Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

রাত ১২:৪৬ ঢাকা, বুধবার  ১৪ই নভেম্বর ২০১৮ ইং

কোকোর মৃত্যু নিয়ে চরম পরিহাস তাসলিমার

কোকোর মৃত্যু নিয়ে চরম পরিহাস করলো বিতর্কিত লেখিকা তাসলিমা নাসরিন। খালেদা জিয়ার পরিবারকে নিয়ে তার লেখায় ব্যাপক ভাবে সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হয়নি, সমালোচনা করতেই পারেন তিনি খালেদার কারন সমালোচনা করার মতো অনেক কাজই করছেন/ করেছেন খালেদা জিয়া কিন্তু তার সন্তানের মৃত্যু নিয়ে অসময়ে পরিহাস না করাটাই ছিল শ্রেয়।  তাসলিমা নাসরিনের লেখা মন্তব্য ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে হুবহু নিম্নে তুলে ধরা হলঃ-

মা হলেই যে সন্তানের প্রতি দরদ থাকে, তা আমার মনে হয় না। বিশেষ করে ক্ষমতার স্বাদ একবার যাঁরা পেয়েছেন, তাঁরা মাতৃত্বের স্বাদের চেয়েও ক্ষমতার স্বাদটাকেই বেশি উপভোগ করেন। খালেদা জিয়াকে যদি বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী হতে চান নাকি ছেলে ফেরত চান? আমার বিশ্বাস, তিনি প্রধানমন্ত্রীত্বটাকে বেছে নেবেন। বলবেন, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ করছেন। আসলে দায়িত্ববোধটোধ নয়, সবই ক্ষমতার লোভ। একবার গদিতে বসলে সেই গদি আর ছাড়তে ইচ্ছে করে না। গরিব দেশের গদির আরাম বড় আরাম কিনা! সভ্য,শিক্ষিত দেশের গদিতে এত আরাম নেই। এত দুর্নীতি, এত অরাজকতা, এত সন্ত্রাস করার সুযোগ ওসব দেশে নেই। মন্ত্রী হলেই সামনে পেছনে নিরাপত্তার বহর থাকারও নিয়ম নেই, যদি না মুত্যুর হুমকি থাকে। যা খুশি তাই করার অবকাশ নেই। খালেদা জিয়া দীর্ঘ বছর যা খুশি তাই করেছেন। এখনও করে যাচ্ছেন। অসংখ্য চাটুকার, অসংখ্য আদেশ পালনকারী এক পায়ে এখনও খাড়া। প্রধানমন্ত্রী না হলেও বিরোধীদলের নেত্রী তো! তাঁর আদেশে বা উপদেশে, পরামর্শে বা প্ররোচনায় তাঁর দলের এবং ধর্মান্ধ শিবিরের ছেলেরা বাসে, ট্রাকে,লঞ্চে আগুনবোমা ছুড়ছে। মানুষ ঝলসে যাচ্ছে, জ্বলে যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে, মরে যাচ্ছে। বোমা বানাতে ব্যস্ত খালেদার ছেলেরা। এরাই খালেদার সত্যিকার ছেলে, যারা তাঁকে গদিতে বসানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বোমা বানাচ্ছে, বোমা ফেটে হাত উড়ে যাচ্ছে, পা উড়ে যাচ্ছে, এমনকী প্রাণ পর্যন্ত উড়ে যাচ্ছে, তারপরও বানাচ্ছে। বোমা ছুড়তে গিয়ে ধরা পড়ছে, পুলিশের মার খাচ্ছে, জেলে যাচ্ছে, ভুগছে, জেল থেকে বেরিয়ে আবার বোমা ছুড়বে এরা। এরা খালেদাকে গদিতে বসাতে চায়, কারণ খালেদা গদিতে বসলে এদের বিস্তর সুবিধে। এরা খালেদাকে দিয়ে দেশের আরও সর্বনাশ করতে পারে। গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে লড়তে পারে। ধর্মের আইন আনতে পারে। ধর্মের নামে মেয়েদের পাথর ছুড়ে হত্যা করতে পারে। মেয়েদের হিজাব পরতে বাধ্য করতে পারে। মেয়েদের শিক্ষা দীক্ষা, চাকরি ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারে। মেয়েদের বিরুদ্ধে যাবতীয় অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার মহা সমারোহে চালু করে দিতে পারে। ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করলে মানুষকে নির্দ্বিধায় জবাই করে রাস্তায় ফেলে রাখতে পারে। বিজ্ঞান শিক্ষা বন্ধ করে, দেশ ছেয়ে ফেলতে পারে মসজিদে আর মাদ্রাসায়। খালেদা ক্ষমতায় এলে তারা একএকজন হাসতে হাসতে বনে যেতে পারে আইসিস, বোকো হারাম বা আল কায়দার জঙ্গী। ত্রাস সৃষ্টি করবে, আগুনে দগ্ধ করবে মানুষ, বাড়িঘর, দোকানপাট, অফিস আদালত, গোটা দেশ। খালেদা প্রতিবাদ করবেন না। বরং মায়ের আদরে কোলে তুলে নেবেন তাঁর এই সন্তানদের। গদি যারা নিশ্চিত করে, তারাই তো সত্যিকার সন্তান। এরাই খালেদার কোকো।

কোকোর জন্য দেশের মানুষ শোক করছে কেন! অন্যকে ঠকিয়ে যে লোক নিজের পকেটে পয়সা ভরেছে, দূর্নীতি যাদের রোজগারের উৎস, তারা গত হলে আমাদের দুঃখ না করে স্বস্তি পাওয়া উচিত নয় কি? শুনেছি কোকোর ভাই তারেক দেশের অনেক মানুষের টাকা লুট করেছে। অনেক মানুষকে পথে বসিয়ে দিয়েছে, অনেক মানুষের সর্বনাশ করেছে। এসব দেশদ্রোহী দূর্নীতিবাজ কুলাঙ্গার মরলে দেশের কেন কিছু যাবে আসবে! খালেদা কি কখনও তাঁর পুত্রদের বাধা দিয়েছেন? কখনও কি ওদের সৎ পথে টাকা রোজগারের উপদেশ দিয়েছেন! বলেছেন চরিত্র বদলাতে, মানুষ হতে? আমার মনে হয় না। খালেদা নীতির কথা মুখে বলেন, নিজের জীবনে তা মানেন না। তিনি কি তাঁর দলের বা শিবিরের ছেলেদের বোমা বানাতে, বা বোমা ছুড়তে নিষেধ করেছেন? এই যে চোখের সামনে মানুষকে আগুনে ঝলসে দেওয়া হচ্ছে, পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, তিনি কি কেঁদেছেন কারও জন্য? তিনি কি অনুশোচনা করেছেন, দুঃখ করেছেন, বন্ধ করেছেন হত্যাযজ্ঞ? করেননি। কারণ তিনি ভেবেছেন এভাবেই মানুষ থেকে শুরু করে যা কিছু আছে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সর্বনাশ করলেই তাঁর পক্ষে ক্ষমতায় আসা সম্ভব। খালেদা তার ছেলে কোকোর মৃত্যুর জন্য দুঃখ করবেন না। গদির আরামের কাছে স্বজন তুচ্ছ। বরং কোকোর মৃত্যুকে তিনি রাজনীতিতে ব্যবহার করতে চাইবেন। এ থেকে ফায়দা লুটতে চাইবেন। তাঁর স্বামীর মৃত্যুকে ব্যবহার করে তিনি আজ তিনি। এই মৃত্যুর কারণেই দীর্ঘ বছর রাজত্ব করেছেন তিনি। স্বামীর মৃত্যু না হলে কোনওরকম যোগ্যতা ছাড়া সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্জন করা তাঁর জন্য অকল্পনীয় ছিল। স্বামীর মৃত্যু নিয়ে যিনি রাজনীতি করতে পারেন, তিনি পুত্রের মৃত্যু নিয়ে করবেন না কেন।! দুটো মৃত্যু আলাদা, জানি। কোকো দেশের প্রেসিডেন্টও ছিল না, তকে কেউ মেরেও ফেলেনি। কিন্তু হোক না ভিন্ন। মৃত্যু বলে কথা। দেশের সাধারণ জনগণ মৃত্যু দেখলে বড় নরম হয়ে ওঠে, দোষ ত্রুটি সব ক্ষমা করে দেয়। অবশ্য মৃত্যুটা কার হচ্ছে দেখতে হবে। যদি ক্ষমতাবান কারও মৃত্যু হয়, মানুষ চোখের জল ফেলবে। গরিবের মৃত্যুর দিকে খুব বেশি কেউ ফিরে তাকায় না।

যে মানুষগুলো আগুনবোমায় মারা গেছে, তাদের বেশির ভাগই গরিব। গরিব মরলে ধনীদের কিছু যায় আসে না। ওই গরিব ছেলেগুলোও কারও না কারও সন্তান। ওই ছেলেগুলোর রোজগারেই হয়তো সংসার চলতো। অনেকেই নির্ভর ছিল ওদের ওপর। ওদের মৃত্যুতে অনেকগুলো পরিবারের সর্বনাশ হয়েছে। আমি ওদের মৃত্যুতে শোক করছি। কোকোর মৃত্যুতে কারও কোনও সর্বনাশ হয়নি। তার মায়ের তো নয়ই। তার মা রাণী মাতা। রাণী মাতা পুত্রের উপার্জনের ওপর নির্ভর করেন না। পুত্র অঢেল সম্পদ রেখে গেছে যা দিয়ে পুত্রের স্ত্রী সন্তানেরা আমোদে আহলাদে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। ওদিকে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে শতাধিক দগ্ধ সন্তান। জ্বলে যাওয়া পুড়ে যাওয়া মানুষগুলো আর ফিরে পাবে না তাদের আগের জীবন। হয়তো পঙ্গু হয়ে বাকি জীবন বেঁচে থাকতে হবে। এদের এই পরিণতির জন্য দায়ি কে?দায়ি কোকোর মা। কোকোর মা এভাবেই অসহায় নিরাপরাধ মানুষকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পঙ্গু করে মেরে গদি দখল করতে চান। রাণী মাতাদের নিজের জন্য ছাড়া আর কারও জন্য মমতা থাকে না।

খালেদা নিজের আরাম আয়েশ ছাড়া, নিজের পেটের ছেলেদের নষ্ট বানানো ছাড়া, দেশের লক্ষ লক্ষ ছেলেদের বিভ্রান্ত করে, বিপথে নিয়ে বোমাবাজ, ধর্মবাজ বানানো ছাড়া, খুনি আর সন্ত্রাসী বানানো ছাড়া ভালো কী কাজটা করেছেন, শুনি? এদেরই পিঠের ওপর চড়ে তিনি ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে উঠতে চান। মানুষকে সভ্য শিক্ষিত করা, সচেতন করা, বোধবুদ্ধিসম্পন্ন দায়িত্ববান মানুষ করা, মানুষের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা, সবার বাক স্বাধীনতাকে সম্মান করা, সমাজকে দারিদ্র, বৈষম্য, ধর্মান্ধতা, আর কুসংস্কার থেকে মুক্ত করা — এসব তার এজেন্ডা নয়। এসবের তিনি বোঝেনই বা কী! কেবল ভাষণ দিতে শিখেছেন। জনগণকে বোকা বানাবার ভাষণ। যে কাজটি তাঁর স্বামীও করতেন।