ব্রেকিং নিউজ

বিকাল ৪:৪৬ ঢাকা, রবিবার  ২১শে অক্টোবর ২০১৮ ইং

ফটোঃ সাগরে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিখোঁজ পাইলট রুম্মান কাদের চৌধুরী তাহমিদ

নিখোঁজ পাইলট রুম্মানের ইচ্ছেটা পূরণ হল না

রুম্মান কাদের চৌধুরী তাহমিদ। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পাইলট হবেন। মা-বাবাও ছেলের এমন স্বপ্নের সারথী ছিলেন। সেই স্বপ্ন তার পূরণও হয়েছে বটে। সাধারণ পাইলট থেকে ফাইটার পাইলট তথা যুদ্ধ বিমানের বৈমানিক হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে এসেছিলেন চট্টগ্রামে। কিন্তু ফাইটার প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে সোমবার সকালে চট্টগ্রামের জহুরুল হক বিমান ঘাঁটি থেকে উড়াল দিয়ে চিরতরের জন্য বাড়ির পাশে বঙ্গোপসাগরে হারিয়ে গেলেন তাহমিদ। বিমানটি বিধ্বস্ত হয় সাগরে। অথচ আর ক’দিন বাদেই পুরোদস্তুর যোদ্ধা বৈমানিক হতেন তাহমিদ। সাগরে বিলীন হয়ে গেল তার পরিবারের স্বপ্ন। সর্বশেষ মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয় আগের দিন। মা বলেছিলেন, ‘কবে আসবি তুই।’ তাহমিদ জানিয়েছিলেন, ‘এখন আর আসব না। একেবারে ঈদে ঢাকায় এসে সবার জন্য শপিং করব।’ ঈদে আর আসা হল না, করা হল না মা-বাবা, ভাই-বোনদের জন্য শপিং। দুর্ঘটনায় সব স্বাদ-আহলাদ সাগরেই জলাঞ্জলি হল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রুম্মান তাহমিদের।
মঙ্গলবার বঙ্গোপসাগরে দ্বিতীয় দিনের মতো নিখোঁজ পাইলট তাহমিদের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়েছে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও বিমানবাহিনী। বিরূপ আবহাওয়া ও সাগর উত্তাল থাকায় উদ্ধার অভিযানে ব্যাঘাত ঘটে। বেগ পেতে হয় উদ্ধারকারী দলকে। অন্যদিকে তাহমিদের বাবা আবদুল কাদের চৌধুরী, মা ঝর্ণা আক্তার, ছোট ভাই তানজিদ, তৌহিদসহ পরিবারের সবাই সোমবার রাতেই ঢাকা থেকে ছুটে যান চট্টগ্রামে। তারা পতেঙ্গায় বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটিতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। সেখানে তাহমিদের বাবা-মায়ের আহজারি-আর্তনাদে উপস্থিত বিমান বাহিনীর সদস্যরা অশ্র“সজল হয়ে উঠেন। কেউই তাদের সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পরিবারের বড় ছেলে তাহমিদকে হারিয়ে সবাই যেন শোকে পাথর হয়ে গেছেন। দিনভর জহুরুল হক ঘাঁটিতে অপেক্ষা করলেও সন্ধ্যার পর পতেঙ্গা উপকূলে যাওয়ার কথা তাদের। দু’দিনেও সন্ধান না পাওয়ায় সাগরে তাহমিদের সলিল সমাধি হয়েছে বলেই ধারণা করছেন উদ্ধারকারীরা। জীবিত না হোক অন্তত তাহমিদের লাশটা যেন উদ্ধার হয় সেটাই স্বজনদের এখন একমাত্র চাওয়া।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের আবদুল কাদের চৌধুরীর বড় ছেলে রুম্মান কাদের চৌধুরী তাহমিদের জন্ম ১৯৯০ সালে। ২০০৬ সালে কুমিল্লার ইস্পাহানি স্কুল থেকে এসএসসি এবং ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে ২০০৮ সালে এইচএসসি পাস করেন তাহমিদ। এরপর পরিবার ও তার স্বপ্ন পূরণ করতে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যোগদান করেন বিমানবাহিনীতে। বাবা-মার স্বপ্নের পাইলট হওয়ার সেই ট্রেনিং শেষ করেন ২০১০ সালের ডিসেম্বরে। এরপর শুরু হয় তাহমিদের যোদ্ধা বৈমানিক হওয়ার দৌড়। সেই দৌড় থেমে যায় ২৯ জুন সোমবার। যোদ্ধা বৈমানিক হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে বিমানবাহিনীর ফাইটার এফ-৭ বিমান নিয়ে আকাশে উড়াল দেন তাহমিদ। উড্ডয়নের ১৫ মিনিটের মাথায় পতেঙ্গা উপকূলে বিমানটি আছড়ে পড়ে।
মাসখানেক আগে তাহমিদের সঙ্গে পরিবারের সর্বশেষ দেখা-সাক্ষাৎ হয়। তাহমিদের ছোট ভাই তামজিদ পড়ালেখা শেষ করে মালয়েশিয়া থেকে ফিরেছেন। তার ছোট তৌফিক যোগ দিয়েছেন সেনাবাহিনীতে। সর্বশেষ আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল ম্যাচ খেলতে ঢাকায় আসেন তাহমিদ। তখন সবার সঙ্গে দেখা করেন।
তাহমিদের একমাত্র চাচা আনোয়ারুল কাদের বলেন, ‘ভাই-বোনদের খুবই আদর করত তাহমিদ। সবার লেখাপড়ার খোঁজ-খবর রাখত। নামাজ-কালামেও আমার ভাতিজাটা ছিল অন্যরকম। খুবই অমায়িক ছিল। এই তো দুর্ঘটনার আগের দিন ভাবী তাহমিদের মা ঝর্ণা আকতার ফোনে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘তুই কবে আসবি’। উত্তরে তাহমিদ জানিয়েছিল, ‘এখন আর আসব নাএকেবারে ঈদের ছুটিতে এসে সবার জন্য শপিং করব।’ তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদে তার সাধ্যমতো সবার জন্য কাপড়-চোপড় কিনে দিত তাহমিদ।’
তাহমিদের ছোট ভাই তামজিদ কাদের বলেন, ‘বড় ভাইকে হারিয়ে বাবা-মা নির্বাক হয়ে গেছেন। তাদের কোনোভাবেই সান্ত্বনা দেয়া যাচ্ছে না। এখনও আমরা সবাই চট্টগ্রামের জহুরুল হক ঘাঁটিতে অবস্থান করছি যদি ভাইয়াকে পাওয়া যায়।’
এদিকে তল্লাশি অব্যাহত থাকলেও বঙ্গোপসাগরে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিখোঁজের প্রায় ৩০ ঘণ্টা পরও তাহমিদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে অভ্যন্তরীণ নিয়মিত উড্ডয়নের অংশ হিসেবে এফ-৭ যুদ্ধবিমানটি উড়াল দেয়। বেলা ১১টা ১৪ মিনিটের দিকে বিমানবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরের ব্রাভো অ্যাংকারেজে বঙ্গোপসাগরে প্লেনটি বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। দুর্ঘটনার পরপর কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীর তল্লাশি দল ঘটনাস্থলে যায় এবং তল্লাশি শুরু করে।