সরকার ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকার সঠিক পথেই এগুচ্ছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সোমবার বলেন, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ দারিদ্র দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটবে। বিশ্ব ব্যাংক কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেমবোন বলেছেন, প্রতি চারজনে একজন এখনো দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে।

অর্থমন্ত্রী রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ পোভার্টি অ্যাসেসমেন্ট: ফেসিং ওল্ড অ্যান্ড নিউ ফ্রন্টিয়ার্স ইন পোভার্টি রিডাকশন’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনের প্রকাশ অনুষ্ঠানে একথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের চরম দারিদ্রের হার ১০ শতাংশের কম। কিন্তু ১৯-২০ শতাংশ লোক দারিদ্র সীমার উপরে খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। এ ধরনের দরিদ্রদের ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার চলতি বছর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি সম্প্রসারিত করেছে। বিশেষ জনগোষ্ঠী ও শ্রেণীকে দারিদ্রের কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যার কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পায়নি। তাই, একজন মানুষের পক্ষেও দারিদ্র সীমার নিচে নামার কোন কারণ নেই। দেশের কর্মক্ষম মানুষের এই সুফল অব্যহত থাকবে।

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বনের সভাপতিত্বে পরিকল্পনা কমিশনের জেনারেল ইকোনোমিকস ডিভিশন (জিইডি)’র সদস্য ড. শামসুল আলম, স্ট্যাটিস্টিকস অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের কিশোর কুমার দাস এবং বিশ্বব্যাংকের পোভারটি অ্যান্ড ইকুয়ালিটি অব গ্লোবাল প্র্যাক্টিস এর গ্লোবাল ডিরেক্টর সানচেজ পারামো বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মারিয়া জেনোনি দারিদ্র নিরুপণের উপর একটি পাওয়ার পয়েন্টে প্রেজেন্টেশন করেন।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ দারিদ্র দূরীকরণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। শ্রমিকদের আয়ের কারণেই মূলত এটা সম্ভব হয়েছে। ২০১০-২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ লোক দরিদ্রতা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশব্যাপীই দারিদ্র হ্রাস হয়েছে।

একই সময়ে দেশের গ্রাম অঞ্চলে দারিদ্র্য প্রায় ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। শহরাঞ্চলে দারিদ্র্য হ্রাসের হার সামান্যই এবং এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক অতিদরিদ্র। দারিদ্র্য হ্রাসের এই অবস্থা জাতীয় অগ্রগতিকে বিলম্বিত করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্প ও সেবা, অকৃষি প্রধানত গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য হ্রাসে মূল ভূমিকা রাখছে। কৃষি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে এবং আগের তুলনায় দারিদ্র্য দূরীকরণে কম ভূমিকা রাখছে। শহরাঞ্চলে তৈরি খাত বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টর দারিদ্র্য হ্রাসে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে। এছাড়া সার্ভিস সেক্টরের আত্মকর্মস্থান সৃষ্টিকারীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। যা শহরাঞ্চলে দারিদ্র্য হ্রাসকে বাধাগ্রস্ত করছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে সরকার সঠিক পথে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যে সংখ্যা বিশ্ব ব্যাংক দিয়েছে তা তিন বছরের পুরানো এবং এই সংখ্যা হালনাগাদ করা হলে আপনারা আমাদের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাবেন। আমরা একটা বিষয়ে বিশ্বাস করি যে, দ্রুত দারিদ্র্য হ্রাসের পথে এগিয়ে যাওয়ার মূল বিষয় হচ্ছে ‘প্রবৃদ্ধি’।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে টেকসই ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নেয়া, আর এই প্রবৃদ্ধি হতে হবে গুণমানভিত্তিক, কারণ তা সকলকে স্পর্শ করে এবং সকলকে অর্থনীতির মূলস্রোতে নিয়ে আসতে হবে।

কামাল ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থান ও প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং দেশ ইতোমধ্যে তাই করছে।

অর্থমন্ত্রী সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে বলেন, এগুলো এক সময় চালু হবে এবং আগামী ১০ বছরে প্রায় এক কোটি লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালনাগাদ প্রবৃদ্ধির হার দুই অংকে পৌঁছবে, ২০২৮ সালনাগাদ বিশ্বে ২৭তম অর্থনীতির দেশ হবে এবং ২০৪১ সালনাগাদ বাংলাদেশ বিশ্ব শীর্ষ ২০টি উন্নত অর্থনীতির দেশের অন্তর্ভুক্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জিইডি সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, সরকারের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে চাকরির সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূল করা।

বিশ্ব ব্যাংক কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেমবোন বলেন, বাংলাদেশ গত দশ বছরে দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, ‘তা সত্ত্বেও এখানে প্রতি চারজনে একজন এখনো দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে। দেশকে বিশেষ করে দারিদ্র্যের নতুন দিকগুলো মোকাবেলায় অনেক কিছু করা প্রয়োজন।’