ব্রেকিং নিউজ

রাত ৪:৪৭ ঢাকা, রবিবার  ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

খেলাপিঋণ: প্রভিশন সংরক্ষণ: কমে যাচ্ছে ব্যাংকের মুনাফা

ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতায় খেলাপিঋণ বেড়ে গেছে। এর বিপরীতে বর্ধিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি কমে যাচ্ছে ঋণপ্রবাহ। তাতে পরিচালন ব্যয় ক্ষেত্র বিশেষে বেড়ে যাচ্ছে। সবমিলে প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের নিট আয়ে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এক দিকে ব্যাংকের ঋণ আদায় কমে যাচ্ছে, অপর দিকে নতুন করে কেউ ঋণ নিচ্ছেন না। বিনিয়োগ স্থবিরতায় ব্যাংকের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে; কিন্তু পরিচালন ব্যয় কমছে না, বরং দিন দিন বেড়ে চলছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতাদি বৃদ্ধিসহ অফিস ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন সেবা বিল বাড়ছে।কমে যাচ্ছে ব্যাংকের মুনাফা। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ব্যাংকিং খাতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপিঋণ বেড়ে হয়েছে ৫৭ হাজার কোটি টাকা। আগামী ডিসেম্বর প্রান্তিকে আরো বেড়ে যাওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে মাসভিত্তিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে খেলাপিঋণ আরো বেড়ে যাবে। এ মুহূর্তে ব্যাংকের আগের বছরের মুনাফা ধরে রাখা দুষ্কর হয়ে পড়বে। বলা যায়, বেশির ভাগ ব্যাংকেরই মুনাফা কমে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বেশির ভাগ ব্যাংকই এখন অনেকটা জোরাতালি দিয়ে মুনাফা করার চেষ্টা করছে। এতে কেউ কেউ মুনাফা স্ফীত করার কৌশল অবলম্বন করছে। খেলাপিঋণ কম দেখিয়ে, বা প্রভিশন সংরক্ষণ কম করে মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আগের বছরেও একই পরিস্থিতি হয়েছিল। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবার অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মুনাফা স্ফীত করতে না পারে সেজন্য আগে থেকেই সতর্ক রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য ১০ থেকে ১২টি টিম মাঠে কাজ করবে। খেলাপিঋণ গোপন করে অথবা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মুনাফা দেখিয়ে বিশেষ সুবিধা নেয়া ঠেকাতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, অতিরিক্ত মুনাফা দেখালে কয়েকটি ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব পড়ে। প্রথমত বেশি মুনাফা করলে পুঁজিবাজারের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শেয়ারের দর চাঙ্গা হয়। এতে প্রতারিত হয় সাধারণ গ্রাহক। অপর দিকে, আমানতকারীরাও প্রবঞ্চনার শিকার হন। আর এর সরাসরি সুবিধাভোগী হন ব্যাংক পরিচালকেরা। অতীতে প্রকৃত খেলাপিঋণ গোপন করাসহ নানা কারসাজির আশ্রয় নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার প্রমাণ পেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার অর্থনৈতিক মন্দা ও ব্যাংকগুলোর তীব্রতারল্য সঙ্কটসহ খেলাপিঋণ বেড়ে যাওয়ার পরেও বেশির ভাগ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা গত বছরের চেয়ে বেশি হওয়ায় পরিপ্রেক্ষিতে মুনাফা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা অনুসারে একটি ব্যাংকের খেলাপিঋণ যত বেশি থাকে ওই ব্যাংকের নিট বা প্রকৃত মুনাফা তত কমে যায়। কারণ খেলাপিঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। তিন ধরনের খেলাপিঋণ আছে। প্রথমত নিম্নমান হলে ওই ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক হলে ওই ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণ হলে ওই ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন করে এমন ১২টি ব্যাংককে চিহ্নিত করেছিল। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে দেখতে পায় আলোচ্য ব্যাংকগুলো প্রকৃত খেলাপিঋণকে গোপন করে তা নিয়মিত দেখিয়েছিল। এর ফলে খেলাপিঋণ দেখালে যেখানে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হতো, নিয়মিত দেখানোর ফলে ওই ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়নি। এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের প্রকৃত মুনাফা বেশি দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তাদের আর্থিক বিবরণী দাখিল করেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিষয়টি চিহ্নিত হওয়ার পর ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। গত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকেই এবার বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মুনাফা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি বছরজুড়েই ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাবে বিনিয়োগ স্থবির ছিল। এ পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর মুনাফায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কেউ মুনাফা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখার সুযোগ নেই। যদি কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে এর দায় ওই ব্যাংককেই বহন করতে হবে।

Like & share করে অন্যকে দেখার সুযোগ দিন