ব্রেকিং নিউজ

বিকাল ৪:৫৭ ঢাকা, রবিবার  ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

মপি লিটন
এমপি লিটনের স্ত্রী ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি

গোলাম আজমের দোসররাই আমার স্বামীকে হত্যা করেছে, – এমপি লিটনের স্ত্রী

গোলাম আজমের দোসর জামায়াত-শিবিরের খুনিরাই এমপি লিটনকে হত্যা করেছে বলে দাবি করেছেন নিহত এমপি লিটনের শোকার্ত অসুস্থ স্ত্রী ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি।

মঙ্গলবার বাড়ির সামনের এমপি লিটনের স্ত্রী ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি সাংবাদিকদেরকে তার স্বামীর হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতি সম্পর্কে বিবরণ তুলে ধরে এক সাক্ষাতকারে এ দাবি করেন।

স্মৃতি জানান, বিগত ১৯৯৮ সালের ২৬ জুন সুন্দরগঞ্জ ডি ডব্লিউ ডিগ্রি কলেজ মাঠে জামায়াত-শিবির আয়োজিত জনসভায় গোলাম আজমের বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল। সে সময় স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের এই সভা পণ্ড করে দিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ লিটন তার লাইসেন্সধারী বন্দুক হাতে কর্মী সমর্থকদের নিয়ে ওই জনসভায় প্রবেশ করে গোলাম আজমকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়েন। এতে জনসভাটি পণ্ড হয়ে যায়। ফলে সেই থেকে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার বাহিনী লিটনকে যে কোন মূল্যে হত্যার টার্গেট করে রেখেছিল। সেসময় তার গুলিতে আহত জামায়াতের ফতেখাঁ গ্রামের ক্যাডার হেফজসহ আরো দুর্ধর্ষ জামায়াত ক্যাডাররা লিটনকে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠিয়ে এবং মোবাইল করে দীর্ঘদিন থেকেই হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। লিটনকে ৩১ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় গুলি করে এই নির্মম হত্যা তারই জের বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ওই গোলাম আজমের দোসর জামায়াত-শিবিরের খুনিরাই তার স্বামীকে হত্যা করেছে। তিনি মর্মান্তিক এই হত্যার বিচার চান এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর ভোরে শিশু শাহাদত হোসেন সৌরভকে গুলি ছোঁড়ার একটি পরিকল্পিত মিথ্যা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমপি লিটনের লাইসেন্সকৃত রিভলবার ও শর্টগান জব্দ করে নেয়া হয়। খুনি জামায়াত-শিবির চক্র জানতো তার বাড়িতে তাদের প্রতিরোধ করার মতো কোন অস্ত্র এখন আর নেই। সেই সুযোগে বাড়িতে এসে পরিকল্পিতভাবে খুনিরা তাকে হত্যা করতে সাহসী পেয়েছে বলে স্মৃতি মনে করেন।

তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন বিকেলে অনেক নেতাকর্মী বাড়িতে থাকতো। এছাড়া তার বাড়িতে পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা ছিল রাতে। সাধারণত সন্ধ্যার আগেই নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এমপি লিটন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বামনডাঙ্গা রেল স্টেশন সংলগ্ন তার অফিসে গিয়ে বসেন এবং রাত ৯টা থেকে ১০টা অবধি সেখানে থাকেন। কিন্তু কেন জানিনা সেদিন কোন নেতাকর্মী তার বাড়িতে ছিল না। বাড়িতে শুধু তিনি, তার ভাই সৈয়দ বেদারুল ইসলাম বেতার, ভাগ্নি মারুফা সুলতানা শিমু, চাচি শামীম আরা স্মৃতি এবং বাড়ির কেয়ারটেকার ইসমাইল, ইউসুফ ও সৌমিত্র ছিল। এসময় তিনি ও তার ভাই বাড়ির উঠানের রান্না ঘরের কাছে ছিলেন। সেসময় গুলির শব্দ শুনতে পান এবং লিটন ঘর থেকে বাড়ির ভেতর দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে বলেন ওরা আমাকে গুলি করেছে, আগে ওদের ধরো। এসময় তিনি বুকে হাত দিয়ে ছিল এবং বুকের বাম পাশ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। বাড়ির সামনে ড্রাইভার এমপির চিৎকার শুনে এবং আততায়ীদের ছুটতে দেখে গাড়ি নিয়েই তাদের ধাওয়া করেন। আহত লিটনকে সঙ্গে নিয়ে স্মৃতি, ইসমাইল ও বেতার গাবগাছ তলায় বেরিয়ে আসেন। সেসময় আহত লিটন দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছিল না। ড্রাইভার ও গাড়ি না থাকায় একটি মোটরসাইকেলের মাঝখানে বসিয়ে আহত লিটনের কথামত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এসময় ড্রাইভার এসে পড়লে সেই গাড়িতে করেই প্রতিবেশী নয়ন ও রেজাউল এবং বেতারসহ এমপি লিটনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, সুন্দরগঞ্জে দলীয় কোন কোন্দল নেই। লিটন এমপি হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তবে তার একমাত্র শত্রুছিল স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবির চক্র। যাকে তিনি আওয়ামী লীগের আদর্শে অনুপ্রাণিত রাজনীতিতে কোণঠাসা করে ফেলেছিলেন। যার প্রতিশোধ তারা এই ত্যাগী নেতার রক্ত ঝরিয়ে নিয়েছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এমপির শ্যালক সৈয়দ বেদারুল ইসলাম বেতার বলেন, যে দু’জন খুনি লিটনের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানিয়ে তার সঙ্গে ঘরে ঢোকেন তারা গিয়ে সামনের সোফায় বসে পড়েন। খুনি দু’জনার মুখ খোলা থাকলেও মাথা ও কান মাফলারে পেচানো ছিল এবং তাদের পরণে ছিল কালো জ্যাকেট ও কালো প্যান্ট। তারা বহিরাগত ছিল না, কারণ তারা গাইবান্ধা এলাকার আঞ্চলিক ভাষা দিয়ে কথা বলছিল। তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, গুরুতর আহত লিটনকে নিয়ে যখন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাচ্ছিলেন তখন তার শেষ দুটো কথা ছিল, তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। তার অক্সিজেন দরকার। এরপর তিনি চিৎকার করে স্ত্রী স্মৃতিকে বলেন, স্মৃতি হাসপাতাল আর কতদুর। এটাই তার শেষ কথা। এরপর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

উল্লেখ্য, এমপি লিটন গত শনিবার সন্ধ্যায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের সাহাবাজ গ্রামে নিজ বাসভবনে দুর্বৃত্তদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন এবং রংপুর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। লিটনের মরদেহ জানাজা শেষে সোমবার বিকেল ৫টার কিছু আগে সুন্দরগঞ্জের সর্বানন্দ ইউনিয়নের শাহাবাজ গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে শেষ শয্যায় শায়িত করা হয়।