শীর্ষ মিডিয়া

ব্রেকিং নিউজ

বিকাল ৫:২২ ঢাকা, রবিবার  ১৬ই ডিসেম্বর ২০১৮ ইং

পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যৌন হয়রানি: কাউকেই চিহ্নিত করতে পারেনি তদন্ত কমিটি

হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপ-উপাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি গত পহেলা বৈশাখে নারীদের উপর যৌন হয়রানির প্রমাণ পেয়েছে। কমিটি বলেছে, এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের পরিকল্পিত কাজ। বিকারগ্রস্থ এক বিশেষ গোষ্ঠী বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া ছিল বলে মনে হয়। কিন্তু কমিটি এদের কাউকেই চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

তবে কমিটি বলেছে, পুলিশের উচিত ছিলো প্রকাশিত ছবির উপর ভিত্তি করে অপরাধীদের সনাক্ত করে গ্রেফতার করা। কিন্তু তারা সেই ধরনের চেষ্টা চালিয়েছে বা চালিয়ে যাচ্ছে কিনা মানুষ তা জানে না। ফলে পুলিশের উপর মানুষের আস্থা থাকছে না। তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অপরদিকে ঢাবি কর্তৃপক্ষকে অকারণে দোষারোপ করা হচ্ছে। গত সোমবার তদন্ত কমিটির এই প্রতিবেদনে হাইকোর্টে দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পহেলা বৈশাখের মতো গুরুত্বপূর্ণ উত্সবের নিরাপত্তা দেয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিলো না দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার। এমনকি সিসি ক্যামেরা মনিটরিংয়ের দায়িত্বে পুলিশের কেউ ছিলো না। এছাড়া পুলিশ এক স্রিলতালতাহানিকারীকে আটকের পর ছেড়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরও ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি। প্রতিবেদনে কমিটি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়ানোর জন্য আট দফা সুপারিশ করেছে।

গত ১৬ এপ্রিল সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে হাইকোর্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশের আইজিকে বর্ষবরণের দিন নারীদের উপর যৌন হয়রানির ঘটনা তদন্তে আলাদা করে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশ মোতাবেক উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের গঠিত কমিটি সোমবার বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের ডিভিশন বেঞ্চে এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ঢাবির পক্ষে আইনজীবী এএফএম মেসবাহউদ্দিন এই প্রতিবেদন দাখিল করলে হাইকোর্ট আগামী ৭ জুলাই এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য রেখেছেন। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন, অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান, প্রফেসর মাহফুজা খানম, মোসাম্মাত্ নীলিমা আখতার ও আফরীন চৌধুরী।

কমিটি মোট ১১টি সভায় মিলিত হয়ে এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। কমিটি প্রত্যক্ষদর্শী, প্রতিহতকারী ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতিসহ নেতৃবৃন্দের সাক্ষাত্কার, প্রক্টর, রোকেয়া হলের প্রভোস্ট ও হলের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, হল গেটের সিকিউরিটি গার্ড, শাহবাগ থানার ওসি, সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ ও  ভিসির সাক্ষাত্কার পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন।

প্রতিবেদনে কমিটি বলেছে, প্রক্টর অধ্যাপক এএম আমজাদ ১৩ এপ্রিল দিবাগত রাত থেকে ১৪ এপ্রিল সারাদিন ক্যাম্পাসে অবস্থান করে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান মনিটর করেছেন। তবে সন্ধ্যার আগে-পরের মুহূর্তে ঘটে যাওয়া সেদিনের এই ঘটনার গুরুত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেননি বলেই মনে হয়। এই কারণে তিনি ঘটনাস্থলে নিজে না গিয়ে ফোনে প্রক্টরিয়াল মোবাইল টিম পাঠিয়েছেন। কমিটি মনে করে, ওইদিন সহকারী প্রক্টররা বিকেলে উপস্থিত থাকলে প্রক্টরকে এককভাবে দায়ী করা হত না এবং খবর পেয়ে প্রথমেই ভিসি অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিককে অবহিত করলে হয়ত ঘটনা দ্রুত দমন করা যেত। তবে সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্যে প্রক্টরের সংযত হওয়া উচিত ছিলো। টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের বিপরীত দিকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের সামনের রাস্তায় যে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে তা সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। তবে কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা প্রত্যক্ষদর্শীর পক্ষে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্থ (ভিকটিম) এবং যারা স্রিলতাহানির  ঘটনা ঘটিয়েছে তারা সবাই বহিরাগত বলে মনে হয়।

কমিটি বলেছে, সামাজিক ও গণযোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনার পর পর কিছু ছবি ছাপা হয়। পুলিশের উচিত ছিলো এসব ব্যক্তিকে অবিলম্বে সনাক্ত করে গ্রেফতার করা। পুলিশ যে সে চেষ্টা করেছে অথবা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তা জনসাধারণ জানে না। তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অপরদিকে ঢাবি কর্তৃপক্ষকে অকারণে দোষারোপ করা হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে পুলিশের যে ডিসি ছিলেন তিনি একেবারেই ক্যাম্পাসে নতুন। পহেলা বৈশাখের মত বর্ষবরণের অনুষ্ঠান পালনের পূর্ববর্তী কোন অভিজ্ঞতা না থাকায় এবং সঠিক সময়ে পদক্ষেপ না নেয়ায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে কমিটি বলেছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ টিএসসি এলাকায় ১৯টি সিসি ক্যামেরা ছিলো। এর মধ্যে একটি মাত্র ক্যামেরার ফুটেজ থেকে বেশ কিছু ঘটনা সনাক্ত করতে পারে। এক্ষেত্রে পুলিশের পক্ষ থেকে এই সিসি ক্যামেরা মনিটর করার দায়িত্বে কেউ ছিল বলে মনে হয় না। থাকলে ঘটনা নিশ্চয়ই এত প্রকট হত না।  ভিডিও ফুটেজ থেকে ৭টা ৬ মিনিটে সাদা পোশাকের একজন পুলিশকে (সাইদুল হক ভুঁইয়া) দেখা যায়। তিনি ঘটনাস্থল থেকে একজন স্রিলতাহানিকে ধরে আবার ছেড়ে দেন। কিন্তু শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এর কাছ থেকে জানা যায় এই ঘটনার জন্য সেদিন কাউকে আটক করা হয়নি বা থানায় নেয়া হয়নি।

কমিটি বলেছে, ওইদিনের যৌন হয়রানির ঘটনার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুটি কয়েক ছাত্র রুখে দাঁড়িয়েছিলো। ছাত্র ইউনিয়নের কয়েকজন নেতা ও সদস্য প্রতিকূল পরিবেশে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ঘৃণ্য চক্রের মোকাবেলা করে। কমিটি তাদেরকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। ঢাবির ছাত্রদের কাছ থেকে দেশ ও জাতি এমনটি আশা করে। প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সত্ সাহস অর্জন করুক এটাই চায় কমিটি।

এ ঘটনায় দোষীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। ভিডিও ফুটেজ দেখে দোষীদের আইনের আওতায় আনা কঠিন কাজ হতে পারে না। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশকে আরো সক্রিয় করার জন্য সরকারের কাছে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো সহ ৮ দফা সুপারিশ করে।