ব্রেকিং নিউজ

রাত ২:২১ ঢাকা, রবিবার  ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

জনগণের নিরাপত্তা বিধানে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুন: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা বিধানে সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহবান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘জনগণের জান-মালের হেফাজত করা আপনাদের পবিত্র দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে আপনারা সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সাহসের সঙ্গে কাজ করবেন।’
সকলের সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রী- একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরমুক্ত আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দেশ গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্ব সভায় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করারও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে গাজীপুরের শফিপুর আনসার একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষাবাহিনীর ৩৬তম জাতীয় সমাবেশ উদ্বোধনী বক্তৃতা এবং দরবার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী আনসার-ভিডিপি একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছালে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান স্বরাষ্টমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন, সচিব মোজ্জামেল হক খান, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নাজিম উদ্দীন। প্রধানমন্ত্রীকে সশস্ত্র সালাম জানায় আনসার বাহিনীর একটি চৌকস দল। একটি খোলা জিপে করে তিনি প্যারেড পরিদর্শন করেন। এ সময় গ্যালারীতে আনসারের মহিলা সদস্যরা অনুপম ডিসপ্লে প্রদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রী কুচকাওয়াজের পর কৃতিত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আনসার সদস্যদের পদক পরিয়ে দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনে আনসার বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ বাহিনীর ৬৭০ জন সদস্য মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। একাত্তরে তাঁরা মুক্তিকামী জনগণের মধ্যে ৪০ হাজার অস্ত্র বিতরণ করেছেন। এ বাহিনীর ২০ জন বীর সদস্য বাংলাদেশের প্রথম সরকার মুজিবনগর সরকারের শপথের দিনে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। আমরা গভীর শ্রদ্ধাভরে তাদের স্মরণ করি।
শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফায় আনসার বাহিনীকে মিলিশিয়া বাহিনীর মর্যাদা দেয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। জাতির যেকোনো প্রয়োজনে আনসার বাহিনী সাহসকিতার সঙ্গে সাড়া দিয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের সরকার আনসার বাহিনীর সদস্যদের জন্য কর্তব্যরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে পাঁচ লাখ টাকার অনুদানের ব্যবস্থা করেছে। আহত হলেও অনুদানের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যাটালিয়ন আনসারদের পারিবারিক রেশনের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। মহিলা থানা প্রশিক্ষিকাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়েছে।
‘এই বাহিনীর কর্মকর্তারা সেনাবাহিনীর ট্রেনিং সেন্টার ছাড়াও বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। আমি জেনে আনন্দিত হয়েছি, ১৫টি ব্যাটালিয়ন সদরদপ্তরে উন্নয়ন কাজ এগিয়ে চলেছে।’
প্রধানমন্ত্রী দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, আমাদের সরকার সামগ্রিক উন্নয়ন বান্ধব সরকার। দেশীয় অর্থায়নে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ চলছে। কর্ণফুলী নদীতে টানেল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক উন্নয়ন ও ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন সড়ক বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কও চার লেন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে আজ মাথাপিছু আয় বেড়ে ১ হাজার ৩শ’ ১৬ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার কমেছে। বিশ্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতীয় আয়ে প্রবৃদ্ধি এখন সাড়ে ৬ দশমিক ৫৫ ভাগ। আমরা এই প্রবৃদ্ধি ৭ এ উন্নীত করার পদক্ষেপ নিয়েছি। দারিদ্র্যের হার বিএনপি আমলের ৪১ দশমিক ৫ ভাগ থেকে কমে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ৫ কোটি মানুষ নিম্ন-আয়ের স্তর থেকে মধ্যম আয়ের স্তরে উন্নীত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে দেড় কোটি মানুষের চাকুরি হয়েছে। রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি।
তিনি বলেন, সরকার এই সাত বছরে প্রায় একশ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৪ হাজার ৭৭ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। সরকার শিক্ষাকে সুলভ করার জন্য বিনামূল্যে বই বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১ জানুয়ারি ৩৩ কোটি ৩৭ লাখের বেশি বই বিতরণ করেছি। প্রাথমিক থেকে ডিগ্রী পর্যন্ত ১ কোটি ২৮ লাখ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি ও উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে তিনজনকে বাংলাদেশ আনসার পদক (সাহসিকতা), সাতজনকে প্রেসিডেন্ট আনসার পদক (সাহসিকতা), একজনকে মরনোত্তর বাংলাদেশ গ্রাম প্রতিরক্ষা দল পদক (সাহসিকতা), ছয়জনকে বাংলাদেশ গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (সেবা) পদক, ৩৭ জনকে প্রেসিডেন্ট আনসার (সেবা) পদক, ১৯ জনকে প্রেসিডেন্ট গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (সেবা) পদক প্রদান করা হয়। এছাড়া ২০১৪-১৫ বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অস্ত্র উদ্ধারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের স্বীকৃতি স্বরূপও আনসার সদস্যদেরও পুরস্কৃত করা হয়।
অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান আবু বেলাল মুহাম্মাদ শফিউল হক, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল আবু এসরার এবং নৌবাহিনী প্রধান ভাইস এডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহমেদ সহ বাংলাদেশ সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী,পুলিশের উর্ধ্বতন কমৃকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী জনগণের বাহিনী। দেশের সর্ববৃহৎ ও তৃণমূল বাহিনী হিসেবেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। অপারেশন রেলরক্ষা ছাড়াও, মহাসড়কে নাশকতা ঠেকাতে আনসার বাহিনীর ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। সম্প্রতি পৌরনির্বাচনসহ দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে আনসার বাহিনীর বিশাল পরিসরে উপস্থিতি বরাবরের মতই সকলের নজরে এসেছে। এ কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিএনপি’র জ্বালাও পোড়াও প্রতিহত করতে গিয়ে হতাহত আনসার পরিবারের সদস্যদের প্রতি তিনি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আনসার বাহিনী প্রতিষ্ঠালাভ করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইতিহাসের প্রায় সকল ক্রান্তিকালে অবদান রেখেছে এই বাহিনী। তাই ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা এবং ’৬২ সালে আওয়ামী লীগের ১১ দফায় আনসার বাহিনীকে মিলিশিয়া বাহিনীতে পরিণত করার অংগীকার ছিল। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত আনসারই ছিল এ অঞ্চলের একমাত্র স্বতন্ত্র বাহিনী।
জাতির প্রয়োজনে বরাবরই আনসার সদস্যদের সাহস, সততা ও একাগ্রতার জন্য প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল সদস্যকে বাংলার জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন,কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। মানুষ বিনামূল্যে ৩০ পদের ঔষধ পাচ্ছেন। ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ২০০ ধরণের ডিজিটাল সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ অনসারকে বাংলাদেশের সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডের অন্যতম অংশীদার উল্লেখ করে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে এবং গ্রাম পর্যায়ে সমবায় আন্দোলন জোরদার করতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী আনসার বাহিনীর পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উপভোগ করেন।