ব্রেকিং নিউজ

রাত ৯:৪৪ ঢাকা, শুক্রবার  ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক

ডলার চুরির মামলার বিবরণীতে যা বললো বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক মো. জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মতিঝিল থানা সূত্র জানায় মানি লন্ডারিং আইনে মামলাটি করা হয়েছে।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ (সংশোধনী ২০১৫) এর ৪ ধারাসহ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬ এর ৫৪ ধারা ও ফৌজদারি আইনের ৩৭৯ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর ১৩ (৭৪)। ঘটনার সময়: ০৪/২/২০১৬ তারিখ রাত আনিমানিক ৮:০৩ ঘটিকা থেকে ৫/২/২০১৬ তারিখ সকাল ৮:৪৫ ঘটিকা পর্যন্ত।  মামলা গ্রহণের সময়: ১৫/৩/২০১৬ দুপুর ১৪: ৩০ ঘটিকা। মামলাটি তদন্ত করবে সিআইডি।

 

এজাহারে যা বলা হয়েছেঃ  

আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের ডিলিং রুম অফিসের যুগ্ম পরিচালক মো. জোবায়ের বিন হুদা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আদেশে এই এজাহার দায়ের করছি।

আমি গত ৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার শাখার যাবতীয় কার্যাবলী সম্পাদন শেষে রাত আনুমানিক ৮:৩০টায় শাখার কর্মকর্তাগণসহ অফিস ত্যাগ করি।

সুইফট লেনদেনের নিয়ম মোতাবেক পরবর্তী দিন ৫ ফেব্রুয়ারি আগের দিনের লেনদেনসমূহের নিশ্চয়তা বার্তা সুইফট কক্ষে রক্ষিত প্রিন্টারে প্রিন্ট হওয়ার কথা। ৫ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক সকাল পৌনে ৯টার সময় আমি অফিসে আসি। আনুমানিক সাড়ে ১০টার সময় অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর রফিক আহমাদ মজুমদার সুইফট কক্ষে আগের দিনের নিশ্চয়তা বার্তাসমূহ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, সুইফ সার্ভার এ লগিন করা সত্ত্বেও ম্যাসেজসমূহ প্রিন্টারটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাব প্রিন্ট হচ্ছে না।

এ অবস্থায় রফিকসহ আমি ম্যানুয়ালি বার্তাসমূহ প্রিন্ট করার বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। প্রিন্টিং সংক্রান্ত সমস্যা এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে বিধায় উদ্ভূত সমস্যাকে অন্যান্য দিনের সমস্যার মতো মনে করি।

এ সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রাখার জন্য শাখার অন্যান্য কর্মকর্তাগণকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেই এবং বিষয়টি আমাকে অবহিত করার জন্যও তাদেরকে অনুরোধ করে আমি আনুমানিক বেলা সোয়া ১১টায় অফিস ত্যাগ করি। দিনটি শুক্রবার হওয়ায় সমস্যাটি নিয়ে পুনরায় পরদিন শনিবার কাজ করা হবে মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়ে উপস্থিত অন্য কর্মকর্তাগণ আনুমানিক বেলা সাড়ে ১২টার সময় অফিস ত্যাগ করেন বলে পরে আমি জানতে পারি।

পরদিন ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল আনুমানিক ৯টার সময় অফিসে আসি এবং সহকর্মীদের সহায়তা নিয়ে প্রিন্টিং সংক্রান্ত সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করি। এ সময় লক্ষ্য করি সুইফটের বিদ্যমান সফটওয়্যারটি চালু হচ্ছে না। সফটওয়্যারটি চালু করতে গেলেই মনিটরে স্বয়ংক্রিয় বার্তা ‘ফাইল ইজ মিসিং অর চেঞ্জড’ (একটি ফাইল পাওয়া যাচ্ছে না অথবা পরবর্তিত হয়ে গেছে) এবং “nroff.exe” নামের একটি ফাইলের নাম ফোল্ডারপাথসহ (folder path) নির্দেশ করছিল।

সেই নির্দেশনা মোতাবেক টেস্ট সার্ভারের সঙ্গে ক্রসচেক করে সমাধানের চেষ্টা করি এবং আনুমানিক দুপুর সাড়ে ১২টার সময় সফট্ওয়্যাটি বিকল্প পদ্ধতিতে চালু করতে সক্ষম হই। তখনও স্বয়ংক্রিয় প্রিন্টিং সমস্যাটির সমাধান করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাকের হোসেন এবং মহাব্যবস্থাপক বি এইচ খানকে অবহিত করি এবং তাদের মৌখিক অনুমোদন নিয়ে বিকল্প পদ্ধতিতে ম্যানুয়ালি বার্তাসমূহ প্রিন্ট করতে সক্ষম হই।

প্রিন্টকৃত বার্তাসমূহ স্বাভাবিক নিয়মে সর্টিং করার সময় দেখা যায় যে, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে তিনটি ভিন্ন ধরনের মেসেজের মাধ্যমে কিছু কোয়ারি (তথ্য জানতে চাওয়া) করা হয়। এর মধ্যে প্রথম মেসেজটি আমাদের সিস্টেমে রিসিভ হয় ৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা ২৪ মিনিটে, যা আনুমানিক দুপুর সাড়ে ১২টার পর প্রিন্ট নেয়া সম্ভব হয় যেখানে ১২টি ট্রানজেকশনের (লেনদেন) কোয়ারি করা হয়। অপর দুটি মেসেজে আমাদের সিস্টেমে রিসিভ হয় ৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৮ মিনিটে, যেখানে একটি মেসেজে চারটি ট্রানজেকশনের ব্যাপারে এবং আরেকটিতে ৩০টি ট্রানজেকশনের ব্যাপার কিছু কোয়ারি করা হয়। এখানে ৩০টি ট্রানজেকশনের ব্যাপারে তারা পেমেন্টের (অর্থ পরিশোধ) ব্যাপারে অধিকতর ক্ল্যারিফিকেশনের (যাচাই) জন্য অনুরোধ জানায়।

এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, আমাদের সিস্টেম ব্যবহার করে কোনো মেসেজ পাঠানো হলে উক্ত মেসেজে এসিকে (প্রাপ্তি স্বীকার) কপি সার্ভারে থেকে যায় এবং রিসিভিং ব্যাংক ওই পেমেন্ট এক্সিকিউট (লেনদেন কার্যকর) করলে প্রতিটি পেমেন্টের জন্য পৃথক ডেবিট কনফার্মেশন (টাকা তোলার নিশ্চিতকরণ বার্তা) পাঠায় এবং সকল ট্রানজেকশনের সামারি রিপোর্ট (সংক্ষিপ্ত বিবরণ সম্বলিত প্রতিবেদন) হিসেবে একটি স্টেটমেন্ট (ব্যাংক বিবৃতি) পাঠায়। কিন্তু উক্ত ঘটনার পর দেখা গেছে আমাদের সিস্টেমে সংশ্লিষ্ট মেসেজসমূহের কোনো প্রাপ্তি স্বীকার বা ডেবিট কনফার্মেশন সার্চ করে পাওয়া যায়নি। একটি স্টেটমেন্টের ইনস্ট্যান্স পাওয়া গেলেও সেটি করাপ্টেড (অকেজো) ছিল এবং তা কোনোভাবেই খোলা বা পড়া যায়নি। সুতরাং তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের কাছে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের পাঠানো ট্রানজেকশন লিস্ট (যার মধ্যে শুধু ট্রানজেকশন Ref এবং অ্যামাউন্ট) ছাড়া অন্য কোনো তথ্য ছিল না।

আমাদের সিস্টেমে কী ঘটেছে তা বুঝতে সুইফটের সঙ্গে তাদের কেইস ম্যানেজার নম্বর ১০৫২২৯২৬-এর মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। আমাদের সুইফট সিস্টেমে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে এরূপ আশংকা করি এবং সুইফট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য অনুরোধ জানাই।

সুইফট সিস্টেম অকার্যকর হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব অনুধাবন করে আমরা ই-মেইলের মাধ্যমে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ককে ৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর দেড়টার সময় অনুমোদনবিহীন (আনঅথরাইজড) পেমেন্টসমূহসহ পরবর্তী নির্দেশনা দেয়ার আগে পর্যন্ত সকল ধরনের পেমেন্ট প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার জন্য অনুরোধ জানাই। ওই ই-মেইলের একটি কপি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ককে ফ্যাক্সের মাধ্যমে অবহিত করি।

উল্লেখ্য, এ বিষয়ে আলাপ করার জন্য টেলিফোনে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেও সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হই।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি সুইফট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সুইফটের ব্যাকআপ সার্ভার চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখ সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় ব্যাকআপ সার্ভার চালু করতে সমর্থ হই।

এদিনও ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দিনটি রোববার (ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক ছুটি) থাকায় ব্যাংকটির সঙ্গে কোনো প্রকারের যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে পুনরায় রেগুলার সার্ভার চালু করার চেষ্টা করা হয়। ওই দিন আনুমানিক সকাল ৮টায় সুইফট সিস্টেম চালু করা গেলেও আনুমানিক বেলা ১২টার সময় বার্তা পাঠানোর উপযোগী হয়। বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৪টার সময় সার্ভারের লগসমূহ পুনরায় পর্যালোচনা করে উক্ত ৪টি অনুমোদনহীন বার্তার ব্যাপারে কিছু তথ্য পাওয়া যায়, যার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যাংককে ‘স্টপ পেমেন্ট রিকয়েস্ট’ (টাকা ছাড় বন্ধের অনুরোধ) করা হয়।

এই ব্যাংকগুলো হলো- ১. যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক, ২. ফিলিপাইনের রিজাল কমার্সিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন, ৩. নিউইয়র্কের ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক মেলন, ৪. নিউইয়র্কের সিটি ব্যাংক এনএ, ৫. নিউইয়র্কের ওয়েলস ফার্গো ব্যাংক ও শ্রীলংকার প্যান এশিয়া ব্যাংকিং কর্পোরেশন।

প্রকৃতপক্ষে মোট চারটি বার্তার মাধ্যমে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক হতে রিজাল কমার্সিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনে মোট ৮১ মিলিয়ন এবং একটি বার্তার মাধ্যমে প্যান এশিয়া ব্যাংকিং কর্পোরেশনে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারসহ মোট ৫টি বার্তার মাধ্যমে ১০১ মিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যায়, যা মানিলন্ডারিং হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

৮ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক বিকাল ৫টা হতে ৬টার মধ্যে উক্ত ব্যাংকসমূহে ‘স্টপ পেমেন্ট রিকয়েস্ট’ পাঠানো হয়। একই দিন সুইফট কর্তৃপক্ষের কাছে অন সাইট সাপোর্ট (ঘটনাস্থলে সহযোগিতা) এবং অন সাইট ইনভেস্টিগেশনের (ঘটনাস্থলে তদন্ত) জন্য তাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে লোক পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়।