ব্রেকিং নিউজ

বিকাল ৩:৪৬ ঢাকা, মঙ্গলবার  ১৬ই অক্টোবর ২০১৮ ইং

ঘোষণা দিয়ে নারীর আত্মহত্যা

শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঘোষণা দিয়ে এক নারী আত্মহত্যা করলো। ২৯ বছর বয়সী ওই নারীর আত্মহত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে। ব্রেইন ক্যান্সার ধরা পড়ার পরে  ইউটিউবে আত্মহত্যার ঘোষণা দিলে এ নিয়ে  বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।  আত্মহত্যার এই ঘোষণাকে সমর্থন  দিয়ে  লাখ লাখ মানুষ অপেক্ষায় ছিল তার এই মৃর্ত্যুর  দিনটির জন্য।

বাবা-মার একমাত্র আদরের মেয়ে ২৯ বছর বয়সের  ব্রিটানী মেনার্ড  তার পোর্টল্যান্ডের বাড়িতে মা, স্বামী, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের সামনেই চিকিৎসকের দেয়া বিষাক্ত ইনজেকশনে জীবনের ইতি ঘটান। আরোগ্য অযোগ্য কোনো মানুষের স্বেচ্ছামৃর্ত্যু বা আত্মহত্যাকে বলা হয়  ডেথ উইথ ডিগনিটি। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি স্টেটে এ ধরণের মৃর্ত্যু বা আত্মহত্যার বিধান রয়েছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ব্রিটানীর ব্রেইন ক্যান্সার ধরা পড়ে। কোনও চিকিৎসাতেই তার ক্যান্সারের কোনো উন্নতির লক্ষন দেখা যাচ্ছিল না। প্রতিদিনই তাকে যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে কাটাতে হচ্ছিল। ব্রিটানী ৪র্থ স্তরের ম্যালিগনেন্ট ব্রেইন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিল। বাধ্য হয়েই চলতি বছরের মাঝামাঝি সে নিজেকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। তার এই সিদ্ধান্তের কথা একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ইউটিউবে প্রকাশ করে । এটি প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় এক কোটি মানুষ তার এই ভিডিওবার্তা দেখে। ব্রিটানী হয়ে উঠে পাবলিক ফিগার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তার মুত্যুর জন্য শুভ কামনা আসতে থাকে। ক্যালিফোর্নিয়াতে স্বেচ্ছা মৃত্যুর কোনও আইন না থাকায় পরিবারসহ চলে যায় ওরেগন রাজ্যে।

ওই ভিডিও বার্তায় ব্রিটানী জানায় তার কষ্টের কথা , অসুস্থতার কথা। কিভাবে সে দিন দিন আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়ছে, নিজের জন্য অন্যকে কষ্ট করতে হচ্ছে। কিন্তু চলে যেতে চাইলেই চলে যাওয়া যায় না। তার জন্য চাই পরিবেশ, আইন এবং সময়। তাই  যেখানে আইন আছে স্বেচ্ছা মৃত্যুর, সেখানে চলে যাওয়া। ওরেগন রাজ্যের আইন অনুয়ায়ী স্বেচ্ছা মৃত্যুকে বলা হয় ‘ডেথ উইথ ডিগনিটি।’

আগে থেকেই ১ নভেম্বর চুড়ান্ত মৃত্যুর দিন ধার্য করা হয়। চিকিৎসক, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা তাকে আত্মহত্যার বা স্বেচ্ছা মৃত্যুর অনুমতি দিয়েছিল। স্বামী ড্যান ডিয়াজের সাথে গত সপ্তাহে গ্রান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কে গিয়েছিল শেষবারের মতো প্রকৃতি দেখতে। ঘুরে এসে সে তার ব্লগে লিখেছে  গ্রান্ড ক্যানিয়ন খুবই সুন্দর জায়গা। আমার খুব ভাল লেগেছে। আমি সত্যিই আমার পরিবার এবং প্রকৃতিকে ভালবাসি। মৃর্ত্যুর আগে এই গ্রান্ড ক্যানিয়ন দেখাই ছিল তার শেষ ইচ্ছা।

এপ্রিলে যখন সে বুঝতে পারে তার আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই। তখন সে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লিখেছে ” এটা খুবই ভয়ংকর মৃত্যুযাত্রা।’
‘কম্প্যাশন এ্যান্ড চয়েজেজ’ নামের একটি সংগঠন ব্রিটানীর স্বেচ্ছা মৃত্যুর জন্য সব ধরনের আইনী সহায়তা দিয়েছে। এই সংগঠন সারা আমেরিকাতে ‘ ডেথ উইথ ডিগনিটি’ আইন পাশ করার জন্য আন্দোলন করছে।  ব্রিটানীর এই আত্মহত্যার মধ্যদিয়ে যেনো এই আন্দোলন জোরদার হয় সেই চেষ্টাও তারা করছে। যদিও ব্রিটানী এ বছরের মাঝামাঝি একবার নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবার বা  স্বেচ্ছা আত্মহত্যার ঘোষনা দিয়েছিলেন।  সেটা পিছিয়ে যায় কোনো কারণে। পরে আবারও ১ নভেম্বর  স্বেচ্ছা মৃর্ত্যুর দিন  চুড়ান্ত করে নতুন ভিডিও বার্তায় জানায়, মৃত্যুর জন্য সে সব প্রস্তুতি শেষ করে ফেলেছে। ওই ভিডিও বার্তায় সে জানায়, আমি পূর্বেও ঘোষিত সময়ে ‘ ডেথ উইথ ডিগনিটি’ গ্রহণ করিনি বলে অনেকেই টিপ্পনি  কেটেছে।

‘কম্প্যাশন এ্যান্ড চয়েজেজ’ জানিয়েছে, ১৭ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা, নিউ মেঙিকো, ভারমন্ট, ওয়াশিংটন এবং ওরেগন রাজ্যে ‘ডেথ উইথ ডিগনিটি’ আইন পাশ হলেও বিট্রানীর স্বেচ্ছা মৃত্যুর ইচ্ছাই হচ্ছে ওরেগন তথা সারা আমেরিকাতে ‘এ্যান্ড অব লাইফ’ বা ‘ ডেথ উইথ ডিগনিটি’ পাবার প্রথম আবেদন।  ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, নিউজার্সি ম্যাসাচুসেটস এবং কানেক্টিকাটে এই আইন পাশের জন্য ক্যাম্পেইন চলছে।

ব্রিটানী ‘কম্প্যাশন এ্যান্ড চয়েজেজ’ এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছে, যেদিন আমেরিকার প্রতিটি অসুস্থ মানুষ তার স্বেচ্ছা মৃর্ত্যুর অধিকার পাবে সেদিন তার স্বপ্ন পুরণ হবে।

মৃর্ত্যুর তারিখ ঠিক করার পরপরই সবার উদ্দেশ্যে ব্রিটানী একটি নোট লিখেছিল, তার সারমর্ম হচ্ছে ”আমার মা খুব শিগগিরই তার একমাত্র মেয়েকে হারাবে। আমি জানি কোনো মা চায় না তার সন্তানের লাশ দেখতে।  আমি এই ক্যাম্পেইন  কোনো প্রচারের জন্য করছি না। কিন্তু আমি চাই প্রতিটি আমেরিকানই যেনো ‘ ডেথ উইথ ডিগনিটি পাবার অধিকার পায়।  আমি খুবই লাকি যে, আমাকে আমার মা, বন্ধুরা, প্রতিবেশিরা, এবং আমার স্বামী খুবই ভালবাসে। কিন্তু তারপরও আমার যাবার সময় খুব কাছে চলে এসেছে। আমার এই যাত্রা খুবই চ্যালেঞ্জিং।

মেয়ের এই অবস্থায় তার মা ডেবি বলেছেন, ও আমার একমাত্র সন্তান। ওর কষ্ট আমি সইতে পারছি না। ওকে চলে যেতে হবে ভাবতেই আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।

এদিকে ‘দ্যা ব্রিটানী ফান্ড’ নামে একটি ফান্ড রাইজিং ক্যাম্পেইন শুরু করেছে কম্প্যাশন এ্যান্ড চেয়েজজ। যেখানে লাখ লাখ মানুষ ডোনেশন দিচ্ছে, ‘ডেথ উইথ ডিগনিটি ‘আইন সারা আমেরিকাতে বাস্তবায়নের আন্দোলন জোরদার করার জন্য।

এদিকে ব্রিটানীর মৃর্ত্যুর জন্য শুভ কামনা করে তাকে লাখো ভক্ত শুভেচ্ছা জানিয়েছে। একই সাথে অনেকেই  চেয়েছিল, সে  যেনো তার  আত্মহত্যার ঘোষণা প্রত্যাহার করে। কিন্তু সে কারো অনুরোধ আর রাখেনি। সবাইকে কাঁদিয়ে   বাড়িতে নিজের পছন্দ করা হুলুদ রংয়ে আঁকা তার থাকার ঘরেই জীবনের পথ থামিয়ে দিয়েছেন। পরে তার দেহ সমাধিস্ত করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে পোর্টল্যান্ডের ছোট্ট একটি গ্রামের কবরস্থানে।

তার এই মৃর্ত্যু নিয়ে এখন বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ এত কম বয়সে তার চলে যাওয়া সম্ভব ছিল না, যদি না যুক্তরাষ্ট্রে ‘ডেথ উইথ ডিগনিটি’ আইন না থাকতো। তবে এই আইন একজন বয়স্ক মানুষ যিনি মৃর্ত্যুর সমতুল্য অসুস্থ , তার জন্য প্রযোজ্য হতে পারে বলে অনেকেই মত দিয়েছেন।  প্রিন্সটন , নিউজার্সির পেসেন্টস রাইটস এ্যাকশন এর- টিম রোজালী এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, এই মৃর্ত্যুর কারণে সারা আমেরিকাতে যুবক-যুবতী যারা শারীরিক বা মানসিক জটিল রোগে ভূগছে তারা এ্যান্ড অব লাইফ বা’ডেথ উইথ ডিগনিটি’ আইনের আওতায়  আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে।   যেটা সমাজে ভয়ঙ্কর কুপ্রভাব ফেলবে।  অনেক সমাজ বিজ্ঞানী চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং ইন্সুরেন্স কোম্পানীগুলোর সমালোচনা করেছেন।

ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে মাষ্টার্স করা পশুপ্রেমিক হিসেবে পরিচিত ব্রিটানী মৃর্ত্যুর আগে শেষবারের মতো সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলে গেছে, ”আমি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে  গেলাম। এই পৃথিবী এবং মানুষের প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই। সবার প্রতি আমার অকৃত্রিম ভালবাসা ও শান্তির বাণী রইল।”