ব্রেকিং নিউজ

রাত ৮:১৯ ঢাকা, বুধবার  ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

ওয়ান-ইলেভেন স্টাইলে ষড়যন্ত্র বিএনপিতে

বিএনপিতে আবার নতুন করে শুরু হয়েছে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন। দলটিতে ওয়ান-ইলেভেন স্টাইলে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে দলের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সরাসরি ইন্ধনও রয়েছে। বেশ কয়েক মাস আগ থেকে তারা অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে এ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মাইনাস করে নতুন মোড়কে বিএনপি গঠন করতে চান তারা। এ জন্য গোপনীয়ভাবে কাজও করে যাচ্ছেন এই ভয়ানক চরিত্রে অংশ নেয়া কুশীলবরা। দলের কথিত সংস্কারপন্থী এবং নানা কারণে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আচরণে ক্ষুব্ধ এমন নেতাদের সঙ্গে তারা অব্যাহত রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছেন। মূলত সময়-সুযোগ মতো দল ছেড়ে নতুন বিএনপি গড়ার অপেক্ষায় আছেন তারা। কিন্তু বিধিবাম। তথ্যপ্রমাণসহ ষড়যন্ত্রের অনেক কিছুই জেনে গেছে দলের হাইকমান্ড। ষড়যন্ত্রের নীলনকশা শুনে বিস্মিত হন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। যার উত্তাপ কিছুটা হলেও বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পরিলক্ষিত হয়। দল ভাঙার ষড়যন্ত্রের বিষয় নিয়ে বৈঠকে জোরালোভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়।বৃহস্পতিবার স্থায়ী কমিটির কয়েক নেতার কাছে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কেউ ফোনে কথা বলতে চাননি। এরপর চারজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে প্রতিবেদকের সরাসরি কথা হয়। এ সময় তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের স্টাইলে আবারও দলে গভীর ষড়যন্ত্র বাসা বেঁধেছে। বলতে পারেন বেড়ায় ক্ষেত খাওয়ার জোগাড় হয়েছে। বৈঠকে এমন অভিযোগ করেন স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য। এরপর কমিটির সদস্যরা একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করেন। কেউ কেউ কিছুটা বিব্রতও হন। এ সময় খালেদা জিয়াকে বেশ ক্ষুব্ধ দেখাচ্ছিল। এর মধ্যে স্থায়ী কমিটির একজন সিনিয়র নেতা বিষয়টি উত্থাপনকারী সদস্যকে উদ্দেশ করে জানতে চান, ‘আপনি কাকে ইঙ্গিত করে এসব বলছেন?’ এরপর খালেদা জিয়া তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমি সব জানি। কারা কোথায় কিভাবে ষড়যন্ত্র করছেন- সব তথ্য আমার কাছে আছে। যারা দল নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন তাদের স্থান বিএনপিতে হবে না। কারও ভালো না লাগলে তারা দল ছেড়ে চলে যেতে পারেন।’ খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যের পর বৈঠকে উপস্থিত সবাই চুপ হয়ে যান।সূত্র জানায়, বুধবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এক নেতা দল ভাঙার ষড়যন্ত্রের বিষয়টি সামনে আনেন। ওই নেতা ওয়ান-ইলেভেন সময়কার ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত করে বলেন, এখনও দল নিয়ে একটি অংশ ষড়যন্ত্র করছে। কারা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে জেল থেকে বেরিয়েছেন তাদের সবার কথাই আমরা জানি। শহীদের সংখ্যা নিয়ে দলের চেয়ারপারসনের বক্তব্যের পর একেক নেতা একেক রকম বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ বলেছেন, এটা চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত মতামত। আবার কেউ বলেছেন, তার বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে। কেউ আবার ত্রিশ লাখ শহীদ হওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেন। কিন্তু কেউ ম্যাডামের বক্তব্যকে সমর্থন করে কথা বলছেন না। এ নিয়ে দলের নেতারা কেন একাট্টা হননি সেই ব্যাপারেও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ওই নেতা বৈঠকের বেশিরভাগ সময় নানা ইস্যুতে বক্তব্য দেন। দলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিনের পদত্যাগের দিকে ইঙ্গিত করে ওই নেতা বলেন, জেলখানায় কারা বৈঠক করেছেন তাও আমরা জানি। এরপর তিনি খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে আরও বলেন, শোনা যাচ্ছে ষড়যন্ত্রকারী হোতারা বিএনপির নামে ৬০-৭০টি আসন নিয়ে ভবিষ্যতে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসবে- এই বিষয়ে আপনি কিছু জানেন কিনা। তিনি দলের পুনর্গঠন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

বৈঠকে দলের স্থায়ী কমিটির অপর এক সদস্য বলেন, তিনিও চেয়ারপারসনের বক্তব্যকে সমর্থন করে কথা বলেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে সবার সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল। এই দুই নেতার বক্তব্যকে সমর্থন করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘কে সাংবাদিকদের কী বলেন, তা যে আমি জানি না- এমনটা ভাবা ঠিক নয়। কিন্তু এভাবে চলবে না। আমি দলের সব স্তরে তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে আসব। নতুনরা দল চালাবে। কারও ভালো না লাগলে দল ছেড়ে চলে যেতে পারেন। তারপরও বলছি, দল নিয়ে ষড়যন্ত্র করবেন না। যদি করেন, তাদের স্থান বিএনপিতে হবে না।’

সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দল ভাঙার ষড়যন্ত্র নিয়ে আলোচনার বিষয়টি বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ইতিমধ্যে কম-বেশি জানতে পারেন। বৃহস্পতিবার সারা দিনই নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল এ নিয়ে কৌতূহলী আলোচনা। কারা এর কুশীলব তা জানার আগ্রহ ছিল বেশি।

সূত্র জানায়, আলোচিত ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়া হয়। ওই সময়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন নেতা গ্রেফতার হন। খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকলেও সিনিয়র নেতারা তাকে দেখতে যাননি। দলের অন্যান্য নেতা পালিয়ে বেড়ালেও বহাল তবিয়তে সিনিয়র কয়েকজন নেতা নিজ বাসাতেই অবস্থান করেন। বিষয়টি নিয়ে ওই সময় দলের মধ্যে নানা সমালোচনা ও গুঞ্জন শুরু হয়। সরকারের সঙ্গে ওইসব নেতার আঁতাত রয়েছে এমন অভিযোগও চাউর ছিল। বিষয়টি নিয়ে ওই সময়ই কয়েকজন নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনা করেন। খালেদা জিয়া তার আস্থাভাজন লোক দিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। এরপর কয়েকজন নেতার গতিবিধি ও কার্যক্রম সন্দেহজনক ছিল বলে তাকে অবহিত করা হয়।

এদিকে খবরের পেছনের খবর অনুসন্ধান করতে গিয়ে ভয়াবহ সব তথ্য বেরিয়ে আসে। দলের নির্ভরযোগ্য বেশ কয়েকটি সূত্র বৃহস্পতিবার জানায়, মূলত দলের ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর হঠাৎ পদত্যাগের বিষয়টি ছিল দল ভাঙতে ষড়যন্ত্রের প্রথম নমুনা। এরপর ওই সূত্র ধরে দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী সিনিয়র নেতাদের কাছে বিস্ময়কর নানা তথ্য আসতে থাকে। তারা জানতে পারেন, এ সারিতে দলের শীর্ষ পর্যায়ের আরও অনেকে পেছন দরজা দিয়ে কলকাঠি নাড়ছেন। কারও কারও সঙ্গে রয়েছে সরকারের গোপন যোগাযোগও। এমনকি কেউ কেউ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে জেলে বসে একাধিক বৈঠকও করেছেন। তাদের গ্রেফতার করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া ছিল ওই ষড়যন্ত্রেরই অংশ।
সূত্র জানায়, দলকে বিপদে ফেলতে শমসের মবিনের পদত্যাগের পরপরই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা বিএনপির রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দেবেন বলে তাদের পরিকল্পনায় ছিল। শারীরিক অসুস্থতা দেখিয়ে আপাতত বিএনপির রাজনীতি করবেন না। শমসের মবিনের পদত্যাগের পর ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতাও বলেছিলেন, আরও চমক আছে। কিন্তু ওই সময় মানসিক চাপ সামাল দিতে না পেরে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা পিছু হটেন ষড়যন্ত্রকারীরা।

সূত্র জানায়, ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য দলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা এখনও বিভিন্ন স্থানে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। নিয়মিত ওয়ান-ইলেভেনের সময় সংস্কারপন্থী কয়েক নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। কয়েকবার বৈঠকও করেন তারা। যেখানে সরকারের বিশেষ কিছু প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলন চলাকালে দলের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা কারাগারে ছিলেন। ষড়যন্ত্রের প্রাথমিক ছক কষতে তার সঙ্গে দুই দফা কারাগারে বৈঠক হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার কারাগারে থাকার সময়সীমা বাড়ানো হয়। বলা হয়, পরিস্থিতি অনুকূলে আসার পর তাকে মুক্তি দেয়া হবে। এরপর তিনি সময় সুযোগ মতো তার অনুসারী নিয়ে হঠাৎ দলের বিপক্ষে অবস্থান নেবেন। পরবর্তীকালে ওই নেতা মুক্তি পেলেও ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে তেমন একটা সুবিধা করতে পারছেন না। এর প্রধান কারণ, বিষয়টি ইতিমধ্যে দলের শীর্ষ পর্যায় জেনে গেছে। এর ফলে দলের মধ্যে তার অবস্থান শক্ত হওয়ার পরিবর্তে তিনি রীতিমতো পদ হারানোর হুমকিতে আছেন। বিষয়টি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, ষড়যন্ত্রের গভীর নিম্নচাপটি এখন ক্রমেই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ছে।

এদিকে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, ‘জীবনে ষড়যন্ত্র করেছি একবার। তা দেশের স্বাধীনতার জন্য। ওই সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কাজ করেও দেশের জন্য বিদ্রোহ করেছি। আমি কোনো ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই।’ সূত্রঃ জাতীয় দৈনিক যুগান্তর।