ব্রেকিং নিউজ

রাত ৪:০২ ঢাকা, বৃহস্পতিবার  ২০শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

ফাইল ফটো

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে বাংলাদেশে “‌জিরো টলারেন্স” নীতি

পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে “জিরো টলারেন্স” নীতি গ্রহণ করেছে।
কমনওয়েলথ্ উন্নয়ন মূল্যবোধ শীর্ষক বৈশি^ক উন্নয়ন ও চ্যালেঞ্জ এর আওতায় ‘সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ’-এর আলোচনায়
তিনি এ কথা বলেন।
কমনওয়েলথ্ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রী গতকাল ঢাকায় ফিরেছেন।
গত ২৭ থেকে ২৯ নভেম্বর মাল্টার রাজধানী ভ্যালেটায় কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের ২৪তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী। শীর্ষ সম্মেলনের বিষয়বস্তু ছিল ‘কমনয়েলথ: বৈশ্বিক মূল্যবোধ।
এই শীর্ষ সম্মেলনে কমনওয়েলথ্রে রাজনৈতিক মূল্যবোধ গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার সংরক্ষণ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং কমনওয়েলথ্ উন্নয়ন মূল্যবোধ যথা- টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা ২০৩০, টেকসই উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন, অভিবাসন; বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ যথা জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদসহ কমনওয়েলথ্ এর অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় ও এর কয়েকটি উদ্যোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়। এ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে ৩১জন রাষ্ট্র প্রধান ও সরকার প্রধান অংশগ্রহণ করেন।
শীর্ষ সম্মেলনের অব্যবহিত পূর্বে কমনওয়েলথ্ পররাষ্ট্র্র মন্ত্রীগণের দু’দিনব্যাপী প্রাক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে “জিরো টলারেন্স” নীতি গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে সুশীল সমাজ, গণ মাধ্যম ও ব্যক্তি খাতের উপদেশমূলক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অভিবাসন শীর্ষক আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অভিবাসী কর্মীরা শুধু স্বাগত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেই ভূমিকা রাখছে না বরং তাদের নিজ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অবদান রাখছে।
তিনি আরো উল্লেখ করেন সামগ্রিক অভিবাসন বিশেষত নারী অভিবাসন প্রক্রিয়া নিরাপদ করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন। ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন’ শীর্ষক আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক ও কারিগরী সহযোগিতা, সক্ষমতা অর্জন ও ঋণ মওকুফ প্রয়োজন। তিনি এ ক্ষেত্রে সরকারী, বেসরকারী, আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সকল উৎস হতে অর্থায়ন এবং ওডিএ এর অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন যে উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক অর্থায়ন এসডিজিএস বাস্তবায়নে গেম চেঞ্জার হিসেবে কাজ করতে পারে। স্বল্পোন্নত, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র, স্থলবেষ্টিত এবং আফ্রিকান দেশসমূহের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কমনওয়েলথ্ কর্তৃক নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া উচিত বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিমত ব্যক্ত করেন।
কমনওয়লথ্ শীর্ষ সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ দলিল যথা কমনওয়েলথ্ ইশতেহার, জলবায়ূ পরিবর্তন সম্পর্কে কমনওয়েলথ নেতাদের বিবৃতি এবং কমনওয়েলথভূক্ত দেশসমূহের সরকার প্রধানদের বিবৃতি গৃহীত হয়।
সরকার প্রধানগণ কমনওয়েলথ্ এর বিভিন্ন প্রাসঙ্গিকতাসহ বৈশি^ক, সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনাবলী বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অভিবাসন এবং সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। নেতৃবৃন্দ ইশতেহারে উল্লেখ করেন মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ কমনওয়েলথসহ বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি ব্যাপক হুমকি এবং তাঁরা যে কোন ধরনের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে নিন্দা জানান। সদস্য রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সক্ষমতা দৃঢ় করতে অভিবাসনের গুরুত্ব বিবেচনা করে নেতৃবৃন্দ নিরাপদ, নিয়মতান্ত্রিক ও নিয়মিত অভিবাসন প্রক্রিয়া এবং অভিবাসীদের মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রয়োজন বলে ইশতেহারে উল্লেখ করেন।
প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য কোপ২১ সম্মেলনে উপস্থাপনের লক্ষ্যে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানগণ জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত একটি শক্তিশালী যৌথ বিবৃতি/ঘোষণা চূড়ান্ত করেন। উক্ত বিবৃতিতে কমনওয়েলথ্ সরকার প্রধানরা কোপ২১ সম্মেলন হতে একটি উচ্চাকাঙ্খী, সমতাভিত্তিক, টেকসই এবং আইনগত বাধ্যবাধকতাসহ একটি চুক্তি সম্পাদনের উপর জোর দেন। তাঁরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রাক-শিল্পায়ন যুগের উষ্ণতার ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে আইনগত বাধ্যবাধকতার নির্দেশ থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তারা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির সম্মুখীন রাষ্ট্রসমূহের জন্য বাস্তবসম্মত ও জরুরীভিক্তিক অর্থায়নের সংস্থান রাখার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
কমনওয়েলথ্ বিজনেস ফোরাম আয়োজিত এশীয় দেশসমূহের মধ্যে সংযোগ: আঞ্চলিক সংহতি ও উন্নয়ন বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্ল্যানারীতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ’ বিষয়ে একটি মূল বক্তব্য প্রদান করেন। কমনওয়েলথ্ বিষয়ক ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুগো সয়ার-এর পরিচালনায় ভারত, নেপাল ও যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেলিস্টগণ এতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
এছাড়াও বিজনেস ফোরামের সাইডলাইনে বাংলাদেশে বৃহৎ প্রকল্পসমূহে ইউরোপসহ কমনওয়েলথ্ সদস্য রাষ্ট্রের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ কেন্দ্রিক একটি গোল টেবিল বৈঠক আয়োজন করা হয়। বিপুল সংখ্যক বিনিয়োগকারীর উপস্থিতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপ অথরিটি এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড এর নির্বাহী সদস্য এ ফোরামে বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
সম্মেলনে যোগদানের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধির সাথে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠক করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী কানাডার নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো-এর সাথে সাক্ষাত করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুভেচ্ছাবার্তা ও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেন এবং সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য যে, ১৩ বছর বয়সে তাঁর বাবা কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি বাংলাদেশের অভাবনীয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন স্বচোখে প্রত্যক্ষ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন।
এছাড়াও, পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাহমুদ আলীর সাথে এন্টিগুয়া ও বারবুডা-এর প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী, ব্রিটিশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মন্ত্রী, কানাডিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রী, বতসোয়ানার পররাষ্ট্র মন্ত্রী পৃথকভাবে সাক্ষাত করেন।
বৈঠকসমূহে কমনওয়েলথ্ ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ঘটনাবলী ছাড়াও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী ফিলিপ হামন্দ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারকরণ, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে যৌথভাবে কাজ করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে আশ^াস দান করেন। তিনি সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের “জিরো টলারেন্স” নীতির প্রশংসা করেন। ব্রিটিশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মন্ত্রী সৌজন্য সাক্ষাতে উল্লেখ করেন যে, তিনি একটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রতিনিধিসহ ২০১৬ সালের প্রথম কোয়ার্টারে বাংলাদেশ সফর করবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী নবনিযুক্ত কানাডিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রী স্টিফেন দিওনকে বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং বর্তমান সরকার কর্তৃক সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে দৃঢ় অবস্থানের বিষয়টি অবহিত করেন।
এ সম্মেলনে ডমিনিকান রিপাবলিক এর নাগরিক ব্যারোনেস প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ডকে কমনওয়েলথ্ এর নতুন মহাসচিব হিসাবে পরবর্র্তী চার বছরের জন্য নির্বাচিত করা হয়।
তিনি ৫৩ সদস্য বিশিষ্ট আন্ত:রাষ্ট্রীয় সংস্থার ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে কমনওয়েলথ্ এর ষষ্ঠ মহাসচিব-এর দায়িত্বভার নিতে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, প্যট্রিসিয়া আগামী ২০১৬ সালের এপ্রিলে বর্তমান মহাসচিব কমলেশ শর্মার স্থলাভিষিক্ত হবেন।