ব্রেকিং নিউজ

বিকাল ৪:৩৭ ঢাকা, মঙ্গলবার  ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

আমার কন্যা সায়মা’র কাছ থেকেই ‘অটিজম বিষয়ে’ শিক্ষা পেয়েছি : শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনি তাঁর কন্যা ও সমাজকর্মী সায়মা ওয়াজেদের কাছ থেকেই অটিজম বিষয়ে শিক্ষা পেয়েছেন উল্লেখ করে বলেছেন, অটিজম শিশুরা অবহেলায় থাকবে না। তাদের জন্য আমরা একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করে দেব। অটিস্টিক শিশুদের পিতা-মাতার অবর্তমানে তাদেরকে লালন-পালনের জন্য রাষ্ট্রই উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় উপলব্ধি করি যে, অটিজম শিশুদের জন্য সব চেয়ে বেশী কষ্ট হচ্ছে মায়ের। তাই তাদের মা-বাবা যখন থাকবে না, তখন এদের কি হবে। এরা কোথায় যাবে। আমরা এ ব্যাপারে একটা উদ্যোগ নিচ্ছি। বাবা-মা যখন থাকবে না, তখন সরকারের পক্ষ থেকে তাদের লালন-পালনের ব্যবস্থা আমরা করবো।’

‘৯৬ পরবর্তি সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে চালু করা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বিএনপি-জামায়াত বন্ধ করে দেয়ার ফলে জনসাধারণের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ফাউন্ডেশন ও ট্রাষ্ট করে এমনভাবে ব্যবস্থা গ্রহন করবো যাতে ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হলেও কেউ তা বন্ধ করতে না পারে।’

তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও যেন প্রযুক্তির উৎকর্ষের সকল সুবিধা গ্রহণ করতে পারে সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার হার্ডওয়্যার ও ওয়েবসাইট তৈরীতে এগিয়ে আসার জন্যও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস-২০১৬ উপলক্ষে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজমসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিশুদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তাদের মেধা ও যোগ্যতা প্রকাশেরও অধিকার আছে। তাদেরকে সে সুযোগ দিতে হবে।

pm180

প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক জেলা-উপজেলাতে একটি করে অটিজম চিহ্নিতকরণ ও চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনে সরকারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন,‘ শুধু ঢাকায় নয় ঢাকার বাইরেও আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। ৬৪ জেলায় এবং ৩৯টি উপজেলায় ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অটিজম কর্ণার চালু করা হয়েছে। যা থেকে প্রায় ২০ লাখ প্রতিবন্ধী সেবা গ্রহণ করছে। ঢাকায় শিশু হাসপাতাল সহ ১৫টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করে অটিজম সমস্যা জনিত শিশুদের চিকিৎসা সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে পর্যায়ক্রমে প্রত্যেকটি জেলা এবং উপজেলাতেও একটি অটিজম সনাক্তকর এবং তাদের কাউন্সেলিং করা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।’ তিনি বলেন, যারা সেবা প্রদান করবেন তাদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে যেমন সেনানিবাসে ‘প্রয়াস’ নামে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ প্রতিটি সেনানিবাসে আমি ইতোমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি আমাদের প্রতিটি সেনানিবাসে এই প্রয়াসের শাখা তৈরী করা হবে।’

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. চৌধুরী মো. বাবুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন এমপি। জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসরিন আরা সুরাত আমিন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

অটিজম ও স্নায়বিক সমস্যাজনিত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপার্সন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন এ উপলক্ষে জাতিসংঘে অটিজম বিষয়ক মূল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার দরুন অনুষ্ঠানে তাঁর ধারণকৃত বক্তৃতা পরিবেশন করা হয়।

পৃথিবীর বিখ্যাত কয়েকজন বিজ্ঞানী এবং মণীষী জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী থাকার পরেও স্বীয় প্রতিভাগুণে বিশ্ববরেণ্য হতে পেরেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবন্ধীরা কোন না কোন বিষয়ে বিশেষ মেধা সম্পন্ন হয়। আমরা যদি প্রতিবন্ধীদের মেধা বিকাশের সুযোগ দেই, তাহলে তারা সমাজকে অনেক কিছু দিতে পারে। আমারা এখন সে চেষ্টা করবো।

প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, তিনি শিশুদের আঁকা ছবিসম্বলিত শুভেচ্ছা কার্ড বিভিন্ন উৎসবের সময় ব্যবহার করে থাকেন।

তিনি বলেন, একটা সময় ছিল প্রতিবন্ধী বা অটিস্টিক বাচ্চাদের বাবা-মাকে অনেক সময় মানুষের কাছে হেয় হতে হত। অটিস্টিক বাচ্চাকে লুকিয়ে রাখা হত। এজন্য মা কে দোষ দেয়া হত। আসলে অটিস্টিক হয়ে জন্মাবার পেছনে মা-বাবার কারো কোন হাত নেই। এখন এই ধারণাটা বদলেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আর প্রতিবন্ধিতার জন্য মা-বাবাকে দোষারোপ করার সেই সুযোগটা নেই। থাকাও উচিত না। সকলেরই মনটা এখন বড়ো করা উচিত।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে তারা যদি আমাদের সমাজকে কিছু দিতে পারে সেটা আমরা নেব। অটিজম বিষয়ে সচেতনটা সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী সকলকে ধন্যবাদ জানান।

pm181

তিনি তাঁর কন্যা ও সমাজকর্মী সায়মা ওয়াজেদের কাছ থেকেই অটিজম বিষয়ে শিক্ষা পেয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, সোস্যালজিতে লেখাপড়া করা সায়মার আগে থেকেই এসব বিষয়ের প্রতি গভীর টান ছিল। প্রধানমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্রে সায়মার কর্মপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাঁরা কিভাবে কাজ করেন তা তিনি দেখে এসেছেন।

তিনি বলেন, জাতিসংঘে প্রথম যে রেজ্যুলুশন হয়েছে সায়মাই সেই উদ্যোগ নিয়েছে। জাতিসংঘ রেজ্যুলুশনগুলো নেয়াতে সারাবিশ্বে এটি সাড়া ফেলেছে। সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড়ো অর্জন। কাজেই আজকে আর অটিজম শিশুরা অবহেলায় থাকবে না। তাদের জন্য আমরা একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করে দেব।

প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধীদের জন্য তাঁর সরকারের গৃহিত বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে বলেন, আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষা আইন-২০১৩ প্রণয়ন করেছি, নিউরো প্রতিবন্ধী ডেভেলপমেন্ট সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন-২০১৩ পাশ করেছি। অটিজম বক্তিদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য নিউরো প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং ৩ হাজার ১শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। মিরপুরে আমাদের যে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন রয়েছে সেখানে একটি অটিজম রিসোর্স সেন্টার এবং একটি অবৈতনিক বিদ্যালয়ও স্থাপন করা হয়েছে। যাতে প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন সেবা ও ট্রেনিং দেয়া যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবন্ধীদের মূল ধারায় আনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাডেমি ফর নিউরো ডিজর্ডার নামে একাডেমী প্রতিষ্ঠার জন্য ইতোমধ্যেই জায়গা আমি দিয়ে দিয়েছি এবং এটি যেন খুব তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করা হয় সেই পদক্ষেপও আমরা নিচ্ছি। এখানে অটিস্টিক সহ সব প্রতিবন্ধী মানুষদের একযোগে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

ব্যক্তিগত খাতেও প্রতিবন্ধীদের জন্য অনেক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তি উদ্যোগে অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরী করেছে। তারা কাজ করে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে তাদের যে ধরণের সহযোগিতা প্রয়োজন সরকার সে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ব্রেইল পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন করে বিনামূল্যে তা বিতরণ করা হচ্ছে। আমাদের বাংলা একাডেমীও ব্রেইল বই তৈরীর কাজ হাতে নিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এই প্রতিবন্ধীদের পরীক্ষায় যেহেতু একটু সময় বেশি লাগে সেজন্য এস এসসি এবং এইচ এসসিতে আমরা ৩০ মিনিট সময় বেশি প্রদান করছি।’ তারা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিবন্ধীরা বাংলাদেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা প্রতিবন্ধীদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসেছে। বিশেষ অলিম্পিকে অসংখ্য স্বর্ণপদকসহ দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে।

pm182

তিনি প্রতিবন্ধীদের সহযোগিতার জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিজর্ডার এর মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের অটিজম বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।’ এখন সব চেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে প্রশিক্ষণ।

শেখ হাসিনা বলেন, তাছাড়া আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে অটিজম পরিচর্যাকারী হিসেবে মায়েদেরও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অটিজম ও স্নায়বিক সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করার জন্য স্ক্রিনিং টুলস তৈরীর কার্যক্রমও এগিয়ে চলেছে।

অনুষ্ঠানে শুনানো বক্তৃতায় সায়মা ওয়াজেদ সমাজে না জেনেই কাউকে যেন অটিস্টিক হিসেবে চিন্থিত না করা হয় সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছেন। প্রতিবন্ধীদেরকে সমাজেরই একজন বিবেচনা করে তাদের মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখার জন্যও তিনি সকলের প্রতি আহবান জানান।

প্রধানমন্ত্রী নীল আলো জালিয়ে প্রতিবন্ধী দিবসের কার্যক্রম উদ্বোধনের পাশাপাশি প্রতিবন্ধিদের পরিবেশনায় ‘আলোর ভূবন’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় প্রতিবন্ধি শিশুদের মাঝে গিয়ে তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।