ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৭:৩৮ ঢাকা, সোমবার  ২৮শে মে ২০১৮ ইং

পরিত্যক্ত ও বিক্রিত গাড়ি মেরামতের নামেও টাকা তুলে ইসি

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের গাড়ি মেরামত না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে যে গাড়ি বিক্রি করে দেয়া হয়েছে, সেটি মেরামতের নামেও উঠানো হয়েছে টাকা। আবার একই বিল দিয়ে একাধিকবার টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে অডিটে ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকার আপত্তি জানিয়েছে নিরীক্ষা বিভাগ। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আত্মসাৎ করা হয়েছে এর চেয়েও বেশি টাকা। ইসি কর্মকর্তাদের জন্য কেনা নতুন ১৮৪টি মোটরসাইকেল, দুটি মাইক্রোবাস ও একটি মিনিবাসের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বছর না ঘুরতেই এসব গাড়িতেও নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা।

অভিযোগ রয়েছে, নীতিমালার তোয়াক্কা না করে কমিশনের গাড়ি ব্যবহার করছেন কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ওই সুযোগ নিচ্ছেন পরিবহন পুলের গুটিকয়েক কর্মকর্তা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মের বাইরে গাড়ি বরাদ্দ দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার আড়ালে মেরামতের নামে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। গত অর্থবছরের বাজেটে কমিশন সচিবালয়ের অনুকূলে মেরামত ও সংরক্ষণ খাতে ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। মেরামতের নামে বরাদ্দের বড় অংশই লুট করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাকা, ইঞ্জিন ও বডি নষ্ট থাকায় দীর্ঘদিন পড়ে ছিল ঢাকা মেট্রো ঘ ০২-১৭২৫ রেজিস্ট্রেশন নম্বরের জিপ। কনডেম ঘোষণা করে ২০১৪ সালে তা বিক্রি করে দেয়া হয়। ‘পাওয়ার মোটর’ সংযোজন করা হয়েছে দেখিয়ে চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল এ গাড়িতে ৫ হাজার ৫০০ টাকা বিল দেয়ার জন্য প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছে চিঠি দেয় সেবা শাখা। পরে ওই বিল তোলা হয়েছে। বিলের সঙ্গে দেয়া ভাউচারে গাড়ি মেরামতের দিন ১১ ফেব্রয়ারি দেখানো হয়েছে। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৯৯২ সালে কেনা এ গাড়িটির যান্ত্রিক ত্রুটি, ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়া এবং বডিতে মরিচা ধরে অনেক স্থানে খুলে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে ২০১২ সালের ৩০ জুন কমিশনে জমা দিয়েছিলেন মোহা. ইসরাইল হোসেন। ওই সময়ে তিনি রংপুরের আঞ্চলিক কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন। নারী কেলেংকারির ঘটনায় তাকে রংপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
কমিশন সচিবের দফতরের কর্মকর্তাদের বহনের কাজে ব্যবহৃত ঢাকা মেট্রো-ঘ-০২-২৯৯১ পাজেরো জিপ গাড়ি মেরামত ও যন্ত্রাংশ কেনার নামে ১৩ হাজার ৫৩০ টাকা খরচ দেখিয়ে দু’বার বিল তোলা হয়েছে। বিষয়টি অডিট আপত্তিতেও উঠে এসেছে। এ সংক্রান্ত নথিতে দেখা গেছে, মিরপুরের ১৩ নম্বর সেকশনের ৫৫ বাইশটেকী এলাকার সান মোটরস অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে চলতি বছরের ৮ ফেব্র“য়ারি ও ১৫ এপ্রিল দু’বার একই ধরনের যন্ত্রাংশ ক্রয় ও মেরামত করা হয়েছে। ওই বিলের সঙ্গে দেয়া ভাউচারে কোনো নম্বর উল্লেখ নেই। এতে বলা হয়েছে, ওই গাড়িতে ব্রেক সু, ব্রেক প্যাড, হুইল ড্রাম ও ডিস্ক ড্রাম টানিং, স্পার্ক প্লাগ সংযোজন করা হয়েছে। একই বিলে একই ওয়ার্কশপ থেকে ঢাকা মেট্রো-ঘ-০২-২৯৮৮ নম্বরের গাড়ির মেরামতের নামে দু’বার ২ হাজার ২৫০ টাকা করে তোলা হয়েছে। এ বিষয়টিও অডিট আপত্তিতে এসেছে।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে আরও দেখা গেছে, কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেসুর রহমানের যাতায়াতে ব্যবহার হয় পাজেরো জিপ ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৩-৬৬৩৪।
সান মোটরস অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে এ গাড়িতে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ব্রেক প্যাড, ব্রেক ওয়েল ও বাকেট সংযোজন বাবদ ৪ হাজার ৫০০ টাকা বিল তোলা হয়েছে। একই তারিখের একই যন্ত্রাংশের নাম উল্লেখ করে ওই ওয়ার্কশপের ভাউচারে ইসি থেকে মিরপুর রুটে কর্মকর্তা বহনকারী মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো চ ৫৩-৪৮০৭) মেরামতের নামে ৪ হাজার ৫০০ টাকা বিল উঠিয়ে নিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
আরেক নথিতে দেখা গেছে, সান মোটরস অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে ইসি-উত্তরা রুটের উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বহনকারী গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১-২০১২) একই দিন একই যন্ত্রাংশ দু’বার সংযোজন করা হয়েছে উল্লেখ করে পৃথক দুটি বিল তোলা হয়েছে। এর একটিতে খরচ দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ৭৩০ টাকা ও অপরটিতে ৩ হাজার ৮৫০ টাকা। একইভাবে অন্যান্য গাড়ি মেরামত ও যন্ত্রাংশ সংযোজনের নামে নানাভাবে অনিয়ম করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অডিটে ৪৭ বিলের বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। এতে ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৭২০ টাকার আপত্তি তোলা হয়েছে।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে কমিশন সচিবালয়ের জন্য দুটি মাইক্রোবাস, একটি মিনিবাস ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য ১৮৪টি মোটরসাইকেল কিনে কমিশন সচিবালয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এসব গাড়ি কেনা হলেও মান নিয়ে কমিশন কর্মকর্তারাই প্রশ্ন তুলেছেন।
২৫ লাখ টাকায় কেনা মিনিবাসে প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। গাড়ির বডিতে মরিচা ধরে গেছে। এটি মতিঝিল-ইসি রুটে কর্মকর্তা বহনের কাজে ব্যবহার হতো। বর্তমানে চলাচল বন্ধ রয়েছে। দুটি নতুন মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ-৫৩-৪৮০৬ ও ঢাকা মেট্রো-চ-৫৩-৪৮০৭) কেনা হয়েছে কর্মকর্তাদের যাতায়াতের জন্য। দুটিতেই যান্ত্রিক ত্র“টি রয়েছে। ব্যবহারকারী উপসচিব পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, গাড়ির দরজা ঠিকমতো খোলা যায় না। এসি কাজ করে না। নথিতে দেখা গেছে, দুটি গাড়িতে যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও মেরামতের কাজ করা হয়েছে।
আড়াই কোটি টাকায় কেনা চায়নিজ মোটরসাইকেলগুলোর বেশ কয়েকটি এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। সম্প্রতি নাটোরে এক উপজেলায় যান্ত্রিক ত্রুটি থেকে ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। একাধিক উপজেলা কর্মকর্তা বলেন, চলার পথে প্রায়ই মোটরসাইকেল নষ্ট হয়ে যায়। ঢাকার বাইরে এর সার্ভিসিং সেন্টারও নেই। ফলে মোটরসাইকেল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলকে একাধিকবার জানিয়েও সুফল পাননি।