ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৭:২৪ ঢাকা, রবিবার  ২১শে অক্টোবর ২০১৮ ইং

ডিএসসিসিতে হরিলুট চলছে

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং এর বেশ কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন খালি জায়গা, ফুটপাথ, দোকানের পজিশন এবং দরপত্র দেওয়ার সময় এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ডিএসসিসির এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে কাগজে কলমে বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্প বার্ষিক বাজেটে দেখিয়ে আসছেন। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে- রাস্তা-ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্কার, ড্রেন, খেলার মাঠ ও খোলা জায়গা, বিপণীবিতান, কর্মচারীদের আবাসন, সমাজ কল্যাণ ইত্যাদি। যদিও বাস্তবে এসব প্রকল্পে কোনও ধরণের কাজ হয়নি। ডিএসসিসির অধীনে উন্নয়ন প্রকল্প ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে দুর্নীতি কমিশন (দুদক) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, ডিএসসিসির কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) থাকাকালীন নিয়োগ পেয়েছিলেন। পরে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রেষণে (ডেপুটেশনে) নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘এর ফলে অস্থায়ী ভারপ্রাপ্ত উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের স্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত অসাধু কর্মকর্তাদের খেয়াল খুশিমত সিটি করপোরেশন পরিচালিত হয়ে আসছে।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের অনেক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত আছেন। নির্দিষ্ট সময় পর এসব কর্মকর্তারা সরকারের অন্যান্য বিভাগে বদলি হয়ে যান। এ কারণে সিটি করপোরেশন থেকে প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নগরবাসী।

প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার সময় ডিসিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা বলেন। এসব উন্নয়নের পেছনে  বিগত অর্থবছরে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেন। যদিও নিম্নমানের নগর সেবার কারণে নগরবাসীরা এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। গত দুই অর্থবছরে ডিএসসিসি প্রকৌশল বিভাগ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, ড্রেন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থা খাতে ২৫৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু এ সিটি করপোরেশনের বেশিরভাগ সড়ক, রাস্তা এবং ড্রেন কোনোটাই ঠিক নাই। জনগণের বিপুল টাকা ব্যয় করলেও ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, ডিএসসিসির শীর্ষ কর্মর্তারা বলছেন পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে জীর্ন রাস্তা ও ড্রেনের মেরামতের কাজে বিলম্ব হচ্ছে। কর্মকর্তাদের দাবি, গত দুই অর্থবছরে খেলার মাঠ এবং পার্কের উন্নয়নে ৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। যদিও খেলার মাঠ, পার্ক এবং উন্মুক্ত স্থানের মতো সরকারি বিনোদন কেন্দ্রগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি এ দাবির ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ কোনও পরিবর্তন পাওয়া যায় না। ডিসিসির নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, অবৈধ দখল, তদারকির অভাব, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ডিএসসিসির বেশিরভাগ খোলা জায়গায় যেতে পারে না শিশু এবং কিশোররা। এছাড়া এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীর পান্থকুঞ্জ পার্কে ঢালাও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে ডিএসসিসির কিছু কর্মকর্তা এবং আরকে গ্রুপের বিরুদ্ধে। সূত্র জানায়, আরকে মাল্টিমিডিয়ার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগ যৌথভাবে গত ১১ বছর সরকারি পার্কটি পরিচালনা করছে। এসময়ে পার্কের ভেতরের বেশ কিছু গাছ কাটা এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙ্গে ফেলেছে তারা। পুরান ঢাকার ইংলিশ রোড পার্কেরও দীর্ঘদিন ধরে একই অবস্থা বিরাজ করছে। বেশ কয়েক বছর ধরে পার্কটি স্থানীয় ট্রাক চালকদের একটি গ্রুপের দখলে রয়েছে।
ডিএসসিসির কিছু কর্মকর্তাদের একটি সিন্ডিকেট ২০১২ সালে রাস্তা এবং উপরিভাগের ড্রেন মেরামতের একটি প্রকল্পের দরপত্র অবৈধভাবে পাইয়ে দিয়ে সরকারি বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে। সিটি করপোরেশেনের কোনও লোগো ছাড়াই এ দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে মাদারটেক, বাসাবো, কদমতলা, রাজারবাগ, মুগদা, মতিঝিল এবং কমলাপুর এলাকার রাস্তা ও ড্রেন মেরামতের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সূত্র জানায়, এ প্রকল্পে নিযুক্ত ডিএসসিসি জোন-২ (খিলগাঁও) এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী বোরহান উদ্দিন ভুয়া দরপত্র বিজ্ঞপ্তি তৈরি করে নিজেদের অপরিচিত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় পত্রিকায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই। এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কাজ শুরুর আগেই অনেকগুলো বিল উত্থাপনের মধ্য দিয়ে ডিএসসিসির মোটা অংকের অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন কর্মকর্তাও এর ভাগ পেয়েছেন।

ডিএসসিসির নতুন নির্মিত সাত শতাধিক দোকান কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিপনীবিতানের মধ্যে রয়েছে জাকের সুপার মার্কেট, ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট ১ ও ২, কাপ্তানবাজার মার্কেটসহ আরও কয়েকটি মার্কেট।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে ফুলবাড়িয়া এলাকার কাজি আলাউদ্দিন রোডের ফুটপাত ক্ষমতাসীন দলের নেতাকে বরাদ্দ দিয়ে আইন ভঙ্গ করে ডিএসসিসি। সিটি করপোরেশনের এস্টেট বিভাগের সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর সেন্ট্রাল ভেটেরিনারী হাসপাতাল এবং ফুলবাড়িয়ায় অবস্থিত ফায়ার ব্রিগেড কার্যালয়ের পশ্চিম দিকের জায়গা অবৈধভাবে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে ক্ষমতাসীন দলের আরেকটি গ্রুপের বিরুদ্ধে গুলিস্তানে রমনা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনের কাছে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। ২০১২ সালে হাইকোর্ট ডিএসসিসিকে রাজধানীর জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ফুটপাতে সব দখল রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হাইকোর্টের ওই নির্দেশে আরও বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে ফুটপাতে মানুষের হাঁটার পথে কোনও ধরণের বাণিজ্যের অনুমতি দেওয়া না হয়।
ডিএসসিসির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কর্মীদের কলোনি নির্মাণ প্রকল্প সরকারি কর্মকর্তাদের নির্মিত ভবন ধসের ঘটনার এক দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ। এ প্রকল্পের অধীনে সাড়ে আট হাজার মানুষের আবাসন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুরো প্রকল্পকে ধ্বংসস্তূপ বানানোর পরও এতে জড়িত কর্মকর্তা দিনের পর দিন দায়মুক্তি পেয়ে আসছে। ২০০৫ সালে ডিএসসিসি ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে পরিষ্কারকর্মীদের জন্য কলোনি নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্প অনুযায়ী রাজধানীর চারটি এলাকায় চারতলার ১২টি ভবন নির্মাণ করার কথা ছিল। ২০০৬ সালে প্রকল্পটির পরিচালক একসঙ্গে নয়টি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। কিন্তু ২০০৭ সালের মে মাসে নির্মাণাধীন একটি ভবন আকস্মিক ধসে পড়ে। পরে জাতীয় অর্থনীতি পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি ভাগ্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) যাচাই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। আইএমইডির প্রতিবেদন অনুসারে, এ প্রকল্পে রাষ্ট্রের ১ কোটি ২২ লাখ টাকা জলে গেছে। সূত্র জানায়, একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিযুক্ত প্রকল্প পরিচালকের সময় ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত মেসবাহ-উল করিমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়াতে তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেন। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, মেসবাহ বর্তমানে ডিএনসিসিতে যুক্ত হয়েছেন। এসব ঘটেছে পূর্ববর্তী মেয়র এবং  প্রশাসকদের পরোক্ষ সহযোগিতায় আশা করা যায় বর্তমান মেয়র যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন। যদিও বর্তমান মেয়র গত ২ দিনে সাহসিকতার সাথে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্বে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করে প্রশংসিত হয়েছেন।