীন। এ ছাড়া ৫৬১/১৯৯২, ৫৫৪/১৯৯৯, ৫৫৫/১৯৯৯, ৫৫৬/১৯৯৯, ৫৫৯/১৯৯৯, ৫৬০/১৯৯৯, ৩৫৯৬/১৯৯৯, ৩৫৯৯/১৯৯৯ ও ৩৬০০/১৯৯৯-এ ৯টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে।

বিএসইসির ৫৩৫টি মামলার মধ্যে ২৫৩টি মামলা সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগসহ বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে আছে ১৭টি, হাইকোর্ট বিভাগে ২২১টি, স্পেশাল জজকোর্ট এবং পরিবেশ আপিল আদালত ঢাকায় একটি, তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা জজ কোর্টে ছয়টি, মহানগর দায়রা জজ কোর্টে নয়টি, মহানগর দায়রা জজ প্রথম অতিরিক্ত কোর্টে তিনটি, মহানগর দায়রা জজ দ্বিতীয় অতিরিক্ত কোর্টে দুটি, মহানগর দায়রা জজ পঞ্চম অতিরিক্ত কোর্টে দুটি, মহানগর সহকারী দায়রা জজ প্রথম অতিরিক্ত কোর্টে একটি, চতুর্থ যুগ্ম জেলা জজ কোর্টে একটি, পঞ্চম যুগ্ম জেলা জজ কোর্টে নয়টি, চতুর্থ সহকারী জজ কোর্টে একটি, নবাবগঞ্জ সহকারী জজ কোর্টে একটি, মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ছয়টি, শ্রম আদালতে (লেবার কোর্ট) দুটি, জেনারেল সার্টিফিকেট কোর্টে ২৫৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

এদিকে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল চালুর বিষয়ে অভিজ্ঞজন বলছেন, ‘এ পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের দাবি। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বাজারের জন্য ইতিবাচক হবে। যারা সৎ তাদের এ ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে কোনো ভীতি থাকবে না। আর যারা অসৎ তারা অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে। কারণ, ধরা পড়লে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার হবে। আর পুঁজিবাজার নিয়ে দীর্ঘদিনের যে মামলার জট রয়েছে তা স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’ যেকোনো দেশের পুঁজিবাজারের জন্য এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল থাকা প্রয়োজন। আমাদের দেশে এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল গঠনের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পুঁজিবাজারকে ঘিরে আস্থা সৃষ্টি করবে।’