ব্রেকিং নিউজ

রাত ১:৪৯ ঢাকা, সোমবার  ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

‘ক্ষমতাসীনদের বিজয়ী করতে ইসি’র মহাপরিকল্পনার চিত্র তুলে ধরে বিএনপি’

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ইউপি নির্বাচনের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে বলেছেন, ক্ষমতাসীনদের বিজয়ী করতেই পূর্বেই মহাপরিকল্পনা করে রেখেছিল ইসি। সেই মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী কমিশন সবকিছু বাস্তবায়ন করেছে। তিনি অবিলম্বে ভোট ডাকাতির (তার ভাষায়) নির্বাচন বাতিল ও  নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ দাবি করেন।

আজ দুপরে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন রিজভী।

রিজভী বলেন, গত ২২ মার্চ প্রথম দফায় ৭১২টি এবং ৩১ মার্চ দ্বিতীয় দফায় ৬৩৯টি ইউপি নির্বাচনে গণহারে কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, ভোট ডাকাতি, বিএনপির প্রার্থীদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে আওয়ামী সন্ত্রাসী, পুলিশ ও প্রিসাইডিং অফিসাররা মিলে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে ক্ষমতাসীনদের বিজয়ী করতে জালভোটের উৎসব করেছে। বিএনপি ও সাধারণ জনগণ ভোট ডাকাতিতে বাধা দিলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর গুলি চালিয়েছে এবং সশস্ত্র অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষনার পর ১ম দফা নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় পুলিশ, বিজেপি ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলি ও হামলায় প্রাণ হারিয়েছে ২৮ জন। ২য় দফায় নির্বাচনের দিন আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে শিশু, ঢাবির ছাত্র ও মহিলাসহ ১১ জন। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে আরও ৩ জন। গতকালও মাদারীপুর ও যশোরে ২জন নিহত হয়েছে। ১ম ও ২য় দফা নির্বাচনে সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে এ পর্যন্তু ৪২ জন। আহত ও পঙ্গু হয়েছে সহস্রাধিক মানুষ। বিএনপি প্রার্থী ও সমর্থকদের শত শত বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এখনও দেশজুড়ে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ও তান্ডবে দেশজুড়ে ভয়াবহ আতংক বিরাজ করছে।

রিজভী বলেন, প্রথম দফার ৭১২টি ইউপি নির্বাচনে দেশব্যাপি কেন্দ্র দখল করে ভোট ডাকাতির সহিংস তান্ডব লীলা চালানো হয়েছে। ভোটের আগেই পুলিশ, আওয়ামী সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র মহড়া দিয়ে এলাকায় এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। বিএনপি নেতা-কর্মী এবং নির্বাচনী এজেন্টদের এবং সাধারন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা হুমকি ধামকি দিয়ে বলে ভোট কেন্দ্রে গেলে তাদের লাশ ফেলে দেয়া হবে। অনেক জায়গায় ভোটের আগের রাতেই আওয়ামী সন্ত্রাসীরা প্রশাসনের সহযোগিতায় ভোট কেন্দ্র দখল করে নৌকায় সীল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে রাখে। বাকী নির্বাচনী এলাকা গুলোতে ভোটের দিন সকালে আওয়ামী সন্ত্রাসী ও প্রশাসনের লোকজন মিলে বিএনপি প্রার্থীদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে জালভোটের মহোৎসব করে।

রিজভী বলেন, দু’দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই সরকারি দলের ভোট ডাকাতি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায়। নির্বাচন কমিশন ইউপি নির্বাচন নিয়ে রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠেছে। তারা ভোট ও ভোটারদের রক্ষক না হয়ে ভক্ষক হয়ে নিজেরাই জাল ভোটের উৎসবে মেতে ওঠেছে। অনেক কেন্দ্রে দেখা গেছে প্রিসাইডিং অফিসাররা ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে দিচ্ছে। অনেক কেন্দ্রে পুলিশকে ভোট দিতে দেখা গেছে। এমন চিত্র মিডিয়ার বদৌলতে জাতি দেখতে পেয়েছে। নির্বাচনী কর্মকর্তা, পুলিশ ও আইন-শৃঙখলা বাহিনী এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ভোট তান্ডবে গোটা জাতি হতাশ হয়ে পড়ছে। হতভম্ভ হয়ে পড়েছেন দেশের নাগরিক সমাজ। নৃশংস রক্তপাতের উপর ভিত্তি করে জালিয়াতি ও জোচ্চুরির এমন নির্বাচনে ভোটারবিহীন সরকার ও তাদের আজ্ঞাবহ ইসি কি ন্যুনতম লজ্জা পান না? ভোটের নামে নিষ্ঠুর তামাশা আওয়ামী লীগেরই ঐতিহ্য, তাই তারা লজ্জা পান না। আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন লজ্জায় নাকি বিএনপি নির্বাচন ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমি বলি যারা মানুষের জীবন নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধি করে, যারা রক্তপাত ঘটিয়ে হোলির উৎসবের ন্যায় খেলা করে, যারা মানুষের লাশের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে অবৈধ ক্ষমতাকে ধরে রাখতে চায়, তারাতো সহিংস রক্তপাত আর হত্যাকে নিয়ে নিষ্ঠুর রসিকতা করতেই পারে। রাজনৈতিক স্বার্থে মানুষকে আঘাত করে মুখ থুবড়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে লাশ বানিয়ে তাদের খুশির তুফান ছুটে। এরা একদিকে যেমন নিষ্ঠুর রসিক অন্যদিকে মূর্খ দাম্ভিক, দর্পি অবিমৃশ্যকারী।

রিজভী বলেন, ধারাবাহিকভাবে সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট সন্ত্রাসের সহযোগিতাকারী হিসেবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন এখন একটি নিথর নিস্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ায় দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এখন অভিভাবকহীন। তাই জনগনের ভোটাধিকার, নির্বাচন এখন এদেশে এতিম হয়ে পড়েছে। শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দল নয় দেশের সুশিল সমাজও এ নির্বাচন কমিশনকে সরে যেতে বলেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাদের লজ্জার ভূষণ যাদুঘরে জমা দিয়ে দিয়েছেন।

রিজভী বলেন, ১ম ও ২য় দফায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিএনপি বার বার নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছে। শাসক দল দেশজুড়ে তান্ডব চালাচ্ছে। অনেক জায়গায় আমাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়নি। জোর করে, হামলা করে অস্ত্রের মুখে মনোনয়নপত্র কেড়ে নিয়েছে। এমনকি নির্বাচন কমিশন ঠুনকো অজুহাতে বহু জায়গায় আমাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করে দিয়েছে। এখন চলছে ভোট ডাকাতি, কোথাও কোথাও আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ রয়েছে। ভোটের দিন বিএনপির এজেন্টরা যাতে ভোট কেন্দ্রে না যায় সেজন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকির পাশাপাশি গ্রেফতার ও হয়রানি চলছে। ভোটের দিন কেন্দ্র দখল করে চলে নৌকায় সিল মারার মহোৎসব। সবকিছুই চলে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায়। এই ইসি গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়ে ক্ষমতাসীনদের বিজয়ী করতেই পূর্বেই মহাপরিকল্পনা করে রেখেছিল। সেই মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী কমিশন সবকিছু বাস্তবায়ন করেছে। ইউপি নির্বাচন নিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ছত্রছায়ায় সরকারি দলের গুন্ডারা মানুষ হত্যা করে, বিএনপি প্রার্থী ও সমর্থকদের গুলি করে, হামলা করে,ভোটারদেরবাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ করে দেশজুড়ে যে পৈশাচিক তান্ডবলীলা চালাচ্ছে এর সবকিছুর জন্য নির্বাচন কমিশন দায়ী। আজ্ঞাবাহী বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সকল নির্বাচন জনগন ঘৃনাভরে প্রত্যাখান করেছে। আমি বিএনপির পক্ষ থেকে অবিলম্বে ভোট ডাকাতির নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়ে আবারও নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ দাবি করছি।

আজকের ওই সংবাদ সম্মেলনে দু’ দফার নির্বাচনে সহিংসতায় ৪২ জনের মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরা হলেও তা নিয়ে ভিন্ন মত আছে, কেননা প্রথম দফা নির্বাচনের পরে মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে ১২ জনের মৃত্যু দাবি করেছিলেন। যদিও সাংবাদিক হিসাবে আমাদের কাছে ১১ জনের মৃত্যুর খবর ছিল। দ্বিতীয় দফায় বিচ্ছিন্ন ঘটনায় ৩ জন সহ-আরও ১০ জনের মৃত্যু ঘটে। এছাড়া নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় ও আহতদের মধ্য থেকে খুব বেশি হলে ৩/৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে। সর্বসাকুল্যে এর সংখ্যা ২৫/ ২৬ জনের বেশি হবে না। আমাদের ধারণা সংবাদ সম্মেলনে দাবীকৃত মৃত্যুর সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত। এটাও বলবো একজনের মৃত্যুও কাম্য হতে পারেনা,  যে ক’জনেরই মৃত্যু ঘটুক না কেন তার দ্বায় নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারেনা।