ব্রেকিং নিউজ

সকাল ১১:২৮ ঢাকা, বুধবার  ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ১০০ শাখা উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী’

পল্লী অঞ্চলের দরিদ্র জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তাদের অর্থনৈতিক সঞ্চয় নিশ্চিত করতে আজ সারাদেশে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের একশ’টি শাখা যাত্রা শুরু করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ দুপুরে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে দেশব্যাপী পল্লী সঞ্চয় বাংকের একশ’টি শাখার উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেন, ‘ক্ষুদ্র ঋণের জাল অনেক সময় দারিদ্রের দুষ্ট চক্রের’র মত দরিদ্র মানুষকে সহায়, সম্বলহীন, নিঃস্ব করে দেয়। তাই আমরা মাইক্রো ক্রেডিটের দর্শন পাল্টে মাইক্রো সেভিংস বা ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের উপর জোর দিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই প্রণোদনামূলক ব্যবস্থাই পারে গ্রামীন জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের মুলোৎপাটন করতে।’

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে প্রতিটি বসতবাড়িকে একটি খামার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যে উদ্যোগ নেয়া হয়,পল্লীসঞ্চয় ব্যাংক সেই একটি বাড়ি একটি খামারেরই প্রাতিষ্ঠানিক রুপ। যে ব্যাংকের মালিক হচ্ছে যৌথভাবে গ্রামের সমিতিভূক্ত প্রান্তিক আয়ের নারী-পুরুষ ও সরকার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের অধীনে দেশের সকল ইউনিয়নে-ওয়ার্ডে ১টি করে সমিতি গঠিত হয়েছে, এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। এটি দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে প্রতিটি বসতবাড়িকে একটি খামার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমার ব্যক্তিগত চিন্তা থেকে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। এখন দেশের ৪০ হাজার ৫২৭টি গ্রামে একটি বাড়ি একটি খামার আড়াই হাজার কোটি টাকা যৌথ মূল ধন নিয়ে কাজ করছে, যা এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

তিনি বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় গ্রামীন দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা ইতোমধ্যেই গ্রাম সমিতি গড়ে তুলে পরিবেশবান্ধব দুগ্ধ,হাস-মুরগী ও কৃষি খামার-প্রভৃতির মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উত্তোরণ ঘটিয়ে চলেছেন।

বিভিন্ন বেসরকারি এনজিও‘র ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের কিছু দিকের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এনজিওগুলো দরিদ্র জনসাধারণকে ক্ষুদ্র ঋণ দিলেও সাপ্তাহিক উচ্চ সুদের হারের কারণে ঋণগ্রহীতার হাতে আর কিছ্ইু থাকতো না। ফলে ঋণ শোধ না করতে পেরে অনেকে আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছেন। এ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের উপর আমরা জোর দিয়েছি।

এ সময় ক্ষুদ্র ঋণ নয়, ক্ষুদ্র সঞ্চয় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন,পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক এর মাধ্যমে মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। যার সুফল পাবে সর্বস্তরের মানুষ।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের অনুষ্ঠানে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৪ সালের ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আইন পাস হয়।

২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’কে স্থায়ী রূপদান করে বিশেষায়িত ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে এ ব্যাংক চালু হয়।এর মধ্যে ৯৮ কোটি টাকা প্রকল্পের আওতায় গঠিত সমিতির শেয়ারহোল্ডারদের।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এবং এলজিআরডি এবং সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ড. প্রশান্ত কুমার রায় প্রকল্পের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ক সচিব ইউনুসুর রহমান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে- ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দুই মেয়র মো. আনিসুল হক এবং সাঈদ খোকন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড.এইচ টি ইমাম এবং ড.মশিউর রহমান,বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর ফজলে কবীর,প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ,সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড. দীপু মনি, এড. রহমত আলী এবং পল্লীসঞ্চয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান মিহির কান্তি মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।

একযোগে গণভবন থেকে ব্যাংকের শাখা উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফরেন্সিয়ের মাধ্যমে টুঙ্গিপাড়া,ফরিদপুর সদর এবং সিলেট সদর শাখার ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের’ সুবিধাভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের কল্যাণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সব চিন্তা ভাবনা করেছিলেন, যে সব পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন,সে সব সম্পর্কে তাঁর জানার সৌভাগ্য হয়েছিলো ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন দিয়ে গেছেন এ দেশের মানুষের কল্যাণে। সারাটা জীবন কষ্ট করে গেছেন এই দেশের মানুষের জন্য। তাই এ দেশের মানুষ দরিদ্র থাকবে এটা হতে পারে না। দেশের মানুষকে দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র থেকে বের করে আনতে হবে। এ জন্য যা করার দরকার তা করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে ১০০ উপজেলায় নিজস্ব ভবনে পল্লীসঞ্চয় ব্যাংকের শাখা চালু হচ্ছে। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের স্থায়ী রূপ হচ্ছে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক। যে ব্যাঙ্কের মালিক হচ্ছে যৌথভাবে গ্রামের সমিতিভূক্ত প্রান্তিক আয়ের নারী-পুরুষ ও সরকার। প্রতিটি সমিতিতে তিন ভাগের দু’ভাগ নারী সদস্য রাখা বাধ্যতামূলক বলেও তিনি জানান।

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে সঞ্চয়ের সুবিধার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এ সঞ্চয় ব্যক্তির জন্য সুবিধাজনক। পাশাপাশি এটি জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখবে।

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রমকে সফল করতে সবাইকে আন্তরিকভাবে চেষ্টা অব্যাহত রাখার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,‘আমানতকে রক্ষা করতে হবে।’

প্রতি ইঞ্চি জমি কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের প্রতি ইঞ্চি জমিকে কাজে লাগাতে হবে। এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি থাকবে না। আমাদের সেভাবে চিস্তা করতে হবে, পদক্ষেপ নিতে হবে।

গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রাম যত শক্তিশালী হবে দেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী হবে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রেখে (অর্থাৎ দেশীয় পদ্ধতিতে) উৎপাদন বৃদ্ধি করবে।

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প তথা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে কৃষির বিভিন্ন সেক্টরে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ স্বেচ্ছাকর্মী তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন,পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক পল্লী অঞ্চলে সঞ্চয় প্রবণতা বৃদ্ধি, প্রতি বাড়িকে খামারে রূপান্তর করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য নিরসন এবং দক্ষ উদ্যোক্তা গোষ্ঠী তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে।

পরের কাছে যেন হাত পেতে চলতে না হয় সে উদ্দেশ্য সামনে রেখে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন,পর্যায়ক্রমে সকল উপজেলায় একটি বাড়ি একটি খামার রোডম্যাপ বাস্তবায়নে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক হবে পথ নির্দেশক।