ব্রেকিং নিউজ

সন্ধ্যা ৭:১৫ ঢাকা, বৃহস্পতিবার  ১৬ই আগস্ট ২০১৮ ইং

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক।
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক। ফাইল ফটো

ডিসির কাণ্ড, ছাত্রীদের আড্ডার ছবি দিলেন ফেসবুকে

।। মোঃ বজলুল করিম (সাব্বির) ।।

কলেজ সময়ে পার্কে ঘোরাফেরার অপরাধে পার্কে অবস্থানরত কিছু ছাত্রীর ছবি তুলিয়ে ফেসবুকে আপলোড করলেন ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক।

ঘটনাটি ১৪ জুলাই শনিবার ঝালকাঠি সদরে ঘটে।

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মিঃ হামিদুল হক শনিবার দুপুর ১টার দিকে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দেন। ওই স্ট্যাটাসে (তাঁর ভাষায়) পার্কে আড্ডারত কলেজ ছাত্রীদের দুটি ছবি আপলোড করে দিয়ে তিনি লিখেছিলেন, আজ ১৪ জুলাই দুপুর ১২ টায় কলেজ ড্রেস পড়ে তোমরা যারা পার্কে আড্ডা দিয়েছো, যাদের জন্য আজ পুলিশ পাঠাতে হলো, আগামীতে এমন আড্ডা দিলে পরিচয় সহ প্রচার করা হবে। তোমরা সাবধান হও।

জেলা প্রশাসক মিঃ হামিদ এর স্ট্যাটাসের বক্তব্য মতে, তিনি আড্ডারত ছাত্রীদের পুলিশ পাঠিয়ে পার্ক থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন এবং ছবি তুলিয়েছেন। আর ওই ছবি তিনি তাঁর নিজ ( Hamid Dc Jhalokathi  )ফেসবুক একাউন্টে আপলোড করে দিয়েছিলেন।

ডিসি মিঃ হামিদ এর আপলোডকৃত ছবিতে দেখা যায় যে, কিছু মেয়ে পার্কে গিয়েছে এবং একান্তে বসে গল্প-গুজব করছিল, সেখানে বাজে আড্ডা বলতে যা বুঝায় তা দৃশ্যমান নহে। আপত্তিকর কোন ভঙ্গিমাও লক্ষণীয় নয়, এমনকি বয়ফ্রেন্ড নিয়েও কাউকে দেখা যায় নি। তবুও ছবি তোলা-পুলিশ পাঠানো এবং সেই ছবি নিজ ফেসবুকে আপলোড করে দেয়াটা নুন্যতম স্বাধীনতার পরিপন্থি কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো এই ছবি আপলোডের কারণে ওই সময়ে পার্কে অবস্থানরত ছাত্রীরা সামাজিকভাবে মারাত্মকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়েছে। যদিও ছবি তোলার সময়ে ছাত্রীরা নিজেদেরকে যতোটা সম্ভব আড়াল করেছিল বটে তথাপিও- তাদেরকে স্থানিয়দের চিনতে সমস্যা হয়নি। তাই পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অপদস্ত হল ছাত্রীরা। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারীদের ছবি প্রকাশ করা স্পর্শকাতর জেনেও সে বিষয়ে অদূরদর্শিতার পরিচয় দিলেন একজন ডিসি। যেহেতু, ক্লাস ফাঁকি দেয়া কোন ফৌজদারি অপরাধ নয়, আর সেটা দেখার দায়িত্ব ডিসির নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। আর হ্যাঁ, ক্লাস ফাঁকিও একটি অপরাধ তা সমাধানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রচলিত বিধিবিধানই যথেষ্ট। জেলা প্রশাসন প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দিতেই পারে, তা শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের বেলায় মানায় না।

বিগত ৮ জুলাই জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় ছাত্র-ছাত্রীদের আড্ডা বন্ধে তিনটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ডিসি সাহেব তারই ধারাবাহিকতায় এমনটি করলেন। যদিও একদিন পরে আপলোডকৃত ছবি ও স্ট্যাটাসটি মুছে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

ঝালকাঠি জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভা

৮ জুলাই এর ঝালকাঠি জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভা

৮ জুলাই জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত হয়।

জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্তগুলো সমাজের জন্য কল্যাণকর হলেও তা ছিল অনেকটা ‘অপরিপক্ব’। স্থান-কাল-পাত্র বলতে যা বুঝায় সে বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় নাই। মফস্বলের সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা না করেই নিজস্ব অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সিদ্ধান্ত ১। স্কুল /কলেজ চলাকালীন সময়ে স্কুল/কলেজের কোন ছাত্র/ছাত্রী পার্ক, রাস্তাঘাট বা হোটেল রেস্টুরেন্ট এ ঘোরাফেরা বা অবস্থান করতে পারবে না।

কেন অপরিপক্বঃ মফস্বলের শিক্ষার্থীরা দুপুরের খাবার স্কুলে নিয়ে যায় না। তাঁদের বাঁচতে হলে রাস্তাঘাট বা হোটেল রেস্টুরেন্ট এ যেতেই হবে। তাই ঘোরাফেরা বা অবস্থান স্বাভাবিক।

সিদ্ধান্ত ২। মাগরিবের পর কোন ছাত্র/ছাত্রী অনুরূপভাবে রাস্তাঘাটে, হাটবাজারে, পার্কে অবস্থান করতে পারবে না।

কেন অপরিপক্বঃ শীতের দিনে স্কুল-কলেজ ছুটির পরেই হয় সন্ধ্যা। মাগরিবের পর এখানে প্রযোজ্য হতে পারে না। সময় নির্ধারণ করা যেত যদিও প্রস্তাবটিই অবাস্তব। মফস্বলের অধিকাংশ ছাত্রের স্কুলের আগে ও পরে প্রাইভেট পড়া,পারিবারিক অনেক কিছু যেমন, বাজার করা, নাস্তা করা, ক্রয়-বিক্রয় করা, আত্মীয়স্বজনের খোঁজ-খবর নেয়া ইত্যাদি অর্থাৎ বাড়ি থেকে দেয়া নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করে বেশিরবাগ ক্ষেত্রে পায়ে হেঁটে কাজ সমাধা করে বাড়িতে ফিরতে হয়। যখন তখন বাড়ির প্রয়োজনে বের হতে হয়। তাই এই নির্দেশনা যাদের গাড়ি, বাসায় চাকর আছে তাদের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। সন্তানের সাহায্যর ওপর নির্ভরশীল পরিবারের কেউ পালন করতে পারেবে না।

সিদ্ধান্ত ৩। যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতীত এরূপ কোন ছাত্র/ছাত্রী বর্ণিত সময়ে পাওয়া গেলে তাকে আটক করে স্কুল/কলেজ থেকে বহিস্কার করার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

কেন অপরিপক্বঃ আড্ডা দেয়ায় ছাত্র-ছাত্রী আটক-বহিস্কারের হুমকি অ-শোভনীয় ও অতিরঞ্জিত। যুক্তিসঙ্গত কারণের সনদ হাতে নিয়ে যদি শিক্ষার্থীদের চলাফেরাই করতে হয় তাহলে জেলখানার মধ্যে পার্থক্য থাকলো না। কোনটি আড্ডা আর কোনটি আড্ডা নয় তা প্রমাণ করার ক্ষেত্রে সাধারণ নিরীহ শিক্ষার্থীরাও হয়রানীর ঝুঁকিতে থাকবে। সবচেয়ে বড় ভুল যেখানে ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিতি-অনুপস্থিতি মনিটরিং তথা আড্ডা বন্ধের বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি গাইড লাইন দেয়া জরুরি ছিল সেটাই গৃহীত সিদ্ধান্তের তালিকায় নাই।

ঝালকাঠি জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় গৃহীত তিন সিদ্ধান্ত

ঝালকাঠি জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় ৮ জুলাই গৃহীত তিন সিদ্ধান্ত। যা ১১ জুলাই প্রেস রিলিজ আকারে ডিসি প্রকাশ করেন।

ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিতি-অনুপস্থিতি মনিটরিং তথা আড্ডা বন্ধের জেলা প্রশাসনের উদ্যোগটি  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ জন্য ছবি তোলা, আটক কিংবা বহিস্কারের প্রয়োজন দেশের বহু স্কুল-কলেজে লাগে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় গাইড লাইন দিলেই শিক্ষার্থীদের আয়ত্বে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

ছবি আপলোডের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মিঃ হামিদ এর বক্তব্য নেয়ার জন্য ইমেইলে যোগাযোগ করা হলেও ইমেইল বার্তার উত্তর দেন নি তিনি।