ব্রেকিং নিউজ

রাত ১২:৩০ ঢাকা, বৃহস্পতিবার  ২০শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

ফাইল ফটো

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার পেয়েছেন। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় সুদূরপ্রসারি পদক্ষেপের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) আজ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় দৃঢ় নেতৃত্বের জন্য পলিসি লিডারশীপ ক্যাটাগরিতে অন্যতম ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম ঘোষণা করেছে।
ইউএনইপি’র এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক কার্যালয়ের (আরওএপি) এক বিবৃতিতে আজ এ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিনিয়োগ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনের ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সম্মেলনের সমাপনীতে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই পুরস্কার গ্রহণ করবেন।
ইউএনইপি বলেছে, ‘প্রতিবেশগতভাবে ভঙ্গুর বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সামগ্রিক পদক্ষেপের স্বীকৃতি হচ্ছে এই পুরস্কার।’
চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ বার্ষিক সম্মাননা। পরিবেশ বিষয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এই সম্মাননা দেয় জাতিসংঘ।
পূর্ববর্তী পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নেতা-নেত্রীসহ মাঠপর্যায়ের কর্মীগণ রয়েছেন, যাঁদের নেতৃত্ব এবং কর্মকান্ড একটি টেকসই বিশ্ব সৃষ্টি এবং সবার জন্য মর্যাদাসম্পন্ন জীবনের কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য কাজ করেছে।
পলিসি, বিজ্ঞান, ব্যবসা এবং সুশীল সমাজ এই ৪টি ক্যাটাগরিতে এ পর্যন্ত ৬৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে। ১৫ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান ঘনবসতিপূর্ণ ও বিশ্বের অন্যতম স্বল্পোন্নত দেশ।
ইউএনইপি’র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি। সাইক্লোন, বন্যা এবং খরাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দীর্ঘকাল যাবত এদেশের ইতিহাসের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের দুর্যোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে।
বিবৃতিতে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক অচিম স্টেইনার বলেন, ‘বেশ কয়েকটি উদ্ভাবনমূলক নীতিগত পদক্ষেপ এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা বাংলাদেশ তার উন্নয়নের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কার্যক্রম থেকে শুরু করে প্রতিবেশ সংরক্ষণ আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের ফলে বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় অনেক বেশি প্রস্তুত।’
স্টেইনার বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনকে দেশে জাতীয় অগ্রাধিকার ইস্যু এবং একইসঙ্গে এ বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণে জোরালো ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নেতৃত্ব এবং দূরদৃষ্টি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছেন।’

তিনি বলেন, বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কয়েকদিনের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং ডিসেম্বরে প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলনের অংশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে কর্মসূচি গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কর্মসূচির অগ্রগামী বাস্তবায়নকারী এবং অভিযোজন নীতির স্বপক্ষের একজন বলিষ্ঠ প্রবক্তা হিসেবে শেখ হাসিনা অন্যদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।
পুরস্কারের মানপত্রে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটিজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্লান ২০০৯’-এর উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম উন্নয়নশীল দেশ যেখানে এ ধরণের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
ইউএনইপি বলেছে, বাংলাদেশ প্রথম দেশ হিসেবে নিজস্ব তহবিল দ্বারা ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করেছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ পর্যন্ত এ তহবিলে ৩০ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০১১ সালে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করা হয়। এই সংশোধনীতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে রাষ্ট্রকে সাংবিধানিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ইউএনইপি জানায়, সংবিধানে জলাভূমি এবং বণ্যপ্রাণী রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার গৃহীত বন নীতিমালা আবহাওয়ার বেশকিছু চরমভাবাপন্ন অবস্থার প্রতিকার হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি দেশে বনাঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত অভিযোজনে বস্তুগত এবং আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়াও সরকার ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মোকাবেলায় জনগণকে প্রস্তুতি গ্রহণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরো বলা হয়, এগুলোর মধ্যে বন্যাজনিত কারণে পানিবাহিত রোগ নিরাময়ে স্বাস্থ্যসেবা, আগাম সতর্কীকরণে কম্যুনিটি দল গঠন এবং পরিবেশ-বান্ধব কৃষি প্রযুক্তিতে উৎসাহ প্রদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইউএনইপি বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরকার দূষণমুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সোলার হোম সিস্টেম গড়ে উঠেছে যা গ্রিড বহির্ভূত এলাকার ১০ শতাংশ জনগণের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাচ্ছে। এছাড়া সরকার দেশের সবচেয়ে বৃহৎ গ্যাস নির্গমন উৎস – ইটভাটা থেকে গ্যাস নির্গমন হ্রাসের পদক্ষেপ নিয়েছে।
পরিবেশ, মানবস্বাস্থ্য রক্ষা এবং জীবিকা সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে জাহাজ-ভাঙা শিল্প যাতে উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশ বিনষ্ট না করতে পারে সেজন্য নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাহাজ ভাঙা শিল্পে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করে থাকে।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক রবার্ট ওয়াটকিনস বলেন, ‘বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবেলার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে অনুধাবন করতে পেরেছে।
তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ১৯৯০ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত বাংলাদেশ তার বার্ষিক জিডিপি’র ১.৮ শতাংশ হারিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব নিরসন শুধু অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, বরং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।’
চলতি বছরের এ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার পাওয়াদের মধ্যে রয়েছে-ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি (সাইন্স এন্ড ইনোভেশন), ব্রাজিলীয় কসমেটিক ফার্ম নাচুরা (এনট্রাপ্রিনিউরিয়াল ভিশন) ও দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লাক মামবা এন্টি পোচিং ইউনিট (ইন্সপাইরেশন এন্ড অ্যাকশন)।